নির্যাতন-বাতিকের শিকড় প্রবেশ করেছে আমাদের নিজেদের যোগ্যতাবিষয়ে অতিরঞ্জক ধারণার অতি গভীরে। ধরা যাক আমি একজন নাট্যকার, প্রত্যেকটি নিরপেক্ষ ব্যক্তির কাছে এটা নিশ্চয় স্পষ্ট যে আমি এই যুগের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার। তার পরেও কোনও কারণে আমার নাটক খুব কম অভিনীত হয় এবং যখন হয়ও, সফল হয় না। এই অদ্ভুত ঘটনার ব্যাখ্যা কি? স্পষ্টই বোঝা যায় কোনও না কোনও কারণে সকল ব্যবস্থাপক, অভিনেতা এবং সমালোচক একসাথে মিলে আমার বিরুদ্ধাচরণ করছে। এর কারণ আমার নিজের কাছে মহা গৌরবের। আমি নাট্যজগতের মহারথীদের পায়ে মাথা নোয়াতে অস্বীকার করেছি। আমি সমালোচকদের চাটুকারিতা করিনি। আমার নাটকসমূহে এমন সব স্পষ্ট কথা রয়েছে যা তাদের আঘাত করলে তা অসহনীয় হয়ে উঠবে। আর এই কারণে আমার অন্য সকলকে লঙ্ঘন করে যাওয়া যোগ্যতার স্বীকৃতি মেলে না।
এরপর ধরা যাক যন্ত্র আবিষ্কারের কথা। সে কোনও দিন তার আবিষ্কারের মূল্য অন্য কোনও ব্যক্তিকে দিয়ে পরীক্ষা করাতে পারল না। যন্ত্র উৎপাদকেরা ছকবাঁধা পথে চলে। নুতন কিছুতেই তাদের আগ্রহ নেই। আর তাদের নিজেদেরই যন্ত্র উদ্ভাবনের লোক রয়েছে, তারাই অস্বীকৃত নতুন নতুন প্রতিভার অধিকার প্রবেশ রোধ করতে সফল হয়। অবাক হওয়ার কথা শিক্ষিত গোষ্ঠীর কাছে লেখার পাণ্ডুলিপি পাঠালে তারা তা হারিয়ে ফেলেন অথবা না পড়েই ফেরত পাঠিয়ে দেন। যেসব ব্যক্তিদের কাছে আবেদন জানানো হয়, তারা কোনও অজানা কারণে তাতে সাড়া দেন না। এসব ব্যাপারকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? বেশ বোঝা যায় বিশেষ কিছু লোকের একটা মিলন সমিতি আছে। যারা শুধু নিজেদের মধ্যেই নতুন সব উদ্ভাবনের ফল ভাগ করে নিতে চান। যে লোক তাদের সমিতির অন্তর্ভুক্ত নন, তার কোনও কথা তারা শোনেন না।
এরপর আরেকজন মানুষ যার অভিযোগ বাস্তব ঘটনার সাথে জড়িত এবং যথার্থ, কিন্তু সে তার অভিজ্ঞতার আলোকে তাকে সাধারণভাবে দেখে এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে জগতের চাবি তার দুর্ভাগ্যের মধ্যেই রয়েছে। আমরা মনে করতে পারি সে হয়তো গুপ্তচর বিভাগের কোনও কলঙ্ক সম্পর্কে জানতে পেরেছে যা সরকারের স্বার্থে গোপন থাকা প্রয়োজন। তার পক্ষে এই উদ্ভাবনের জন্যে প্রচার পাওয়া কঠিন। কিন্তু এই কলঙ্ক কাহিনী যদিও তাকে উত্তেজিত করেছে যারা তাঁর কাছে মহৎ প্রাণ মানুষ বলে বিবেচিত, তাঁরা এর প্রতিকারে সামান্যতম ব্যবস্থা গ্রহণেও স্বীকৃত নন। তার বর্ণিত ঘটনা যথার্থ হলেও তার ধারণা হল, নানা অপরাধকে সমর্থন দিয়ে যারা ক্ষমতাশালী হয়েছে সেইসব অপরাধ চাপা দিয়ে রাখতেই তারা সারাক্ষণ নিজেদের ব্যস্ত রাখে। এ ধরনের রোগীদের সারিয়ে তোলা বেশ কঠিন, কারণ দৃষ্টিভঙ্গীতে আংশিক সত্যতা থাকে। অনেক বেশি বিষয়ে তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও প্রত্যক্ষভাবে যেটুকুর সংস্পর্শে তারা এসেছে, তাই তাদের মনে স্বাভাবিকভাবে গভীর প্রভাব রেখে দিয়ে গেছে, এটা তাদের ভুল মাত্রাজ্ঞান দেয়। ফলে যা ঘটে, তা হল, সাধারণ ঘটনার চেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনায় তারা অহেতুক বেশি গুরুত্ব আরোপ করে।
আর এক ধরনের লোক যারা প্রায়ক্ষেত্রে বাতিকগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তারা হলেন পরোপকারী। তারা লোকের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও তাদের উপকার করে বেড়ান এবং তারা কোনও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে ভয়ে, বিস্ময়ে শিউরে ওঠেন। পরের উপকার করার উদ্দেশ্যকে যতটা দোষহীন ভাবা হয় বাস্তবে তা নয়। ক্ষমতালিপ্সার মধ্যে ছলনা আছে, এর রয়েছে নানা ছদ্মবেশ। অন্যের উপকার করা হচ্ছে বলে যা বিশ্বাস করা হয় তার থেকে যে আনন্দ পাওয়া যায়, প্রায় ক্ষেত্রে তার মূলে থাকে সেই ক্ষমতালিপ্সা। লোকের উপকার করার অর্থ বলতে সাধারণভাবে তাদের কোনও আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা বোঝায়। যেমন মদ্যপান বা জুয়া খেলা বা অলসতা বা অন্য কিছু। এক্ষেত্রে এমন একটা উপাদান দেখা যায় যার অনেকটা সামাজিক নৈতিকতার উত্তম দৃষ্টান্ত। যেমন তাদের প্রতি আমরা বিরত থাকি বন্ধুদের শ্রদ্ধা ধরে রাখার জন্যে। বলা যায় যারা ধূমপানের বিরুদ্ধে আইন তৈরীর জন্যে (এ ধরনের আইন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যে আছে অথবা ছিল) তাঁরা নিঃসন্দেহে ধূমপায়ী নন এবং তাদের কাছে অন্যের সুখদায়ক ধূমপান বেদনার উৎস। তারা যদি প্রত্যাশা করে থাকেন যারা পূর্বে ধূমপানের আসক্ত ছিল তাদের একটি প্রতিনিধিদল এই জঘন্য দুষ্কর্ম থেকে তাদের মুক্তি দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ জানাতে আসবে, তাহলে তাঁরা হতাশ হবেন। এরপর তাঁরা ভাবতে পারেন যে, জনকল্যাণে তারা জীবন সমর্পণ করেছেন এবং এজন্যে যাদের কৃতজ্ঞ হওয়ার সবচেয়ে বেশি কারণ ছিল তারাই সেটা প্রকাশ করার সুযোগ খুঁজে পেল না এবং এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অসচেতন হয়ে রইল।
যে সব গৃহকত্রী পরিচালিকাদের নৈতিকতা পাহারা দিয়ে রাখেন তাদেরও গৃহ পরিচারিকাদের সম্পর্কে একই ধরনের মনোভাব দেখা যায়। কিন্তু বর্তমানে ভৃত্যসমস্যা এমন প্রবলরূপ নিয়েছে যে, পরিচারিকাদের প্রতি এ ধরনের অনুগ্রহ প্রদর্শন দেখা যায় না।
রাজনীতির উচ্চস্তরে একই রকম ঘটনা দেখা যায়। যে রাষ্ট্রনেতা ধীরে ধীরে সব ক্ষমতা নিজের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করেছেন এই জন্যে যে তিনি জনকল্যাণে উচ্চমাত্রায় এবং মহৎ কিছু করতে পারবেন, যার জন্যে তিনি নিজের আরাম পর্যন্ত ত্যাগ করেছেন এবং যার জন্যে তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ। সেই তিনি যখন দেখেন জনসাধারণ তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে তখন তাদের অকৃতজ্ঞতায় তিনি হতবাক হয়ে যান। একথা তার মনেই হয় না যে তার কাজের মধ্যে জনসেবার উদ্দেশ্য না থাকতে পারে অথবা ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করার আনন্দই তাঁকে সেসব কজে প্রেরণা যুগিয়েছে। রাজনৈতিক সভায় বা দলীয় মুখপত্রে যেসব বাধা ভাষা ব্যবহার করা হয়, ক্রমে সেইসব তাঁর কাছে সত্যি বলে মনে হয় এবং তিনি দলীয় বাগাড়ম্বরকে উদ্দেশ্যের যথার্থ বিশ্লেষণ বলে ভুল করেন। বিরক্ত এবং মোহমুক্ত হয়ে পৃথিবী থেকে অবসর নেন যখন পৃথিবীও তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। তিনি এই বলে অনুতাপ করেন যে কেন তিনি জনকল্যাণরূপী একটি কৃতজ্ঞতাবিহীন কাজে নেমেছিলেন।
