নারী বা পুরুষ, এমন এক ধরনের মানুষের সাথে আমরা পরিচিত, যারা চিরদিন নিজেদের অকৃতজ্ঞতা, নিষ্ঠুরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতার কাছে বলিপ্রদত্ত বলে মনে করে। এই ধরনের মানুষদের ক্ষেত্রে তাদের কথা প্রায় বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় এবং যারা তাদের বেশিদিন ধরে চেনে না তাদের কাছ থেকে প্রচুর সহানুভূতি পায়। স্বাভাবিকভাবে তারা আলাদা আলাদা ভাবে যেসব গল্প বলে তার মধ্যে অসম্ভাব্য কিছুই থাকে না। যেসব দুর্বহারের কথা তারা বলে তা নিঃসন্দেহে মাঝে মাঝে ঘটে থাকে। কিন্তু যারা তাদের হাতে এইরকম যন্ত্রণা ভোগ করে সেই দুর্জনদের সংখ্যা দিনে দিনে এত বাড়তে থাকে যে, শেষ পর্যন্ত শ্রোতার মনে কাহিনীর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ জাগে। সম্ভাবনা রীতির নিয়মে কোনও বিশেষ সমাজে বিভিন্ন ধরনের যেসব লোক বাস করে তারা সারা জীবন সমপরিমাণ দুর্ব্যবহার পায়। যদি কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর একজন লোক, তার নিজের মধ্যেই নিহিত থাকার সম্ভাবনা বেশি এবং হয় সে যে যন্ত্রণা ভোগ করেনি তাই ভোগ করছে বলে কল্পনা করছে অথবা অচেতনভাবে এমন ব্যবহার করছে, যাতে অন্যের মনে অনিয়ন্ত্ৰণীয় বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছে। অভিজ্ঞ লোকেরা তাই যারা নিজেদের বিশ্বের দ্বারা উৎপীড়িত বলে নিজেদের মনে করেন, তাদের সন্দেহের চোখে দেখে এবং তাদের সহানুভূতি না পেয়ে এই হতভাগারা মনে করে প্রত্যেকটি লোক তাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে। এ অবস্থার প্রতিবিধান সহজ নয়, কারণ তা সহানুভূতি পেলে যেমন, সহানুভূতি না পেলে তেমন বেড়েই যায়। নির্যাতন-বাতিকগ্রস্ত মানুষ যখন দেখে যে তার দুর্ভাগ্যের কাহিনী বিশ্বাস করা হচ্ছে তখন সে তা আরও অলংকৃত করে বলতে থাকে এবং একসময় তা বিশ্বাসযোগ্যতার শেষ সীমায় পৌঁছে যায়। অন্যদিকে সে যদি দেখে তার কথা বিশ্বাস করা হচ্ছে না, তখন সে তার প্রতি মানুষের বিচিত্র ধরনের নির্দয়তার একটি উদাহরণ সেই লোকের মধ্যে দেখতে পায়। এই রোগ এমন যে শুধু বোঝাঁপড়ার মাধ্যমে তার নিরাময় সম্ভব এবং সেই উদ্দেশ্য সফল করতে হলে এই বোধ রোগীর মনেও প্রতিষ্ঠা করাতে হবে। এই অধ্যায়ে আমি কিছু সাধারণ পরামর্শ দেব, যার সাহায্যে প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের মধ্যে কী পরিমাণ নির্যাতন-বাতিক রয়েছে (যা থেকে সকলেই কমবেশি ভুগছে), তা সন্ধান করতে পারবে এবং তাদের চিহ্নিত করা গেলে পরিত্যাগ করাও সহজ হবে। সুখের অন্বেষণে এটি একটি প্রয়োজনীয় অংশ। কারণ, প্রত্যেকেই আমাদের প্রতি খারাপ আচরণ করে, এই কথা যদি আমরা সবসময় ভাবি, তা হলে সুখী হওয়া একেবারেই অসম্ভব।
বিদ্বেষপূর্ণ জল্পনা নিয়ে প্রায় প্রত্যেকটি লোক যে ধারণা পোষণ করে, তাতে দেখা যায় যুক্তিহীনতার একটি সর্বজনীন ধরণ পরিচিতদের সম্পর্কে এমন কি বন্ধুদের সম্পর্কে বিদ্বেষপূর্ণ রটনা প্রচার করার লোভ কম লোকেই সংবরণ করতে পারে। তবু যখন মানুষ তার বিরুদ্ধে নিন্দা প্রচারের কথা শোনে তখন ক্ষুব্ধ এবং স্তম্ভিত হয়। একথা তারা মনেই করে না যে, তারা যেমন অন্যের বিরুদ্ধে প্রচার করে অন্যেরাও তেমনি তাদের বিরুদ্ধে একই কাজ করে। এই ধারণা মৃদু স্তরের। কিন্তু এর আধিক্য ঘটলে মানুষ নির্যাতন-বাতিকগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আমরা নিজেদের প্রতি যে কোমল ভালবাসা এবং গভীর সম্মান বোধ করি অন্যদের কাছ থেকেও সেই অনুভূতি কামনা করি। আমরা এ কথাটা ভাবি না যে, আমরা অন্যকে নিয়ে যা চিন্তা করি, অন্যেরা আমাদের সম্পর্কে ভাল কিছু চিন্তা করুক তা আমরা আশা করতে পারি না। এ রকম যে হয় না তার কারণ আমাদের যোগ্যতা অনেক বেশি এবং তা স্পষ্ট আর অন্যের যোগ্যতা, যদি কিছু থেকেও থাকে তবে তা শুধু বদান্য দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে। কোনও না কোনও ব্যক্তি আপনার বিরুদ্ধে ভীষণ কিছু বলেছে এ কথা শুনলে আপনার মনে পড়ে যাবে তার বিরুদ্ধে উচিত এবং ন্যায্য, যা আপনি করতে পারতেন তা থেকে নিরানব্বই বার বিরত থেকেছেন এবং ভুলে যাবেন যে শততম বারে একটা অসতর্ক মুহূর্তে তার সম্পর্কে সত্যি আপনি কী ভাবেন তা প্রকাশ করে ফেলেছেন। তখন কিন্তু আপনার মনে হবে, এই কী আপনার সংযমের পুরস্কার? ক’বার আপনি মুখ খোলেন নি, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি শুধু জানেন আপনি শততম বলে কী বলেছেন, তা হলে আমার ধারণা প্রথমেই প্রায় সব বন্ধুত্বের অবসান হয়ে যেত। দ্বিতীয় যে ফলটি পাওয়া যায় সেটি খুব চমৎকার হতে পারত। কারণ বন্ধুহীন জগৎ অসহ্য হয়ে উঠত এবং তখন আমরা পরস্পরকে যে সম্পূর্ণ কলঙ্কশূন্য মনে করি না, তা মিথ্যার আবরণে লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন বোধ না করে পরস্পরকে ভালবাসতে শিখতাম। আমাদের বন্ধুদের অনেক ত্রুটি রয়েছে তা আমরা জানি। কিন্তু তবুও সাধারণভাবে তারা মনের মতো মানুষ এবং তাদের আমরা পছন্দ করি, কিন্তু তারাও অসহনীয়। আমরা আশা করি, তারা মনে করুক জগৎ সংসারে সব মানুষের ক্রটি আছে, শুধু আমাদের নেই। যখন আমাদের ত্রুটির কথা স্বীকার করতে বাধ্য হই, তখন আমরা এই প্রত্যক্ষ ব্যাপারটার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করি। সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন থাকার ধারণা কারও থাকা উচিত নয় এবং তার জন্যে তাদের অহেতুক দুর্ভাবনাও কিছু নেই।
