.
কিন্তু যদি ব্যক্তিগত সুখকে বাড়ানো এবং মানুষকে একই মানে বাস করতে সক্ষম করার উদ্দেশ্যে বিদ্রোহকে সফল করতে হয়, তাহলে দুই মানের মধ্যে দোলায়িত না হয়ে যুক্তির সাহায্যে যা পাওয়া যায় তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা এবং অনুভব করা প্রয়োজন। অধিকাংশ মানুষই শৈশবের সব কুসংস্কার হালকাভাবে ত্যাগ করে মনে করে তাদের আর কিছু করণীয় নেই। তারা বুঝতেই পারে না যে, সেসব কুসংস্কার এখনো তাদের মনের গভীরে অজ্ঞাতবাস করে রয়েছে। যুক্তির পথে কোন বিশ্বাসে পৌঁছাতে হবে তা নিয়ে ভাবা উচিত। যাতে তা থেকে কী ঘটতে পারে তা আগেই অনুধাবন করা যায়। নিজের মধ্যেই সন্ধান করা উচিত নতুন বিশ্বাসের সাথে অসঙ্গতিকর কোনও পূর্ব বিশ্বাস এখনও বেঁচে আছে কিনা। পাপের চেতনা প্রখর হলে এবং মাঝে মাঝে তা হবেই, তখন তাকে প্রত্যাদেশ বা মহৎ কিছুর জন্যে আহ্বান মনে না করে তাকে একটি রোগ এবং দুর্বলতা বলে মনে করা উচিত। এর ব্যতিক্রম হবে শুধু পাপের চেতনা যেখানে যুক্তিপূর্ণ নীতি দ্বারা নিন্দিত হয় সেখানে। মানুষ নৈতিকতাবর্জিত হোক এমন কোনও পরামর্শ আমি দিচ্ছি না, আমি শুধু বলছি তারা যেন কুসংস্কারজাত নৈতিকতা পরিহার করে। কারণ এটি সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস।
কিন্তু কোনও মানুষ যদি তার নিজের যৌক্তিক বিধান ভঙ্গ করে তার পরেও পাপের চেতনা জীবনকে উন্নততর করার শ্রেষ্ঠ উপায় কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। পাপ-চেতনার মধ্যে এমন কিছু রয়েছে যা হীন। যাতে কোনও আত্মমর্যাদা নেই। আত্মমর্যাদার অভাব কখনো কারো মঙ্গল করেনি। যুক্তিবাদী মানুষ নিজের অবাঞ্ছিত কাজকে, অপরের অবাঞ্ছিত কাজকে যে দৃষ্টিতে দেখে, সেভাবেই দেখবে। যে কাজগুলি ঘটনার কারণে সৃষ্ট এবং তা যে অবাঞ্ছিত, তা ভালভাবে উপলব্ধি করে তাকে এড়াতে হবে, অথবা যেখানে তা সম্ভব তা যেসব ঘটনার কারণে ঘটতে পারে, তা এড়াতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে পাপের চেতনা উন্নত জীবনের সহায়ের কারণ না হয়ে ঠিক তার বিপরীতই হয়। মানুষকে তা অসুখী করে, নিজেকে হীন বলে ভাবতে শিক্ষা দেয়। অসুখী হওয়ার কারণে সে প্রায় হয়তো অন্যদের ওপর অতিরিক্ত দাবি জানাতে থাকে, যা তাদের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কে বাধা সৃষ্টি করে। নিজেকে হীন মনে হওয়াতে তার চেয়ে উন্নত লোকদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। তার পক্ষে প্রশংসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু ঈর্ষা করা সহজ হয়ে যায়। সে সবার কাছে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। অন্যের প্রতি উন্মুক্ত ও উদার মনোভাব শুধু যে অন্যকেই আনন্দ দেয় তা নয়। যে এর অধিকারী তার জন্যেও পরম সুখের উৎস। এই ধরনের লোক সাধারণত সকলেই পছন্দ করে। কিন্তু পাপের চেতনা যার মনকে অধিকার করে থাকে তার পক্ষে এই ধারণা গড়ে তোলা খুব কম ক্ষেত্রেই সম্ভব। এটা হচ্ছে সুস্থিরতা এবং আত্মবিশ্বাসের ফল। এটা সব মননের সংহতি দাবি করে, যা দিয়ে আমি চেতনার সবগুলি স্তরকে বোঝাতে চাই– চেতন, অবচেতন, অচেতন, সব, যারা একত্রে সম্মিলিতভাবে ক্রিয়া করবে। সব সময় নিজেদের মধ্যে বিরোধিতায় মেতে থাকবে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সমন্বয় সুচিন্তিত শিক্ষার দ্বারা সম্ভব হয়। কিন্তু শিক্ষা যেখানে জ্ঞানশূন্য, সেখানে এই কাজ খুব কঠিন। এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে চেষ্টা করেন মনোবিশ্লেষকরা। কিন্তু আমার বিশ্বাস প্রায় সব ক্ষেত্রেই রোগীরাই এই কাজ করতে পারে, অবস্থা চরম পর্যায়ে জেনেই বিশেষজ্ঞের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। একথা বলা উচিত নয়; “আমার এসব মনস্তাত্ত্বিক শ্রম দেওয়ার মতো সময় নেই। আমি ব্যস্ত মানুষ। আমার সময় কাজের মধ্যে ঠাসা, মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারে কাজ করার জন্যে আমি আমার অচেতন মনের ওপর ভার দিলাম।” ব্যক্তিত্ব নিজের মধ্যে দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেলে যে পরিমাণ আনন্দ ও কর্মদক্ষতা নষ্ট করে এমন অন্য কিছু করে না। যে সময় ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন বিভক্ত অংশকে সমন্বয় করার কাজে খাটে, সেটাই হল কার্যকরভাবে সময়-ব্যয়। আমি বলছি না কেউ প্রতিদিন নিয়মি একঘণ্টা সময় আত্মসমীক্ষার জন্যে তুলে রাখুক। আমার মতে এটি শ্রেষ্ঠ উপায় নয় কারণ এতে আত্মসমীক্ষার জন্যে তুলে রাখুক। আমার মতে এটি শ্রেষ্ঠ উপায় নয় কারণ এতে আত্মমগ্নতা বাড়ায় এবং এটাও আরোগ্যযোগ্য ব্যাধির একটা অংশ। সুসমন্বিত ব্যক্তিত্ব সবসময় বহির্মুখী। আমি যা বলতে চাই, তা হল, মানুষ তার মনকে স্থির করবে দৃঢ়তার সাথে, যা সে যৌক্তিকভাবে বিশ্বাস করে তা নিয়ে। এর বিপরীত অযৌক্তিক বিশ্বাসকে প্রশ্নাতীত চলে যেতে অনুমতি দেবে না অথবা তার ওপর কোনওরূপ প্রভাব বিস্তার করতে দেবে না, যদি তা ক্ষণকালের জন্যেও হয়। এটা হচ্ছে যুক্তির সাথে নিজের মুখোমুখি হওয়ার প্রশ্ন। যেসব মুহূর্তে প্রলুব্ধ হতে হয় শিশুর মতো হতে। কিন্তু যুক্তির যদি প্রবল জোর থাকে তাহলে সময় খুব কম লাগে। সুতরাং এই কালক্ষেপণকে অগ্রাহ্য করা উচিত।
অনেক মানুষের কাছে যৌক্তিকতা পছন্দনীয় নয়। যেখানে এই রকম অবস্থা, সেখানে যেসব কথা আমি বলছি তা অবান্তর ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হবে। অনেকের এমন ধারণা রয়েছে যে, যুক্তিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে তার মনের গভীরতর সব আবেগকে হত্যা করে। আমার মনে হয় এই বিশ্বাস মানুষের জীবনে যুক্তি স্থান নিয়ে সম্পূর্ণ ভুল ধারণা থেকেই জন্ম নিয়েছে। আবেগ সৃষ্টি করা যুক্তির কাজ নয়। যদিও মানুষের মঙ্গলের পথে বাধা সৃষ্টিকারী আবেগকে খুঁজে বের করা এবং প্রতিহত করা তার কাজের একটা অংশ। যৌক্তিক মনস্তত্ত্বের কাজের অংশ হল সন্দেহাতীতভাবে ঘৃণা এবং ঈর্ষাকে বন্ধ করার উপায় খুঁজে বের করা। এটা একটা ভুল ধারণা যে এইসব আবেগকে কমিয়ে আনার সাথে সাথে যুক্তি নিন্দা করে না এমন সব আবেগের শক্তিও কমিয়ে দেওয়া হয়। আবেগময় ভালবাসায়, বাৎসল্যে, জনহিতকর কাজে, শিল্প অথবা বিজ্ঞানের প্রতি নিষ্ঠায় এমন কিছু নেই যা যুক্তি কমাতে চাইবে। যুক্তিবাদী মানুষ যখন এইসব আবেগ অনুভব করবে, সে খুশী হবে যে সে এইসব অনুভব করে, যার শক্তি কমানোর কোনও কারণও নেই, কারণ এইসব আবেগ সুন্দর জীবনেরই অঙ্গ, যে জীবন সুখ বয়ে আনে নিজের জন্যে এবং অন্যের জন্যেও। এইসব আবেগের মধ্যে কোন অযৌক্তিকতা নেই এবং অনেক যুক্তিহীন মানুষ শুধুমাত্র গতানুগতিক আবেগগুলি অনুভব করে। কোনও মানুষের ভয় পাওয়ার কারণ নেই যে, সে যদি নিজেকে যুক্তিবাদী করে তোলে তাহলে জীবন আনন্দহীন হয়ে যাবে। বরং যৌক্তিকতা মূলত অভ্যন্তর সমন্বয়ভাবে চিন্তা করতে পারে। সে নিজের শক্তি স্বাধীনভাবে কাজে লাগাতে পারে। পক্ষান্তরে যে মানুষ অভ্যন্তর দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত সে তা পারে না। নিজের মধ্যে আবদ্ধ থাকার মতো স্বাদহীন আর কিছু নেই। যেমন নেই শক্তি ও মনোযোগ বাইরে ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো আনন্দময় আর কিছু। আমাদের ঐতিহ্যবাহী নৈতিকতা খুব বেশি আত্মকেন্দ্রিক এবং পাপের চেতনা সম্পর্কে ধারণা এই অজ্ঞানতাজাত আত্মকেন্দ্রিকতারই একটা অংশ। ভুল নৈতিকতার মাধ্যমে সৃষ্ট অবস্থার ভিতর দিয়ে যে মানুষ কখনো পার হয়ে যায়নি, তার কাছে যুক্তি অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু যে একবার অন্তত পাপের চেতনায় রোগগ্রস্ত হয়েছে তাকে সারিয়ে তুলতে যুক্তি প্রয়োজনীয়। মনে হয় মানসিক বিকাশের জন্যে এই রোগের প্রয়োজন রয়েছে। আমার মনে হয় যে মানুষ যুক্তির সাহায্যে এই অবস্থা পার হয়ে গেছে সে একটা উচ্চতর স্তরে উঠে গেছে এবং যে মানুষের এই রোগ এবং তার নিরাময় সম্বন্ধে কোনওটারই অভিজ্ঞতা অর্জন করা হয়নি সে ততটা উচ্চস্থানে উঠতে পারে নি। আমাদের সময়ে যৌক্তিকতার প্রতি ঘৃণা খুবই বিস্তৃত। যার কারণ মূলত এই যে, যুক্তির কার্যকলাপ সম্পর্কে আমাদের ধারণা অত্যন্ত অগভীর। যে মানুষ নিজেকে নিজের বিরোধী করে তোলে সে উদ্দীপক এবং চিত্তহরণকারী জিনিসের প্রতি মোহ অনুভব করে। সে জোরালো উত্তেজনা পছন্দ করে কিন্তু তার কোনও উপযুক্ত কারণ নেই। সে এইসব করে নিজেকে বহির্মুখী করার জন্যে এবং চিন্তা করার বেদনাময় দায় থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে। যে কোনও ধরণের উত্তেজনা তার কাছে একরকমের প্রমত্ততা এবং সে আসল সুখ কী তা কল্পনা করতে পারে না বলে। বেদনা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি পাওয়া তার কাছে একমাত্র প্রমত্ততার ভিতর দিয়ে, সম্ভব বলেই মনে করে, এটা মনের গভীর স্তরে অবস্থিত একটি রোগের লক্ষণ। যে ক্ষেত্রে এই রোগ নেই সেখানে মেধার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকলে তা থেকে সবচেয়ে আনন্দ লাভ করা যেতে পারে। যে মুহূর্তে মন সবচেয়ে ক্রিয়াশীল থাকে, বিস্মরণ কম হয় তখনই গভীর আনন্দের স্পর্শ পাওয়া যায়। যে আনন্দের জন্য প্রমত্ততা প্রয়োজন হয়, তা সে যে ধরণেরই হোক, সে আনন্দ কৃত্রিম এবং অতৃপ্তিকর। সত্যিকার তৃপ্তিদায়ক আনন্দের সাথে থাকে মানসিক শক্তির পূর্ণ সক্রিয়তা এবং যে পৃথিবীতে আমরা জীবন কাটাই তার সম্পর্কে পূর্ণতম জ্ঞান।
০৮. নির্যাতন-বাতিক
চরম আকারের নির্যাতন-বাতিক উন্মত্ততার একটি স্বীকৃত রূপ। কোনও কোনও মানুষের ধারণা অন্যেরা তাকে হত্যা করতে চায়, অথবা বন্দী করতে চায় অথবা অন্য কোনও গুরুতর ক্ষতি করতে চায়। এই কাল্পনিক নির্যাতনকারীদের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করার ইচ্ছা তাদের প্রায়ই হিংসামূলক কাজে প্ররোচিত করে, যে জন্যে তাদের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। অন্যান্য ধরনের মস্তিষ্কবিকৃতির মতো এটা একটি বিশেষ প্রবণতার বাড়াবাড়ি মাত্র, যা যেসব মানুষ স্বাভাবিক বলে পরিচিত তাদের মধ্যে দেখা যায় না তা নয়। এর চরম অবস্থাসমূহ নিয়ে আমি আলোচনা করব না কারণ তা মনোবিদদের ব্যাপার। আমি মৃদুতর অবস্থাসমূহ নিয়ে কিছু বলব। কারণ সেগুলি প্রায় ক্ষেত্রে অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, আর সেসব নিশ্চিতরূপে উন্মত্ততার সীমায় যখন না পৌঁছায় রোগী নিজেই তার ব্যবস্থা করতে পারে, অবশ্য যদি তাকে সঠিক রোগ নির্ণয়ে সম্মত করানো যায় এবং সে বুঝতে পারে এই বাতিকের উদ্ভব তার নিজের ভিতর থেকেই হয়েছে, অন্যের কল্পিত শত্রু বা নিষ্ঠুরতা থেকে নয়।
