খুব ছোটদের যৌনতা বিষয়ে যে প্রাচীন শিক্ষা চলে আসছে তার কুফল নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে একটা ব্যাপক সচেতনতা এর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই বিষয়ে পালনীয় সঠিক নিয়ম সরল। শিশু বয়ঃসন্ধিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ছেলে বা মেয়ে, যেই হোক তাকে যৌনতার ব্যাপারে কোনও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া যাবে না এবং একই সাথে স্বাভাবিক দৈহিক ক্রিয়া ঘৃণার যোগ্য এমন কোনও ধারণা তার মনে ঢুকিয়ে দেওয়া থেকে দূরে থাকতে হবে। নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার সময় যখন এগিয়ে আসবে, তখন মনে রাখতে হবে সেই শিক্ষা যেন যুক্তিপূর্ণ হয় এবং প্রত্যেক বিষয় তাকে ভালভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। বর্তমান গ্রন্থে আমি শিক্ষা বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। এই গ্রন্থে আমি বরং যুক্তিহীন পাপের চেতনা জাগানো অবিজ্ঞজনোচিত শিক্ষা থেকে যে সব কুফল দেখা দেয়, তা বয়স্করা কীভাবে দূর করতে পারে তা নিয়েই বলতে চাই।
পূর্ববর্তী অধ্যায় সমূহে আমাদের যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে এখানেও তাই। সমস্যাটি হল আমাদের সচেতন চিন্তা যে যুক্তিপূর্ণ বিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে তার দিকে অবচেতনভাবে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করা। কোনও মানুষের কখনো নিজের মানসিক অবস্থায় ভেসে যাওয়া উচিত নয়। তাতে বারবার এই মুহূর্তে আবার পরক্ষণেই কোনও না কোনও জিনিসে বিশ্বাসের বদল হয়। ক্লান্তিতে, রোগে, মদ্যপানে এবং অন্যান্য কারণে পাপের চেতনা বেড়ে যায় সচেতন ইচ্ছাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে বলে। এইসব মুহূর্তে (মদ্যপান করার সময় ছাড়া) মানুষ যা অনুভব করে তা তার নিজের উচ্চতর সত্ত্বার প্রত্যাদেশরূপে মনে করা হয়, “শয়তানটা রুগ্ন ছিল, শয়তানটা সন্ত হয়ে যাবে।” কিন্তু এটা ভাবা অযৌক্তিক যে সবল থেকে দুর্বল মুহূর্তে অতিরিক্ত অর্ন্তদৃষ্টি লাভ হয়। দুর্বল মুহূর্তে শিশুসুলভ সব কল্পনাকে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। কিন্তু তার জন্যে প্রাপ্তবয়স্ক লোকের, যে নিজের দক্ষতার ওপর পূর্ণ আস্থাশীল, তার বিশ্বাসকে বাদ দিয়ে সেই শিশুসুলভ বিশ্বাসকে গ্রহণযোগ্য মনে করার কোনও কারণ নেই। পক্ষান্তরে কোনও ব্যক্তি যদি তার পূর্ণ বিচারশক্তিতে আস্থাশীল হয়ে কিছু বিশ্বাস করে, তাহলে সেই বিশ্বাস তার কাছে সবসময়ের মানদণ্ডরূপে গণ্য হওয়া উচিত। সঠিক কৌশল প্রয়োগ করতে পারলে অবচেতনতার উৎস থেকে উৎসারিত শিশুসুলভ অভিভাবনাগুলিকে দমন করা সম্পূর্ণভাবেই সম্ভব, এমন কী তার আধেয়কেও পরিবর্তন করা যায়। যখনই আপনি, যুক্তি খারাপ ভাবছে না, এমন কাজের জন্যে দুঃখ অনুভব করতে আরম্ভ করবেন, তখনই আপনি দুঃখের যে অনুভূতি তার কারণ কী তা পরীক্ষা করে দেখবেন এবং সেসব যে অবাস্তব তা নিজেকে বিস্তারিতভাবে বোঝাবেন। আপনার সচেতন বিশ্বাস এমন শক্ত এবং জোরালো হবে, যাতে তা আপনার মনের অবচেতনায় ছাপ রেখে যায়, যা আবার এত শক্ত হবে যাতে আপনার শৈশবে জননী বা ধাত্রীর কাছ থেকে পাওয়া ছাপকে অতিক্রম করে যেতে পারে। পর্যায়ক্রমে একবার যুক্তি এবং পরক্ষণেই আবার অযুক্তির মুহূর্তে ফিরে গিয়ে সন্তুষ্ট থাকবেন না। অযৌক্তিকতাকে কাছ থেকে দেখুন, দৃঢ়সংকল্প হোন যে তাকে আপনি সম্মান করবেন না এবং কোনওভাবে আপনাকে প্রভাবিত করতে দেবেন না। যখন তা আপনার চেতনায় অর্থহীন চিন্তা বা অনুভূতি চাপাতে চেষ্টা করবে তখনই সমূলে তাদের উপড়ে ফেলবেন, তাদের পরীক্ষা করবেন এবং ত্যাগ করবেন। অর্ধেক যুক্তি এবং অর্ধেক শিশুসুলভ বুদ্ধিহীনতার দোলায় নিজেকে দোদুল্যমান প্রাণীর মতো করে তুলবেন না। আপনার শৈশব যারা নিয়ন্ত্রিত করেছিলেন তাদের স্মৃতির প্রতি যদি অশ্রদ্ধা দেখাতে হয় তার জন্যে ভয় পাবেন না। তারা আপনার কাছে তখন কঠোর এবং জ্ঞানী মনে হয়েছিল। কারণ শৈশবে আপনি দুর্বল এবং বুদ্ধিহীন ছিলেন। এখন আপনি তা নন, তাই আপনার দায়িত্ব অভ্যাসের জোরে যে সম্মান এখনো দেখাচ্ছেন তা তাদের প্রাপ্য কিনা তা বিবেচনা করে দেখার জন্যে তাদের আপাত দৃশ্যশক্তি ও বুদ্ধিমত্তাকে পরীক্ষা করে দেখা। ছোটদের ঐতিহ্য পরম্পরায় যে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে তাতে পৃথিবীর কোনও উপকার হয়েছে কিনা এই প্রশ্ন গুরুত্ব সহকারে নিজেকে করুন। ভেবে দেখুন একজন আচার-স্বীকৃত ধার্মিক ব্যক্তির মনন-সৃষ্টিতে কতটুকু বিশুদ্ধ কুসংস্কারের উপকরণ প্রয়োজন হয়েছে এবং আরো ভেবে দেখুন, অবিশ্বাস্য সব নিষেধবিধি দিয়ে কাল্পনিক নৈতিক বিপদসমূহ কীভাবে ঠেকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের যেসব বাস্তব বিপদের মুখে পড়ার ভয় আছে তাদের ব্যাপারে কোনও উল্লেখ পর্যন্ত নেই। কোন্ কোন্ ক্ষতিকর কাজের দিকে সাধারণ লোকের আকর্ষণ থাকে? আইনকে বাঁচিয়ে ব্যবসাতে প্রতারণা, অধীনস্থ কর্মচারীদের প্রতি রূঢ় আচরণ, স্ত্রী এবং সন্তানদের প্রতি নিষ্ঠুরতা, প্রতিযোগীদের প্রতি বিদ্বেষ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হিংস্রতা– এইসবই হল সত্যিকারের অন্যায়, যা সম্মানীয় এবং সম্মানিত নাগরিকদের মধ্যে সাধারণভাবে দেখা যায়। এইসব অন্যায়ের সাহায্য নিয়েই একজন মানুষ তার চারপাশের পরিবেশে দুর্দশা বিস্তারিত করে এবং সভ্যতাকে ধ্বংস করার কাজে যতটুকু দেবার তা দিয়ে দেয়। তবুও, এই ধরনের মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন কিন্তু এসব কাজের জন্যে নিজেকে সমাজ পরিত্যক্ত অথবা স্বর্গীয় সুবিধা পাওয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করে না। এইসব কাজ তার দুঃস্বপ্নের মধ্যে আনত দৃষ্টিতে তিরষ্কার রত তার মায়ের মূর্তিটি তুলে ধরে না। কেন তার অবচেতন নৈতিকতা যৌক্তিকতা থেকে এভাবে বিচ্ছিন্ন? কারণ শৈশবে সে যাদের হাতে মানুষ হয়েছে তারা যে নৈতিকতায় বিশ্বাসী ছিল তার মধ্যে কোনও যুক্তি নেই। কারণ এই নৈতিকতা সমাজের প্রতি ব্যক্তির কর্তব্য কী সেই শিক্ষা থেকে জন্ম নেয়নি। কারণ এ হচ্ছে প্রাচীন যুক্তিহীন নিষেধবিধির ছোট ছোট খণ্ড দিয়ে তৈরী। কারণ মরণাপন্ন রোমান সমাজকে যে আত্মিক ব্যাধি পীড়িত করেছিল এর মধ্যেই নিহিত ছিল এর উপাদান। আমাদের নামমাত্র যে নৈতিকতাবোধ তা যাজক এবং মানসিকভাবে দাস মনোবৃত্তির নারীদের তৈরী। সময় এসে গেছে বিশ্বের স্বাভাবিক জীবনে স্বাভাবিক ভূমিকা যাদের গ্রহণ করতে হবে তাদের এই যন্ত্রণাকর এবং বাতিল জিনিসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার শিক্ষা নেওয়ার।
