প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এর শিকড় লুকিয়ে আছে তার ছ’বছর বয়সের আগে তার জননী ও ধাত্রীর কাছ থেকে পাওয়া নীতিশিক্ষার মধ্যে। ঐ সময়ের আগেই তিনি শিখেছে শপথ করা অন্যায় এবং যতদূর সম্ভব নারীসূলভ ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা ব্যবহার না করা এবং খারাপ লোকেরাই মদ পান করে। ধূমপান উচ্চস্তরের গুণাবলীর সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। তিনি শিখেছেন মিথ্যা কথা কখনো বলা উচিত নয়। সবার উপরে যৌনাঙ্গ নিয়ে যে কোনওরকম কৌতূহল ঘৃণা কাজ। এইসব তিনি মায়ের মতো বলেই জেনেছেন এবং সেই মতো তার সৃষ্টিকর্তার মত বলেই মনে করেছেন। মায়ের স্নেহভরা ব্যবহার অথবা মা যদি অবহেলা করেন তাহলে ধাত্রীর স্নেহ তার জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ এবং তা লাভ করেছেন যখন পর্যন্ত তিনি নৈতিক-বিধান ভাঙ্গার পাপী বলে পরিচিত হননি। অতএব তিনি সেইসব অস্বচ্ছ আচরণের সাথে যুক্ত হয়েছেন যা তার জননী এবং ধাত্রী অনুমোদন করেন না। ক্রমে তিনি বড় হয়েছেন এবং তাঁর এই নীতি-বিধান কোথায় থেকে এসেছে তা ভুলে গেছেন। আর ভুলে গেছেন এইসব বিধি-বিধান না মানলে তাকে প্রথম জীবনে কী কী শাস্তি পেতে হত। কিন্তু তারপরও তিনি সেসব ছুঁড়ে ফেলে দেননি এবং এসব অমান্য করলে তার ভাগ্যে ভয়ানক কিছু ঘটতে পারে, সেই অনুভূতিও তার নষ্ট হয়নি। এইসব শিশুসুলভ নীতিশিক্ষার অধিকাংশের কোনও যৌক্তিক ভিত্তি নেই এবং এই শিক্ষা এমন যে, সাধারণ মানুষের সাধারণ আচরণে তা প্রয়োগ করাও চলে না। কোনও লোক যদি, যাকে খারাপ ভাষা বলে তা ব্যবহার করে, উদাহরণস্বরূপ যুক্তিপূর্ণ দিক থেকে এমন কথা বলা চলে না যে, সে তেমন ভাষা ব্যবহার করে না তার চেয়ে যে নিকৃষ্ট। তা সত্ত্বেও বাস্তবে প্রত্যেকটি লোক সন্ত সম্পর্কে কল্পনা করতে গিয়ে শপথ করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজনীয় গুণ বলে মনে করে। যুক্তির আলোয় দেখলে এটি বুদ্ধিহীনতা ছাড়া অন্য কিছু নয়, মদ এবং তামাক সম্পর্কেও একথা প্রযোজ্য। মদ সম্পর্কে দক্ষিণের দেশসমূহে এই মনোভাব দেখা যায় না, বরঞ্চ সেখানে এই মনোভাবে কিছু অপবিত্রতা রয়েছে। কারণ আমাদের প্রভু এবং তার প্রধান শিষ্যরা মদ্যপান করতেন। তামাক সম্পর্কে কোনও ধারণা না রাখাই ভাল, যেহেতু তামাকের ব্যবহার জানার অনেক আগে আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তদের আবির্ভাব হয়েছিল। কিন্তু এখানে যুক্তিপূর্ণ বিচার সম্ভব নয়। তামাক পেলেও কোনও সন্ত তা খেতেন না। এই পর্যবেক্ষণের মূলে রয়েছে, কোনও সন্তের পক্ষে এমন কিছু করা সম্ভব ছিল না যা তাকে আনন্দ দান করতে পারে। এটাই সর্বশেষ বিশ্লেষণ। সাধারণ নীতিবোধের মধ্যে এই তাপসিক উপাদান সবার মনে অচেতনভাবেই প্রবেশ করেছে কিন্তু আমাদের নৈতিকতার বিধানকে যুক্তিহীন করে তুলতে এই বোধ সবদিক থেকেই প্রভাব বিস্তার করেছে। যুক্তিপূর্ণ নৈতিকবোধে যে কোনও লোকের আনন্দ লাভ প্রশংসনীয় এবং এমন কী নিজেরও, যদি না তাকে নষ্ট করতে নিজেকে বা অপরকে একই সাথে সমভারাক্রান্ত বেদনা দেওয়া না হয়। তাপসিকতার ধারণা থেকে যদি আমরা অব্যাহতি পাই, তবে আদর্শ ধার্মিক মানুষ তিনি-ই হবেন, যিনি সবরকম ভাল জিনিস উপভোগ করার অনুমতি দেবেন, যদি না কোনও খারাপ কাজ সেই উপভোগকে লঙ্ঘন করে না যায়। মিথ্যাভাষণের প্রশ্ন আবার তোলা যাক। আমি অস্বীকার করি না পৃথিবীতে মিথ্যার আধিক্য রয়েছে এবং সত্যতা বৃদ্ধি পেলে আমরা আরো উন্নত থাকতে পারতাম। কিন্তু মিথ্যা কোনও ভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়, একথা আমি অবশ্যই অস্বীকার করি এবং আমার মনে হয় প্রতিটি যুক্তিবাদী তা করবেন। একদা গ্রামাঞ্চলে ভ্রমণকালীন একটি ক্লান্ত খেকশিয়াল দেখেছিলাম যার তখন শেষ অবস্থা। তবুও জোর করে দৌড়াচ্ছে প্রাণের ভয়ে। কয়েক মিনিট পরেই শিকারীদের সাথে দেখা হল। তারা জানতে চাইল আমি শিয়ালটিকে দেখেছি কি না। আমি বললাম, দেখেছি। তারা এরপর প্রশ্ন করল, শিয়ালটি কোন দিকে গেছে। তখন আমি মিথ্যা কথা বললাম। এখানে সত্য উচ্চারণ করলে আমি আরো ভাল লোক হতাম বলে আমি মনে করি না।
কিন্তু যৌনতার ক্ষেত্রে শৈশবের নৈতিক শিক্ষা সবচেয়ে ক্ষতিকর হয়। যদি কোনও কঠোর বাবা-মা কিংবা ধাত্রীর কাছে কোনও শিশু এই বিষয়ে প্রথাগত শিক্ষা পেয়ে থাকে, তা হলে ছ’বছরের মধ্যেই তার মনে যৌনাঙ্গ এবং পাপের যোগাযোগ নিয়ে এমন ধারণা দৃঢ়প্রোথিত হয়ে যাবে যে, জীবনভর সেই শিক্ষা আর বিস্মৃত হবে না। এই বোধ অবশ্য ঈডিপাস কমপ্লেক্সে আরো দৃঢ় হয়, কারণ যে নারীকে সে শৈশবে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছে তার সঙ্গে সবরকম স্বাধীন যৌনতা অসম্ভব। তার ফলে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নারীকে যৌন সম্পর্কে হীন মনে করে এবং নিজেদের পত্নীরা যদি যৌন-সঙ্গমকে ঘৃণা না করে তবে তাদের সম্মান করতে পারে না। অথচ স্ত্রী যদি কামশীতল হয়, তাহলে সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই সে তৃপ্তির সন্ধান করবে অন্য জায়গায়। তার ক্ষণিকের যৌনতৃপ্তি তাকে অপরাধবোধে বিষাক্ত করে তোলে। তাই সে বিবাহ বা বিবাহ-বহির্ভুত কোনও নারীর সাথেই সম্পর্ক নিয়ে সুখী হতে পারে না। আবার নারীদের বেলায় পবিত্র হওয়ার শিক্ষায় জোর দিলে একটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। নারী তখন সংস্কারবোধ থেকেই স্বামীর সাথে যৌন সম্পর্কে দূরত্ব বজায় রেখে চলবে এবং তা থেকে আনন্দলাভ করতে ভয় পাবে। বর্তমানে অবশ্য এ বিষয়ে পঞ্চাশ বছর আগে নারীর যে অবস্থান ছিল তার পরিবর্তন ঘটেছে। একথা অবশ্য বলা যায় যে, বর্তমানে শিক্ষিতদের ভিতর পুরুষদের যৌনজীবন আরো বেশি বিকৃত এবং বিষাক্ত হয়ে উঠেছে নারীদের পাপবোধের তুলনায়।
