আব্দুল্লাহ প্রশ্ন করলেন, কয়েদ, থেকে মুক্তি পেয়েও তুমি ঘরে এলে না কেন? নয়ীমের মুখে জওয়াব নেই। নির্বাক হয়ে রইলেন।
‘এখন ঘরে না গিয়ে কোথায় চলেছো?’ আব্দুল্লাহ প্রশ্ন কররেন।
ভাই আমি ইবনে সাদেককে গ্রেফতার করবার জন্য বসরা থেকে কিছু সিপহী আনতে যাচ্ছি।’
আব্দুল্লাহ বললেন, আমি তোমায় একটি কথা জিজ্ঞেস করবো। আশাকরি, তুমি মিথ্যে বলবে না।
জিজ্ঞেস করুন।’
তুমি বল, কয়েদ থেকে মুক্তি পাবার পর কেউ তোমায় বলেছিলো যে, উযরার শাদী হতে চলেছে?
নয়ীম মাথা নেড়ে অস্বীকৃতি জানালেন।
‘এখন তুমি জানতে পেরেছ যে উযরার শাদী আমার সাথে হয়েছে?
‘জি হাঁ! আমি আপনাকে মোবারকবাদ দিচ্ছি? তুমি বস্তি হয়ে এসেছো? আব্দুল্লাহ প্রশ্ন করলেন।
হাঁ।’ নয়ীম জওয়াব দিলেন।
‘ঘরে গিয়েছিলে?
না।’
‘কেন? নয়ীম নির্বাক হয়ে গেলেন।
আব্দুল্লাহ বললেন, ‘আমি জানি, তোমার উপর আমি যুলুম করেছি মনে করে তুমি ঘরে যাওনি।’
‘আপনার ধারণা ভুল। আপনার ও উমরার উপর যুলুম করতে চাইনি বলেই আমি ঘরে ফিরে যাইনি। আনি জানি, আপনি আমার ফিরে আশা সর্ম্পকে হতাশ হয়েছিলেন এবং ভেবেছিলেন যে, উযরা দুনিয়ায় একা আর আপনাকে তার প্রয়োজন। আমি আর একবার ঘরে ফিরে পুরানো যখমগুলো তাযা করে দিয়ে উযরার যিন্দেগী তিক্ত বিস্বাদ করে দিতে চাইনি। প্রকৃতির ইশারা বারংবার আমায় বুঝিয়ে দিয়েছে যে, উযরা আমার জন্য নয়, তকদীর আপনাকেই সে আমানতের মোহাফেয মনোনীত করে নিয়েছে। তকদীরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাই না আমি। উযরা আপনাকে আর আপনি উযরাকে খুশী রাখতে পারবেন, এই এনি আছে বলেই আমি খুশী হয়েছি। আপনাদের উভয়ের খুশীর চাইতে বড় আর কোন আকাংক্ষা নেই আমার। আপনি আমার ও উমরার একটা উপকার করবেন। উযরার দীলে এ খেয়াল কখনও আসতে দেবেন না যে, আমি যিন্দাহ রয়েছি। আপনার সাথে আমার দেখা হয়েছে, একথা ওকে বলবেন না কোনোদিন।
নয়ীম, আমার কাছে কি গোপন করতে চাও? এতো এমন কোন রহস্য নয়, যা আমি বুঝতে পারি না। তোমার চোখ, তোমার মুখভাব, তোমার চেহারা, তোমার কথা, তোমার কণ্ঠস্বর প্রকাশ করছে যে, তুমি এক জবরদস্ত বোঝার তলায় পিষ্ট হচ্ছো। উযরা শুধু আমার মন রাখবার জন্য এ কোরবাণী করেছে এবং তাও এই খেয়ালে যে, সম্ভবত…..।’
‘সম্ভবতঃ আমি মরে গেছি। নয়ীম আব্দুল্লাহর অসমাপ্ত কথাটি পূরণ করে দিলেন।
ওই, নয়ীম, তুমি আমায় আর শরম দিওনা। আমি তোমায় বহুত তালাশ করেছি, কিন্তু…..
‘খোদার মনযুর এই-ই ছিল।’ নয়ীম আব্দুল্লাহর কথায় বাধা দিয়ে বললেন। নয়ীম! নয়ীম! তুমি কি মনে করছো যে, আমি….।’ আব্দুল্লাহ আর কিছু বলতে পারলেন না। তার চোখ দুটি অশ্রু ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। ভাইয়ের সামনে এক বেগুনাই আসামীর মত।
নয়ীম বললেন, ভাই। একটা মামুলী কথার উপর এতটা গুরুত্ব কেন দিচ্ছেন আপনি?
আব্দুল্লাহ জওয়াব দিলেন, হায়! এ যদি সত্যি সত্যি মামুলি কথা হতো। এছিলো আম্মির নির্দেশ যে, উযরাকে যেন একা ছেড়ে না দিই। কিন্তু সে তোমায় আজও ভোলেনি। সে তোমারই। তোমার ও উযরার খুশীর জন্য আমি তাকে তালাক দিয়ে দেবো। তোমাদের দুজনের ভেঙে যাওয়া ঘর আবার আবাদ করে দিয়ে আমি যে কি সন্তোষ লাভ করবো, তা আমিই জানি।’
‘ভাই, খোদার ওয়াস্তে এমন কথা বলবেন না। এমন কিছু বললে আমাদের তিনজনেই যিন্দেগীই হয়ে যাবে তিক্ত-বিস্বাদ, আমার নিজের চোখে আমি ছোট হয়ে যাবো। আমাদের উচিত তকদীরের উপর শোকরগুযারী করা।’
‘কিন্ত আমার বিবেক আমায় কি বলবে? নয়ীম তার মুখের উপর এক আশ্বাসের হাসি টেনে এনে বললেন, আপনার শাদীতে আমার মরমীও শামিল ছিলো।
‘তোমার মরী? তা কি করে?
কাল রাত্রে আমি সেখানেই ছিলাম।
‘কোন সময়ে?
‘আপনার নিকাহ হবার খানিকক্ষণ আগে থেকেই আমি বাড়ির বাইরে থেকে সব অবস্থা জেনেছিলাম।
‘ঘরে কেন এলে না?
নয়ীম নির্বাক হয়ে থাকলেন।
‘এই জন্যে যে, তুমি তোমার স্বার্থপর ভাইয়ের মুখ দেখতে চাওনি।’
না, সে জন্য নয়। আল্লার কসম, সে জন্য নয়, বরং আমি আমার বেগর ভাইয়ের সামনে নিজের স্বার্থপরতা দেখাতে যাওয়া লজ্জাজনক মনে করেছি। আপনারই শেখানো একটি সবক আমার দীলের মধ্যে ছিল আঁকা!
‘আমার সবক’!
আমায় আপনি সবক দিয়েছিলেন যে, যে আকর্ষণ ত্যাগের মনোভাব বর্জিত, তাতে মহব্বত বলা যায় না।’
‘তোমার ভিতরে এ ইনকেলাব কি করে এল, ভেবে আমি হয়রান হচ্ছি। সত্যি করে বলো তো, আর কারুর কল্পনা তোমার দীলে উযরার জায়গা তো দখল করেনি? আমার মনে এ সন্দেহ জাগেনি কখনো, তবু গোড়ার দিকে উযরা আম্মির কাছে এমনি সন্দেহ প্রকাশ করতো। আমার একিন ছিলো যে, জিহাদের এক অসাধারণ মনোভাব তোমায় টেনে নিয়ে গেছে সিন্ধুর পথে। কিন্তু তবু মাঝে মাঝে আমার সন্দেহ জেগেছে যে, তুমি জেনে শুনে হয়তো শাদী এড়িয়ে চলেছে। তোমার ঘরে ফিরে না আসার কারণ যদি তাই হয়, তুব তুমি ভাল করনি।’
নয়ীম নির্বাক। কি জওয়াব দেবেন, তা তিনি জানেন না। তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো ছেলেবেলার একটি ঘটনা। যেদিন তিনি উযরাকে নিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, সেদিন আব্দুল্লাহ তারই জন্য না-করা অপরাধের বোঝা কাঁধে নিয়ে তাকে বাঁচিয়েছিলেন সাজা থেকে। তিনিও আজ এক না করা অপরাধ স্বীকার করে ভাইয়ের মনে এনে দিতে পারেন সন্তোষ।
