নয়ীমের নীরবতায় আব্দুল্লাহর মনের সন্দেহ আরও বদ্ধমূল হলো। তিনি নয়ীমের বায়ু ধরে ঝাঁকানী দিয়ে বললেন, বল নয়ীম।
নয়ীম চমকে উঠে আব্দুল্লাহর মুখের উপর দৃষ্টি নিবন্ধ করে হেসে বললেন, হাঁ ভাই। আমি দীলের মধ্যে আর একজনকে জায়গা দিয়ে ফেলেছি,
আব্দুল্লাহ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এখন বল, তাকে তুমি শাদী করেছ কিনা?
না।
‘কেন, এর মধ্যে কোন মুশকিল রয়েছে কি?
না।’
শাদী কবে করবে?
শিগগীরই।’
‘ঘরে কবে ফিরে যাবে?
ইবনে সাদেকের গ্রেফতারির পরে।
আচ্ছা, আমি বেশি কিছু জিজ্ঞেস করব না তোমায়। খুব শিগগীরই আমার আন্দলুস পৌঁছে যাবার হুকুম না হলে আমি তোমার শাদী দেখে যেতে পারতাম। ফিরে আসা পর্যন্ত আমি এ প্রত্যাশা করতে পারি যে, তুমি ইবনে সাদেককে গ্রেফতার করার পর ঘরে ফিরে আসবে? ইনশাআল্লাহ দু’ভাই পাশাপাশি হয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হলেন। নয়ীম প্রকাশ্যে আব্দুল্লাহকে আশ্বাস দিলেও তার দীল কাঁপছে তখনও। আব্দুল্লাহর উপর্যুপরি প্রশ্নের আঘাতে তিনি ঘাবড়ে উঠেছেন। তামাম রাস্তায় তিনি ভাইয়ের কাছে প্রশ্ন করতে লাগলেন আন্দালুস সম্পর্কে। প্রায় দু’ক্রোশ পথ চলবার পর এক চৌরাস্তায় এসে দু’জনের পথ আলাদা হয়ে গেছে। তার কাছে এসে নয়ীম মোসাফেহার জন্য আব্দুল্লাহর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে এজাযত চাইলেন।
আব্দুল্লাহর হাত নয়ীমের নিজের হাতে নিয়ে শুধালেন, নয়ীম। যা কিছু তুমি আমায় বললে, সব সত্য, না আমার মন রাখবার জন্য বললে এসব কথা?
‘আমার উপর আপনার বিশ্বাস নেই?
‘আমার বিশ্বাস আছে তোমার উপর।
‘আচ্ছা, খোদাহাফিয।’
আব্দুল্লাহ নয়ীমের হাত ছেড়ে দিলেন। নয়ীম মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করে দ্রুত ঘোড়া ছুটালেন। যতক্ষণ না নয়ীমের ঘোড়া তার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো, ততক্ষণ আব্দুল্লাহ্ নয়ীমের কথাগুলো নিয়ে চিন্তা করতে থাকলেন। নয়ীম তার নরের বাইরে চলে গেলে তিনি হাত তুলে দোআ করলেনঃ ওগো দীন দুনিয়ার মালিক! উযরা আমার জীবন সংগিনী হবে, এই যদি হয় তোমার মনযুর, তা হলে আমার তকদীরের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। ওগো মাওলা! নয়ীম যা কিছু বললো, তা যেনো সত্য হয়। আর যদি তা সত্য নাও হয়ে থাকে তুমি তাকে সত্য করে দেখাও। তার প্রেমিকা যেন এমন কেউ হয়, যাকে নিয়ে সে ভুলে যেতে পারে উযরাকে। ওগো রহীম! ওর দীলের ভেঙ্গে পড়া বস্তিকে আবার আবাদ করে দাও। আমার কোনও নেকী যদি তোমার রহমতের হকদার হয়ে থাকে, তা হলে তার বদলায় তুমি নয়ীমকে দান করো দুনিয়া ও আখেরাতের সুখ-শান্তি।’
নয়ীমের বসরায় পৌঁছবার আগেই ইবনে সাদেককে গ্রেফতার করবার চেষ্টা চলছিলো, কিন্তু তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নয়ীম বসরার ওয়ালীর সাথে মোলাকাত করলেন। তাকে নিজের অতীত দিনের কাহিনী শুনিয়ে তিনি আবার সিন্ধুতে ফিরে যাবার ইরাদা জানালেন।
নয়ীম যন্দিাহ ফিরে আসায় বসরার ওয়ালী আনন্দ প্রকাশ করে বললেন, সিন্ধু বিজয়ের জন্য একমাত্র মুহাম্মদ বিন কাসিমই যথেষ্ট। তিনি ঝড়ের মতো রাজা মহারাজাদের পংগপালের মত অগুনতি সেনাদলকে দলিত করে সিন্ধুর সর্বত্র উডডীন করছেন ইসলামী পতাকা। এখন তুর্কিস্তানের বিরাট মুলুক পূর্ণ বিজয়ের জন্য চাই নিপুন যোদ্ধা। কুতায়বা বোখরার উপর হামলা করেছেন, কিন্তু সফল হতে পারেননি। কুফা ও বসরা থেকে প্রচুর ফউজ চলে যাচ্ছে। পরশু এখান থেকে রওয়ান হয়ে গেছে পাঁচশ সিপাহী। চেষ্টা করলে আপনি রাস্তায় তাদের সাথে মিলিত হতে পারবেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম নিঃসন্দেহে আপনার দোস্ত, কিন্তু কুতায়বা বিন মুসলিমের মত বাহাদুর সিপাহসালারের গুণগ্রহিতাও মশহুর হয়েছেন সর্বত্র। তিনি কদর করবেন আপনাকে। আমি তার কাছে চিঠি লিখে দিচ্ছি।
নয়ীম বেপরোয়া হয়ে জওয়াব দিলেন, কেউ আমার কদর করবে, সেজন্য তো আমি জিহাদে আসিনি। আমার মকসুদ হচ্ছে খোদার হুকুম মেনে চলা। আমি আজই এখান থেকে রওয়ানা হচ্ছি। আপনি ইবনে সাদেকের খেয়াল রাখবেন। তার অস্তিত্বই দুনিয়ার জন্য বিপজ্জনক।
তা আমি জানি। তাকে খতম করবার আমি সবরকম চেষ্টাই করছি। দরবারে খিলাফত থেকে তার গ্রেফতারীর হুকুম জারী হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও আমরা পাইনি তার সন্ধান। তার সম্পর্কে আপনিও হুঁশিয়ার থাকবেন। হতে পারে, সে হয়ত তুর্কিস্তানের দিকেই পালিয়ে গেছে।’
নয়ীম বসরা থেকে বিদায় নিলেন। যিন্দেগীর অগুনতি বিপদের ঝড় বয়ে গেছ তার উপর দিয়ে, কিন্তু মুজাহিদের ঘোড়ার গতি আর আকাংখা আজও রয়েছে অব্যাহত।
নয়
মুহম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুর উপর হামলা করবার কিছু আগে কুতায়বা বিন মুসলিম বাহেলী জৈহুন নদী পার হয়ে তুর্কীস্তানের কয়েকটি রাজ্যের উপর হামলা করেন এবং কয়েকটি বিজয়ের পর কতকটা ফউজ ও রসদের অভাবে এবং কতকটা শীতের অতিশয্যে ফিরে আসেন মরভে। গরমের মওসুম এলে তিনি আবার ছোটখাটো ফউজ নিয়ে পার হয়ে যান জৈহুন নদী এবং জয় করেন আরো কয়েকটি এলাকা।
কুতায়বা বিন মুসলিম প্রতি বছর গরমের মওসুমে জয় করে নিতেন তুর্কিস্তানের কোনো কোনো অংশ এবং শীতের মওসুমে ফিরে আসতেন মরভে। হিজরী ৮৭ সালে তিনি বিন্দ নামে তুর্কিস্তানের এক মশহুর শহরের উপর হামলা করলেন। হাজার হাজার তুর্কিস্তানী এসে জমা হলো শহর হেফাযত করতে। ফউজ ও রসদের অভাব সত্তেও কুতায়বা আত্মবিশ্বাস ও সহিষ্ণুতা সহকারে শহর অবরোধ রাখলেন অব্যাহত। দুমাস পর শহরবাসীদের উদ্যম আর রইলো না। শেষ পর্যন্ত তারা হাতিয়ার সমর্পণ করলো।
