. আব্দুল্লাহ হাতিয়ার পরিধান করে আস্তাবল থেকে ঘোড়া নিয়ে এসে আবার দাঁড়ালেন উযরার সামনে।
‘উযরা, তুমি দুঃখ পাওনি তো? আব্দুল্লাহ হাসিমুখে তার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলেন।
‘না, আমারও তো মন চায় এমনি করে বর্ম পরে ময়দানে যেতে। উযরা মাথা নেড়ে জওয়াব দিলেন।
‘উযরা, আমি জানি, বাহাদুর তুমি, কিন্তু আজ সারাদিন আমি তোমার দিকে তাকিয়ে দেখেছি। আমি বুঝি, তোমার দীলের উপর আজও এক বোঝা চেপে রয়েছে, যা তুমি আমার কাছে গোপন করতে যাচ্ছে। নয়ীম যে ভুলে যাবার মতো ব্যক্তিত্ব নয়, তা আমার জানা আছে। উযরা! আমরা সবাই আল্লার তরফ থেকে এসেছি আর তারই কাছে ফিরে যাবো আমরা। সে যিন্দাহ থাকলে অবশ্যি ফিরে আসততা। সে আমার কম প্রিয় ছিলো, এমন কথা মনে করো না তুমি। আজও যদি আমার জান কোরবান করে দিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনতে পারতাম, তাহলে হাসিমুখে আমি জান বাজি রাখতাম। হায়! তুমি ভাবতে, এ দুনিয়ায় আমিও কত একা? আমার মা ও নয়ীম চলে যাবার পর এ দুনিয়ায় আমার কেউ নেই। আমরা চেষ্টা করলে একে অপরকে খুশী রাখতে পারি।’
‘আমি চেষ্টা করবো। উযরা জওয়াব বললেন।
‘আমায় নিয়ে চিন্তা করো না, কেননা স্পেনে আমায় তেমন কোনো বিপজ্জনক অভিযানে যেতে হবে না। সে দেশ প্রায় বিজিত হয়ে গেছে। কয়েকটি এলাকা বাকী রয়েছে মাত্র। তাদেরও মোকাবিলা করবার তাকৎ নেই। শিগগীরই ফিরে এসে আমি তোমায় নিয়ে যাব সাথে। খুব বেশি হলে আমার ছ’মাস লাগবে।
আব্দুল্লাহ খোদা হাফিয’ বলে ঘোড়ায় সওয়ার হলেন। নয়ীম তাকে বাইরে আসতে দেখে কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে গেলেন এক খেজুর কুঞ্জের আড়ালে।
দরযার বাইরে এসে আব্দুল্লাহ উযার দিকে একবার ফিরে তাকিয়ে ঘোড়া হাঁকালেন দূর বিদেশের পথে।
*
ভোরের আলোর আভাস দেখা দিয়েছে। আব্দুল্লাহ ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছেন গন্তব্য পথে। পেছন থেকে আর একটি ঘোড়ার পায়ের আওয়ায তার কানে এলো। তিনি ফিরে দেখলেন, এক সওয়ার আরও জোরে ছুটে আসছেন সেই পথে। আব্দুল্লাহ ঘোড়া থামিয়ে পিছনের সওয়ারকে দেখতে লাগলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। পিছনের সওয়ারের মুখ লৌহ শিরাস্ত্রাণ দিয়ে ঢাকা। আব্দুল্লাহর মনে উদ্বেগ জাগলো। তিনি হাতের ইশারায় থামাতে চাইলেন তাকে। কিন্তু আব্দুল্লাহর ইশারার পরোয়ানা করে তিনি যথারীতি ছুটে চললেন তাকে ছাড়িয়ে। আব্দুল্লাহর উদ্বেগ আরও বেড়ে গেলো। তিনি পিছু পিছু ছোঁড়া ছুটালেন। আব্দল্লাহর তাযাদম ঘোড়া। অপর ব্যক্তিকে শাহসওয়ার মনে হলেও তিনি বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারলেন না। তার ঘোড়ার মুখে তখন ফুটে উঠেছে ক্লান্তির চিহ্ন। আব্দুল্লাহ কাছে এসে নেযাহ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
তুমি দোন্ত হলে দাঁড়িয়ে যাও, আর দুশমন হলে মোকাবিলা জন্য তৈরী হও।’
দ্বিতীয় সওয়ার ঘোড়া থামালেন।
‘আমায় মাফ করুন। আব্দুল্লাহ বললেন, আমি জানতে চাচ্ছি, আপনি কে? আমার এক ভাই বিলকুল আপনারই মতো ঘোড়ার উপর বসততা আর ঠিক আপনারই মতো ঘোড়ার বাগ ধরতো। তার দেহটিও ছিল ঠিক আপনারই মতো। আমি আপনার নাম জিগগেস করতে পারি? সওয়ার নীরব।
‘আপনি কথা বলতে চান না…..? আমি জিগগেস করছি, আপনার নাম কি……..? আপনি বলবেন না?
সওয়ার এবারও নীরব হয়ে রইলেন।
‘মাফ করবেন, যদি মনোঃকষ্টের কারণে আপনি কথা না বলতে চান, তাহলে কমপক্ষে আপনার চেহারা দেখাতে কোনো আপত্তি থাকা উচিত হবে না। কোনো দেশের গুপ্তচর হলেও আমি আপনাকে না দেখে আজ যেতে দেবো না। এই কথা বলে আব্দুল্লাহ তার ঘোড়া আগন্তুকের ঘোড়ার কাছে নিয়ে গেলেন এবং আচানক নেযার মাথা দিয়ে তার শিরস্ত্রাণ তুলে ফেললেন। আগন্তুকের মুখের দিকে তাকিয়ে আব্দুল্লাহর মুখ থেকে নয়ীম’ বলে এক হালকা চীৎকার ধ্বনি বেরিয়ে এলো। নয়ীমের চোখ দিয়ে বয়ে চলেছে অবিশ্রান্ত অশ্রুধারা।
দু’ভাই ঘোড়া থেকে নেমে পরস্পর আলিংগনাদ্ধ হলেন।
‘ভারী বেওকুফ হয়েছো তুমি।’ আব্দুল্লাহ নয়ীমের পেশানীর উপর হাত বুলিয়ে বললেন, কমবখত! এতটা আত্মাভিমান? আর এ তো আত্মাভিমানও নয়। তোমার কিছুটা বুদ্ধি থাকা উচিত ছিলো আর এও তো ভাবা উচিত ছিল যে তোমার মা তোমার জন্য ইনতেযার করছেন। তোমার ভাই তোমার সন্ধান করে বেরিয়েছে সারা দুনিয়ায় আর উযরাও বস্তির উঁচু টিলায় চড়ে তোমার পথের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু কোনো কিছুর পরোয়া করলে না তুমি। খোদা জানেন, কোথায় লুকিয়ে ছিলে এতকাল। এ তুমি কি করলে?
নয়ীম কোন জবাব না দিয়ে ভাইয়ের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। দীলের কথাগুলো ফুটে বেরুচ্ছে তার চোখ দিয়ে। আব্দুল্লাহ তার নীরবতায় অবিভূত হয়ে নয়ীমকে আর একবার বুকে চেপে ধরে বললেন, কথা বলছো না তুমি। আমার উপর তোমার এতটা বিদ্বেষ যে, মুখ ঢেকে চলে যাচ্ছিলে আমার পাশ দিয়ে! কোত্থেকে এসে কোথায় চলে যাচ্ছো তুমি? আমি সিন্ধুতে তোমার খোঁজ করে কোন সন্ধান পাইনি। কেন তুমি ঘরে এলে না?’ নয়ীম এক ঠান্ডা শ্বাস পেলে বললেন, ভাই, আমার ঘরে ফিরে আসা খোদার মনযুর ছিলো না।’
‘কোথায় ছিলে তুমি? আব্দুল্লাহ শুধালেন।
তার প্রশ্নের জওয়াবে নয়ীম তার কাহিনী সংক্ষেপে বর্ণনা করলেন, কেবল বললেন না জোলায়খার কথা। আরো বললেন, যে আগের রাত্রে তিনি ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন। নয়ীমের কথা শেষ হলে দু’ভাই পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
