আঙিনার ভিতরে মশাল জ্বলছে। বস্তির লোক খানাপিনায় মশগুল। মেয়েরা জমা হয়েছে ছাদের উপর। মেহমানদের সমবেত হবার কারণ তিনি চিন্তা করতে লাগলেন আপন মনে। তার মনে হলো, বুঝি খোদা উযরার কিসমতের ফয়সালা করে ফেলেছেন। মনের উদাস চিন্তা ভাবনা তাকে এমন অভিভূত করলো যে, তার ঘরের জান্নাত আজ তার কাছে মনে হচ্ছে সকল আশা-আকাঙ্খকা সমাধি। নীচে নেবে ঘর থেকে কয়েক কদম দূরে তিনি ঘোড়া বাঁধলেন এক গাছের সাথে। তারপর গা ঢাকা দিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন গাছের ছায়ায়।
বস্তির একটি ছেলে ছুটে বেরিয়ে এলো বাইরে। নয়ীম এগিয়ে গিয়ে তার পথ রোধ করে শুধালেন, এখানে কিসের দাওয়াত?
বালক চমকে উঠে নয়ীমের দিকে তাকালো, কিন্তু গাছের ছায়া আর নয়ীমের মুখের অর্ধেকটা লৌহ শিরস্তাণে ঢাকা বলে সে চিনতে পারলো না তাকে। সে জওয়াবে বললো, শাদী হচ্ছে এখানে।
কার শাদী’?
‘আব্দুল্লাহর শাদী হচ্ছে। আপনি বোধ হয় বিদেশী। চলুন, আপনি এ দাওয়াতে শরীক হবেন।’ কথাটি বলেই চলে যাচ্ছিল, কিন্তু নয়ীম বায়ু ধরে তাকে থামালেন। বালক পেরেশান হয়ে বললো, আমায় ছেড়ে দিন। আমি কাযীকে ডাকতে যাচ্ছি।
যদিও নয়ীমের দীল এ প্রশ্নের জওয়াব আগেই দিয়েছে, তবু তার অন্তরের প্রেম ব্যর্থতা ও হতাশার শেষ দৃশ্য চোখের সামনে দেখেও আশা ছাড়লো না। তিনি কম্পিত আওয়াযে প্রশ্ন করলেন, আব্দুল্লাহর শাদী হবে কার সাথে?
উয়রার সাথে। বালক জওয়াব দিলো।
আব্দল্লার মা কেমন আছেন?’ শুকনো গলার উপর হাত রেখে প্রশ্ন করলেন নয়ীম।
‘আবদুল্লার মা? তিনিতো ইন্তেকাল করেছেন তিনচার মাস আগেই। বলেই বালক ছুটে চললো।
নয়ীম গাছটিকে ধরে দাঁড়ালেন। মায়ে শোক তার অন্তর তোলপাড় করে তুললো। তার চোখে নামলো অশ্রুর দরিয়া। খানিকক্ষণ পর সেই বালক কাযীকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। নয়ীমের দীলের মধ্যে দুটি পরস্পর বিরোধী আকাঙ্খ জেগে উঠলো, এখনো তকদীর তার হাতের নাগালের ভিতরে। উযরা তার কাছে থেকে দুরে নয়। তার যিন্দাহ ফিরে আসার খবর জানলে আব্দুল্লাহ তার যিন্দেগীর সর্বস্ব কোরবান করেও তার দীলের ভেঙ্গে পড়া বস্তি আবাদ করে দেবেন মনের খুশীতে। এখনো সময় রয়েছে।
তার বিবেক আবার দ্বিতীয় আওয়ায তুললোঃ এই-ইতো তোমার ত্যাগ ও সবরের পরীক্ষা। উযরার প্রতি তোমার ভাইয়ের মহব্বত তো কম নয়, আর কুদরতের মনযুরও এই যে, উযরা আর আব্দুল্লাহ এক হয়ে থাকবেন। আত্মত্যাগী ভাই তোমার জন্য নিজের খুশীকে কোরবান করতে তৈরী হবেন, কিন্তু তা হবে যুলুম। যদি তুমি আব্দুল্লাহর কাছে সেই কোরবানীর দাবী কর, তাহলে তোমার আত্মা কখনো সন্তোষ লাভ করবে না সিন্ধুর উপকূল পর্যন্ত তোমার সন্ধান করে শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে তিনি শাদী করছেন উযরাকে। তুমি বাহাদুর, তুমি মুজাহিদ, সংযত হয়ে থাক। উযরার জন্য চিন্তা কর না। সময় ধীরে ধীরে তার দীল থেকে মুছে ফেলবে তোমার স্মৃতির বেদনা। আর এমন কোন গুণ রয়েছে তোমার যা আব্দুল্লাহর ভিতরে নেই?
বিবেকের দ্বিতীয় আওয়াযই নয়ীমের কাছে ভালো লাগলো। তিনি অনুভব করলেন, যেন তার দীল থেকে নেমে যাচ্ছে এক অসহনীয় বোঝা। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নয়ীমের দুনিয়া বদলে গেলো তার চোখে।
ঘরে যখন আব্দুল্লাহর ও উযরার শাদী পড়ানো হচ্ছে, নয়ীম তখন বাইরে গাছের নীচে সিজদায় মাথা নত করে দোআ করছেন, দীন দুনিয়ার মালিক! এ শাদীতে বরকত দাও। উযরা ও আব্দুল্লাহর সারা জীবন খুশি আনন্দে অতিবাহিত হোক। একে অপরের জন্য তাদের দীল-জান উৎসর্গিত হোক। সত্যিকার জীবন মরনের মালিক! আমার হিসসার তামাম খুশী তুমি ওদেরকে দাও।’
অনেকক্ষণ পর নয়ীম যখন সিজদাহ থেকে মাথা তুললেন মেহমানরা তখন চলে গেছে। মন চাইলো তিনি ছুটে গিয়ে ভাইকে মোবারকবাদ দিয়ে আসেন, কিন্ত আর একটি চিন্তা তাকে বাধা দিলো। তিনি ভাবলেন, ভাই তাকে দেখে খুশী হবেন নিশ্চয়ই, কিন্তু লজ্জাও হয়তো পাবেন। তিনি যে যিন্দহ রয়েছেন তাতে উফরার কাছে প্রকাশ করা চলে না। তার ফিরে আসা সম্পর্কে হতাশ হয়ে উযরা এতদিনে যে সবুর ও স্থিরতা লাভ করেছেন তা যে মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তিনি মরে গেছেন, মনে করে যদি তারা শাদী করে থাকনে, তাহলে উযার তামাম যিন্দেগী হবে অশান্তিপূর্ণ। তাকে দেখে তিনি লজ্জায় মরে যাবেন। উযরার পুরানো যখম আবার তা হয়ে উঠবে। তার চাইতে ভালো তিনি তাদের কাছ থেকে দূরে থাকবেন, তার দুর্ভাগ্যে শরীক করবেন না তাদেরকে। তার বিবেক এ চিন্তায় সায় দিলো। মুহূর্ত-মধ্যে মুজাহিদের দীলে জাগলো সুদৃঢ় প্রত্যয়। নয়ীম ফিরে চলবার আগে কয়েক কদম এগিয়ে গেলেন ঘরের দিকে; তারপর বেদনাতুর দৃষ্টি মেরে তাকালেন তার আশা-আকাঙ্খর শেষ সমাধির দিকে। ফিরে চলবার উপক্রম করতেই আঙিনায় কার পায়ের আওয়ায এলো তার কানে। তার মনোযোগ নিজের দিকে নিবদ্ধ হলো। আব্দুল্লাহর ও উযরা কামরা থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন আঙিনায়। তিনি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন, কিন্ত আব্দুল্লাহকে লেবাসের বদলে বর্ম পরিহিত ও উযরাকে তার কোমরে তলোয়ার বেঁধে দিতে দেখে তিনি হয়রান হয়ে দাঁড়ালেন দরযার আড়ালে। তখখুনি তিনি বুঝলেন যে, আব্দুল্লাহ জিহাদে যাচ্ছেন। এতে নয়ীমের হয়রান হবার কিছু নেই। এই প্রত্যাশাই তিনি করেছেন ভাইয়ের কাছে।
