জোলায়খার বিষণ্ণ মুখ খুশীতে দীপ্ত হয়ে উঠলো। হতাশার অন্ধকারে বিশীর্ণ ফুলের বুকে আশার আলো এনে দিলো নতুন সজীবতা। বেকারার হয়ে সে বললো, বলুন, কোন সে পথ?
‘জোলায়খা! আমার প্রভুর গোলামী কবুল কর। তাহলে তোমার আমার মাঝখানে কোনো দূরত্ব থাকবে না।’
আমি তৈরী। কিন্ত আপনার প্রভু আমায় গ্রহন করবেন কি?
হাঁ। তিনি বড়ই কৃপাময়!
কিন্তু আমি তো কয়েক লহমার জন্যই মাত্র যিন্দাহ থাকব।’
তার জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন নেই। জোলায়খা, বল।’
কি বলব?’ বিগলিতা জোলায়খা বললো।
নয়ীম কলেমায়ে শাহযাদাত পড়লেন আর জোলায়খা তার সাথে সাথে তা আবৃত্তি করলো। জোলায়খা আর একবার পানি চাইলো এবং তা পান করে বললো-আমি অনুভব করছি, যেনো আমার দীল থেকে এক বোঝা নেবে গেছে।’
নয়ীম বললেন, এখান থেকে কয়েক ক্রোশ দূর রয়েছে ফৌজী চৌকি। তুমি ঘোড়ায় চড়তে পারলে তোমায় ওখানে নিয়ে যেতে পারতাম। এ অবস্থায় তোমার না ঘোড়ায় উপর বসা সম্ভব নয়, তাই আমায় কিছুক্ষনের জন্য এজাযত দাও। খুব শিগগীরই আমি ওখান থেকে সিপাহী ডেকে আনবো। হয়তো ওরা আশপাশের বস্তি থেকে কোন হাকীম খুঁজে আনাতে পারবে।’
নয়ীম জোলায়খার মাথা যমীনের উপর রেখে উঠছিলেন, কিন্তু কমফের হাত দিয়ে সে নয়ীমের জামা ধরে কেঁদে বললো, “খোদার ওয়াস্তে আপনি কোথাও যাবেন না। ফিরে এসে অপনি যিন্দাহ পাবেন না আমায়। মরবার সময় আমি আপনার কাছ-ছাড়া হতে চাই না।’
নয়ীম জোলায়খার বেদনাতুর কণ্ঠের আবেদন অগ্রাহ্য করতে পারলেন না। তিনি আবার বসে পড়লেন তার পাশে। জোলায়খা আশ্বস্ত হয়ে চোখ বন্ধ করলো। বহুক্ষণ সে পড়ে রইলো নিশ্চল। কখনো কখনো সে চোখ খুলে তাকাচ্ছে নয়ীমের মুখের দিকে। রাতের তৃতীয় প্রহর কেটে গেছে। ভোরের আভা দেখা যাচ্ছে। জোলায়খার দেহের শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। তার সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিসার হয়ে এসেছে, আর বহু কষ্টে সে টানছে শ্বাস।
জোলায়খা! নয়ীম বেকারার হয়ে ডাকলেন।
জোলায়খা শেষ বারের মত চোখ খুললো এবং এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুমিয়ে পড়লো। চিরকালের মত। উন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজেউন, বলে নয়ীম মাথা নত করলেন। অলক্ষ্যে তার চোখ থেকে নেমে এলো অশ্রুর বন্যা। সে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো জোলায়খার মুখের উপর। জোলায়খার নির্বাক মুখ যেন বলে যাচ্ছেঃ
‘হে পবিত্র আত্মা! তোমার অশ্রুর মূল্য আমি আদায় করে গেলাম। নয়ীম উঠে ঘোড়ায় সওয়ার হলেন এবং নিকটের চৌকিতে পৌঁছে কয়েকজন সিপাহীকে ডেকে আনলেন। আশাপাশের বস্তি থেকেও কতক লোক এসে জমা হলে সেখানে। নয়ীম জানাযার নামায পড়িয়ে জোলায়খা ও তার সংগীদের দাফন করে চললেন তার বাড়ির পথে।
আট
রাতের বেলায় নয়ীম এক বিস্তীর্ণ মরুপ্রান্তর অতিক্রম করে চলেছেন। জোলায়খার মৃত্যুশোক, সফরের ক্লান্তি, আরো নানারকমের পেরেশানির ফলে কেমন যেন উদাস মন নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন মনযিলে মকসুদের দিকে। জনহীন প্রান্তরে মাঝে মাঝে শোনা যায় নেকড়ে ও শিয়ালের আওয়ায়। তারপরই আবার নিস্তব্ধ-নিঝুম। খানিকক্ষণ পরে পূর্বদিগন্তে দেখা দিলো শুক্লপক্ষের চাঁদ। অন্ধকার পর্দা গেলো ছিন্ন হয়ে, নিস্প্রভ হয়ে এলো সিতারার দীপ্তি। বাড়তি আলোয় নয়ীমের নযরে পড়তে লাগলো দূরের টিলা পাহাড়, বন-ঝাড় আর গাছপালা। মনযিরে মকসুদের কাছে এসে গেছেন তিনি। তার বস্তির আশপাশের বাগবাগিচার অস্পষ্ট ছবি ভেসে উঠছে তার চোখে। তার রঙিন স্বপ্নের কেন্দ্রভূমি যে বস্তি, যে বস্তির প্রতি ধুলিকণার সাথে রয়েছে তার দীলের সম্পর্ক, সেই বস্তি এখন তার কতো কাছে। দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়ে তিনি সেখানে পৌঁছে যেতে পারেন, তবু তার কল্পনা বার বার সেখান থেকে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বহু ক্রোশ দূরে জোলায়খার শেষ বিরাম ভুমির দিকে। জোলায়খার মওতের মর্মান্তিক দৃশ্য বারংবার ভেসে উঠছে তার দৃষ্টির সামনে। তার শেষ কথাগুলো গুঞ্জন করে যাচ্ছে তার কানে। তিনি খানিকক্ষণের জন্য ভুলে যেতে চান সে মর্মান্তিক কাহিনী, কিন্তু তিনি অনুভব করেন, যেন সারা সৃষ্টি সেই নির্যাতিত নারীর আর্তনাদ ও অশ্রুধারা বেদনাতুর।
নিজের ঘরের হাজারো আশংকা তাকে উতলা করে তুলেছে। তিনি তার যিন্দেগীর আশা আকাঙ্কার কেন্দ্রস্থলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু তার দীলের নওজোয়ানসূলভ উৎসাহ-উদ্যম আর উদ্দীপনার চিহ্ন নেই। অতীত যিন্দেগীতে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে কখনো তিনি এমনি ঢিলেঢালা হয়ে বসনে নি। চিন্তার ভারে তিনি যেনো পিষ্ট হয়ে যাচ্ছেন।
আচানক বস্তির দিক থেকে একটা আওয়াজ এলো তার কানে। তিনি চমকে উঠে শুনতে লাগলেন সে আওয়াম। বস্তির মেয়েরা দফ বাজিয়ে গান গাইছে। শাদী উপলক্ষে আরব নারীরা যে সাদাসিধা গান গাইতো, এ সেই গান। নয়ীমের দীলের স্পন্দন দ্রুততর হতে লাগলো। তার মন চায়, উড়ে ঘরে চলে যেতে কিন্তু কিছুদূর গিয়েই তার ক্রমবর্ধমান উদ্যম যেনো উবে যায়। তিনি সেই ঘরের চারদেয়ালের কাছে এসে গেলেন, যেখান থেকে ভেসে আসছে গানের আওয়ায। এ যে তারই আপন ঘর। খোলা দরযার সামনে গিয়ে তিনি ঘোড়া থামালেন। কিন্ত কি যেনো মনে করে আর এগুতে পারলেন না তিনি।
