নয়মের মনে আশংখা ছিলো, ইবনে সাদেক হয়তো জোলায়খার অনুসরণ করবে। প্রতি চৌকিতে তিনি ছোট-খাটো কাফেলাটির খবর নিতে নিতে চললেন। তিনি জানতে পেলেন যে, অপর চৌকিগুলোয় সিপাহীর অভাব ছিলো বলেই জোলায়খার সাথে দশজনের বেশি সিপাহী যেতে পারেনি। জোলায়খার হেফাযতের চিন্তা করে তিনি তখখুনি সেই কাফেলায় শামিল হতে চাইলেন এবং দ্রুত থেকে দ্রুততর বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে চললেন। রাত হয়ে গেছে। শুক্লা চতুর্দশীর চাঁদ সারা দৃষ্টির উপর ছড়িয়ে দিয়েছে তার রূপালী আভা.নয়ীম পাহাড়-প্রান্তর অতিক্রম করে এসে পার হয়ে চলেছেন এক মরু অঞ্চল। পথের মধ্যে এক বিচিত্র দৃশ্য দেখে তার দেহের রক্ত জমাট হয়ে এলো। বালুর উপর পড়ে রয়েছে কয়েকটি ঘোড়া ও মানুষের লাশ। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তখনো তড়পাচ্ছে। নয়ীম ঘোড়া থেকে দেখলেন, জোলায়খার সাথে যারা এসেছিলো, তাদের কেউ কেউ রয়েছে তাদের মধ্যে। নয়ীমের দীলের মধ্যে সবার আগে জাগলো জোলায়খার চিন্তা। তিনি ঘাবড়ে গিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন। এক যখমী নওজোয়ান পানি চাইলো নয়ীমের কাছে। নয়ীম ঘোড়ার পিঠে বাঁধা মোশক থেকে পানি ধরলেন তার মুখের কাছে। এক হাত দিয়ে তার কম্পিত বুক চেপে ধরে তিনি কিছু জিজ্ঞেস করলেন, এর মধ্যে যখমী নওজোয়ান একদিকে হাতের ইশারা করে বললো, আমাদের আফসোেস, আমাদের ফরয আদায় করতে পারিনি আমরা। আপনার হুকুম মোতাবেক আমরা নিজের জান বাঁচাবার, চেষ্টা না করে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত ওর জানের হেফাযত করবার জন্য লড়াই করেছি, কিন্তু ওরা ছিলো সংখ্যায় অনেক বিশী। আপনি ওর খবর নিন।
এই কথা বলে সে আবার হাত দিয়ে ইশারা করলো এক দিকে। নয়ীম দ্রুত সেদিকে এগিয়ে গেলেন। কয়েকটি লাশের মাঝখানে জোলায়খাকে দেখে তার দীল কেঁপে উঠলো। কানের ভিতর শাঁই শাঁই আওয়ায হতে লাগলো। যে মুজাহিদ আজ পর্যন্ত অসংখ্যবার নাযুক থেকে নাযুকতার পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছে অকুতোভয়ে, এই মর্মান্তিক দৃশ্য তাকে কাঁপিয়ে তুললো।
‘জোলায়খা!’ জোলায়খা! তুমি…..।
জোলায়খার শ্বাস তখনো কিছুটা বাকী রয়েছে।-”আপনি এসে গেছেন? সে বললো ক্ষীণ আওয়াযে।
নয়ীম এগিয়ে গিয়ে জোলায়খার মাথাটা তুলে ধরে পানি দিলেন তার মুখে। জোলায়খার সিনায় বিদ্ধ হয়ে রয়েছে এক খনজর। নয়ীম কম্পিত হাতে তার হাতল ধরে টেনে বের করতে চাইলেন, কিন্ত জোলায়খা হাতের ইশারায় তাকে মানা করে বললো, ওটা বের করে কোন ফায়দা হবে না। ওর কার্য ও করেছে আর এই শেষ মুহূর্তে আমি আপনার নিশানী থেকে জুদা হতে চাই না।
নয়ীম হয়রান হয়ে বললেন, আমার নিশানী?
জি হাঁ, এ খনজর আপনার। আপনার দেওয়া খনজর আমার কার্যে এসেছে, তাই আমি আপনার শোকরগুযারী করছি। জোলায়খা! জোলায়খা তুমি আত্মহত্যা করলে!!
প্রতিদিনের রূহানী মওতের চাইতে একদিনের জিসমানী মতকে আমি ভাল মনে করেছি। খোদার ওয়াস্তে আপনি আমার উপর নারায় হবেন না। শেষ পর্যন্ত আমি কি-ই বা করতে পারতাম? ভাঙ্গা তকদীরকে জোড়া দেওয়ার সাধ্য ছিলো না আমার, আর এই শেষ হতাশা আমি জিন্দাহ থেকে বরদাশত করতে পারতাম না।’
নয়ীম বললেন, জোলায়খা, আমি অত্যন্ত লজ্জিত কিন্তু উপায় ছিলো না।
জোলায়খা নয়ীমের মুখের উপর প্রীতি ভরা দৃষ্টি হেনে বললো, আপনি আফসোস করবেন না। এই-ই কুদরতের মনযুর, আর কুদরতের কাছে এর চাইতে বেশী প্রত্যাশাও আমি করিনি। শেষ মুহূর্তে আপনি আমার পাশে রয়েছেন, এর চাইতে খোশনসীব আমার কিই বা হতে পারতো।
জোলায়খা এই কথা বলে দুর্বলতা ও বেদনার আতিশয্যে চোখ মুদলো। কম্পিত দীপশিখা বুঝি নিভে গেল, ভয় করে নয়ীম ‘জোলায়খা জোলায়খা’ বলে তাঁর মাথায় ঝাকনি দিলেন। জোলায়খা চোখ খুলে নয়ীমের দিকে তাকালো এবং শুকনো গলায় হাত রেখে পানি চাইলো। নয়ীম পানি দিলেন তার মুখে। খানিকক্ষণ দু’জনই নির্বাক। এই শুব্ধতার মধ্যে নয়ীমের দীলের কম্পন দ্রুততর ও জোলায়খার দীলের স্পন্দন ক্ষীণতর হতে লাগলো। মৃত্যু পথযাত্রীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে রয়েছে শেষ সংগীর মুখের উপর, আর সংগীর ব্যথাতুর দৃষ্টি গিয়ে পড়েছে তার বুকে নিমজ্জিত খনজরের উপর। শেষ পর্যন্ত জোলায়খা একবার কাতরে উঠে নয়ীমের মনোযোগ আকর্ষণ করে বললো, আপনার ঘরে গিয়ে আমি ওকে দেখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে অরযু আমার পুরা হলো না। আপনি গিয়ে ওকে আমার সালাম বলবেন। জোলায়খা আবার চুপ করলো। খানিক্ষন চিন্তা করে জোলায়খা আবার বললো, আমি এখন এক দীর্ঘ সফরের পথে চলেছি। আপনার কাছে একটা প্রশ্ন করবো আমি। যে দুনিয়ায় আমি চলছি, সেখানে আমার পরিচিত কউে থাকবে না। আমার বাপ-মাও হয়তো চিনবেন না আমায়, কেননা যখন এই জালেম চাচা আমায় চুরি করে এনেছে, তখন আমি ছিলাম খুবই ছোট। এ আশা কি আমি করতে পারি যে, সেই দুনিয়ায় আপনি একবার অবশ্যি মিলিত হবেন আমার সাথে। সেখানে এমন একজন লোক তো চাই, যাকে আমি আপনার বলতে পারবো। আপনাকেই আমি মনে করছি আমার আপনার জন। কিন্তু আপনি যতোটা আমার নিকট, ততোটা দূর।
জোলায়খার কথা নয়ীয়মের দীলকে অভিভূত করলো। তার দু’চোখ হয়ে উঠলো অশ্রুভারাক্রান্ত। তিনি বললেন, জোলায়খা যদি তুমি আমায় আপনার করে নিতে চাও, তাহলে তার একই পথ রয়েছে।
