আমি জানি।’ জোলায়খা চাপা আওয়াজে জওয়াব দিলো।
‘হাঁ, আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে। কি জিগগেস করতে চান, বলুন। জোলায়খা বললো, আমি প্রশ্ন করতে চাই, যখন আমি আপনাকে কয়েদখানায় আওয়ায দিয়েছিলাম, তখন উযরা বলে আপনি উঠে আবার পড়ে গিয়েছিলেন।’
হাঁ আমার মনে আছে।’ নয়ীম জওয়াব দিলেন।
আমি জানতে পারি, সে খোশনসীব কে? জোলায়খা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলো।
‘আপনি ভুল করছেন। সে হয়তো অতোটা খোশনসীব নয়।’
তিনি যিন্দাহ আছেন?
‘সম্ববত।’
‘খোদা করুন, তিনি যেন যিন্দাহ থাকেন। কোথায় তিনি? আমার পথ থেকে বহুত দূর না হলে আমি তাকে দেখে যেতে চাই একবার। আপনি আমার আবেদন কবুল কববেন?
আপনি সত্যি সত্যি সেখানে যেতে চান?
‘আপনি অপছন্দ না করলে আমি খুবই খুশী হবো।’
‘বহুত আচ্ছা। এ সিপাহী আপনাকে আমার ঘরে পৌঁছে দেবে। আমি ফিরে আসা পর্যন্ত আপনি ওখানে থাকবেন। কোনো কারণে দেরী হলে সম্ভবত পথেই এসে আমি মিলবো আপনাদের সাথে।
তিনি আপনার মার কাছেই আছেন কি? আপনাদের কি শাদী হয়েছে?
না’ কিন্ত সে প্রতিপালিত হয়েছে আমাদেরই ঘরে। এই কথা বলে নয়ীম সিপাহীদের লক্ষ্য করে হুকুম দিলেন, যেনো জোলায়খাকে বসরায় পৌঁছে না দিয়ে তার বাড়িতেই পৌঁছে দেওয়া হয়। নয়ীম খোদা হাফিজ বলে চলে যাচ্ছিলেন, কিন্তু জোলায়খার অনুনয় ভরা দৃষ্টি আর একবার তার পথ রোধ করলো। জোলায়খা চোখ নীচু করে ডান হাত দিয়ে একখানা ধনজর নয়ীমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, আপনার হাতিয়ারের ভিতর থেকে এই খনজর আমি নিজের কাছে রেখেছিলাম কল্যাণ নিদর্শন হিসেবে। হয়তো এর প্রয়োজন হবে আপনার।
যদি ওটাকে আপনি কল্যাণ নিদর্শন বলেই মনে করে থাকেন, তা হলে আমি খুশী হয়েই আপনাকে ওটা পেশ করছি। আপনি ওটা হামেশা কাছে রাখবেন।
‘শোকরিয়া। আমি ওটা হামেশা নিজের কাছে রাখবো। হয়তো কখনো এটা আমার কাজে লাগবে। নয়ীম তখন তার কথায় ততোটা মনোযোগ না দিয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হলেন, কিন্ত পরে বহুক্ষণ তার কথাগুলো বাজতে লাগলো তার কানের মধ্যে।
*
জোলায়খাকে এই ছোটখাটো কাফেলার সাথে পাঠিয়ে দিয়ে নয়ীম রওয়ানা হলেন ইসহাকের পিছু ধাওয়া করতে। প্রত্যেকটি চৌকিতে ঘোড়া বদল করে ইসহাকের সন্ধান করতে করতে তিনি ছুটে চললেন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। দুপুর বেলা তার সামনে এক সওয়ার তার নযরে পড়লো! নয়ীম তার ঘোড়ার গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন। আগের সওয়ার নয়ীমের দিকে ফিরে তাকিয়ে ঢিলে করে দিলো তার ঘোড়ার বাগ। কিন্তু পিছনের সওয়ারের ঘোড়া অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আসছে, দেখে সে কি যেনো ভেবে ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিলো। নয়ীম দূর থেকেই ইসহাককে চিনে ফেলেছেন। তিনি লৌহ শিরস্ত্রাণ নীচু করে দিয়ে মুখ ঢেকে নিলেন। নয়ীমকে কাছে আসতে দেখে ইসহাক রাস্তা থেকে কয়েক কদম সরে একদিকে দাঁড়ালো। নয়ীমও তার কছে গিয়েই ঘোড়া থামালেন। উভয় সওয়ার মুহূর্তের জন্য পরস্পরের মুখোমখি হয়ে দাঁড়ালেন নির্বাক হয়ে। শেষ পর্যন্ত ইসহাক প্রশ্ন করলো, আপনি কে? আর কোথায় যাবার ইরাদা করেছেন?
‘সেই একই প্রশ্ন আমিও তোমায় জিগগেস করতে চাচ্ছি। নয়ীম বললেন।
নয়ীমের কণ্ঠস্বরের কঠোরতা এবং আপনির মোকাবেলায় তুমি’ বলতে দেখে ইসহাক পেরেশান হয়ে উঠলেন কিন্তু শিগগিই পেরেশানি সংযত করে বললো, আপনি আমার প্রশ্নের জওয়াব না দিয়ে আর একটি প্রশ্ন করে বসেছেন।
নয়ীম বললেন, ভালো করে তাকাও আমার দিকে। তোমার দুটি প্রশ্নের জবাব মিলে যাবে।’ কথাটি বলেই নয়ীম এক হাত দিয়ে তার মুখের আবরণ খুললেন।
‘তুমি…… নয়ীম?’ ইসহাকের মুখ থেকে অলক্ষ্যে বেরিয়ে এলো।
হাঁ তাই….। নয়ীম তার লৌহ-শিরস্ত্রাণ আবার নীচু করে দিয়ে বললেন। ইসহাক তার ভীতি সংযত করে আচানক ঘোড়ার বাগ টেনে পিছু হটালো। নয়ীমও এক হাতে ঘোড়ার বাগ ও অপর হাতে নেয়াই সামলে নিয়ে তৈরী হয়ে গেছেন ইতিমধ্যে। দুজনই প্রতীক্ষা করছেন পরস্পরের হামলার। আচানক ইসহাক নেযাহ বাড়িয়ে দিয়ে ঘোড়া হাকালো সামনের দিকে। ইসহাকের ঘোড়ার এক লাফে নয়ীম এসে গেছেন তার নাগালের ভিতর, কিন্ত বিজলী চমকের মতো দ্রুতগতিতে তিনি একদিকে ঝুঁকলেন। ইসহাকের নোহ সরে গেলো তার রানে খানিকটা হালকা যখম করে। ইসহাকের ঘোড়া কয়েক কদম আগে চলে গেলো। নয়ীম তখখুনি তার ঘোড়া ঘুরিয়ে তার পিছনে লাগিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যে ইসহাক তার ঘোড়াটাকে বৃত্তাকার ঘুরিয়ে এনে আর একবার দাঁড়িয়ে গেলো নয়ীমের সামনে। উভয় সওয়ার একই সংগে নিজ নিজ ঘোড়া হাকিয়ে নেয়াহ সামলাতে সামলাতে এগিয়ে গেলেন পরস্পরের দিকে। নয়ীম আর একবার আত্মরক্ষা করলেন ইসহাকের আক্রমণ থেকে। কিন্তু এবার নয়ীমের নেযাহ ইসহাকের সীনা পার হয়ে চলে গেছে। ইসহাককে খাক ও খুনের মধ্যে তড়পাতে দেখে নয়ীম ফিরে চললেন। পরের চৌকিতে গিয়ে তিনি যোহরের নামায আদায় করলেন। তারপর ঘোডা বদল করে তিনি এক লহমা সময় নষ্ট না করে চললেন গন্তব্য পথে। যে চৌকি থেকে জোলায়খাকে বিদায় দিয়ে তিনি ইসহাকের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন, সেখানে পৌঁছে জানলেন যে, ইবনে সাদেক তার দলবল নিয়ে চলে গেছে কেল্লা ছেড়ে। তাদের পিছনে ছুটে বেড়ানো নয়ীমের কাছে মনে হলো নিল। তখনো সন্ধ্যার কিছুটা দেরী। এক সিপাহীর কাছ থেকে কাগজ কলম চেয়ে নিয়ে নয়ীম এক চিঠি লিখলেন মুহম্মদ বিন কাসিমের নামে। সিন্ধু থেকে বিদায় নিয়ে আসার পর ইবনে সাদেকের হাতে গ্রেফতার হওয়ার কাহিনী তিনি সবিস্তারে লিখলেন তার চিঠিতে। তিনি তাকে ইবনে সাদেকের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত হবার জন্য তাগিদ করলেন। তিনি দ্বিতীয় চিঠি লিখলেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নামে। ইবনে সাদেককে অবিলম্বে গ্রেফতার করবার জরুরী ব্যবস্থা করার তাগিদ দিলেন তাকে। চিঠি দুটো চৌকিওয়ালাদের হাতে সোপর্দ করে দিয়ে নয়ীম তাদেরকে দ্রুত পৌঁছে দেবার নির্দেশ দিয়ে আবার ঘোড়ায় সওয়ার হলেন।
