আরো বেশি আলো দেখা দেবার পর তারা ঘোড়ার গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন। জোলায়খা ঘোড়ায় চড়ে খুব ভালো চলতে পারে দেখে নয়ীম ছুটে চললেন আরো দ্রুত গতিতে। প্রায় দু’ক্রোশ চলবার পর হঠাৎ নয়ীমের মাথায় এক খেয়াল এলো এবং তিনি ঘোড়া থামালেন। জোলায়খা তার দেখাদেখি থেমে পড়লো। নয়ীম জোলায়খাকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, ইসহাক মুহম্মদ বিন কাসিমকে কতল করবার ইরাদা নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেছে?
‘হা, সে সন্ধ্যাবেলায় রওয়ানা হয়ে গেছে। জোলায়খা জওয়াব দিলো। তা হলে বেশি দূর যায়নি সে। বলে নয়ীম ঘোড়ার গতি বাঁ দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। জোলায়খা কোন প্রশ্ন না করে তার পিছু পিছু ঘোড়া ছুটালো।
সূর্যোদয়ের খানিকক্ষণ পর নয়ীম এসে পৌঁছলেন এক চৌকিতে। পাহাড়ী লোকদের হামলা প্রতিরোধ করবার জন্য সেখানে ছিলো ত্রিশজন সিপাহী। নয়ীম ঘোড়া থেকে নামলেন। এক বুড়ো সিপাহী নয়ীমকে চিনতে পেরে এগিয়ে এসে তাকে কোল দিলো। বুড়ো সিপাহীটি নয়ীমের পাশের বস্তির বাসিন্দা। খুশীর জোশে সে নয়ীমের পেশানীতে হাত বুলিয়ে বললো আলহামদুলিল্লাহ, আপনি নিরাপদে আছেন। এতদিন কোথায় ছিলেন আপনি? আমরা দুনিয়ার প্রতি কোণে খুঁজে বেড়িয়েছি আপনাকে। আপনার ভাইও আপনার খোঁজে গিয়েছিলেন সিন্ধতে। আপনার দোন্ত মুহম্মদ বিন কাসিম আপনার সন্ধানের জন্য পাঁচ হাজার আশরফী পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। আমরা সবাই হতাশ হয়ে গিয়েছি। শেষ পর্যন্ত কোথায় ছিলেন আপনি?
নয়ীম জওয়াব দিলেন, এসব প্রশ্নের জওয়াব দিতে বহু সময়ের প্রয়োজন। এখন আমি খুব তাড়া হুড়ায় রয়েছি। আপনি আমায় বলুন, আজ রাত্রে অথবা ভোর বেলায় একটি বলিষ্ঠ দেহ লোক এই পথ দিয়ে গিয়েছে কি?
সিপাহী জওয়াব দিলো, হাঁ, সূর্যোদয়ের খানিকক্ষণ আগে একটি লোক এখন থেকে গেছে। সে বলছিলো দামেস্ক থেকে খলিফাতুল মুসলেমীন এক খাস পয়গাম নিয়ে তাকে পাঠিয়েছেন সিন্ধুর পথে মুহম্মদ বিন কাসিমের কাছে। লোকটি এখান থেকে ঘোড়া বদল করে নিয়েছে।’
‘লোকটি গন্দমী রঙের? নয়ীম প্রশ্ন করলেন।
‘জি হাঁ, সম্ভবতঃ তার রঙ গন্দমী।’ বুড়ো সিপাহী জওয়াব দিলো।
বহুত আচ্ছা।’ নয়ীম বললেন, আপনাদের মধ্যে একজন সোজা উত্তর পূর্বে চলে গিয়ে কয়েক ক্রোশ দূরে পাহাড়ের উপর দেখতে পাবেন গাছ-পালায় ঢাকা এক কেল্লা। যে লোকটি যাবে সে কাছে গিয়ে দেখরে, কেল্লার বাসিন্দারা কেল্লা ছেড়ে চলে গেছে কিনা। আমার বিশ্বাস, তার যাবার আগেই ওরা কেল্লা খালি করে চলে যাবে। কিন্তু আমি জানতে চাই, ওরা কোন দিকে যাচ্ছে। এর জন্য দরকার একটি হুঁশিয়ার লোক।’
আমি যাচ্ছি,বলে এক নওজোয়ান এগিয়ে এলো।
হাঁ, যাও। যদি ওরা আগেই কেল্লা খালি করে গিয়ে থাকে, তাহলে ফিরে এসো, নইলে তাদের গতিবিধির খেয়াল রাখবে। নয়ীম বললেন।
নওজোয়ান ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ছুটে চললো। নয়ীম বাকী সিপাহীদের ভিতর থেকে বিশজনকে বাছাই করে নিয়ে হুকুম দিলেন, তোমরা সম্মানিত মহিলার সাথে বসরা পর্যন্ত যাবে এবং সেখানে পৌঁছে আমার তরফ থেকে গভর্নরকে বলবে যে, একে ইযযত ও শ্রদ্ধার সাথে দামেস্কে পৌঁছে দিতে হবে। পথের চৌকিগুলো থেকে যত সিপাহী সংগ্রহ করা সম্ভব, তোমাদের সাথে সামিল করে নেবে। সম্ভবত এক ভয়ানক দুশমন এর অনুসরণ করবে। বসরার ওয়ালীকে বলবে, তিনি যেনো এর সাথে কমসে কম একশ সিপাহী রওয়ানা করে দেন। তোমরাও হুঁশিয়ার থাকবে। এর দুশমনদের সাথে মোকাবিলা করবার সম্ভাবনা এলে তোমাদের সব চাইতে ফরয হবে এর জান বাঁচানো। পথে এর তকলীফ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখবে।’ হুকুম পেয়ে সিপাহী ঘোড়ার যিন লাগাতে ব্যস্ত হলো। নয়ীম ঘোড়া থেকে নেমে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নামে একটি চিঠি লিখে তাতে তার জন্য জোলায়খার কোরবানীর কথা জানিয়ে তাকে ইযযত ও শ্রদ্ধার সাথে দামেস্কে পৌঁছে দেবার আবেদন জানালেন। চিঠিখানা এক সিপাহীর হাতে দিয়ে তিনি এসে দাঁড়ালেন জোলায়খার কাছে। জোলায়খা তখনো মাথা নীচু করে বসে রয়েছে ঘোড়ার উপর। নয়ীম খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আপনাকে বিষণ্ণ মনে হচ্ছে। কোনো চিন্তা করবেন না। আমি আপনার হেফাজতের পুরো বন্দোবস্ত করে দিয়েছি। পথে কোনো কলফি হবে না আপনার। মনে করেছিলাম, আমিও আপনাদের সাথে বসরা পর্যন্ত যাবো, কিন্তু আমি নিরুপায়।
‘কোথায় যাবেন আপনি’? জোলায়খা বললেন।
আমায় এক দোস্তের জান বাঁচাতে হবে।
আপনি ইসহাকের পিছু ধাওয়া করতে যাচ্ছেন?
‘হাঁ, উম্মীদ রয়েছে, খুব শিগগিরই আমি তাকে ধরে ফেলবো।’
জোলায়খা তার অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে দুটি রুমালে ঢেকে বললো, আপনি সতর্ক হয়ে চলবেন।.ও যেমন বাহাদুর তেমনি প্রতারক।
আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার সাথীরা তৈরী হয়ে গেছে, আমারও দেরী হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা খোদা হাফিয। নয়ীম চলবার উপক্রম করেছেন। জোলায়খা অশ্রুভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ আওয়াজের বললেন, আমি একটা কথা আপনাকে জিগগেস করতে চাই।
হাঁ বলুন।
জোলায়খা চেষ্টা করেও বলতে পারে না। তার কালো চোখ থেকে উছলে উঠা অশ্রুর ফোঁটা পড়লো গাল বেয়ে।
বলুন।’ নয়ীম বললেন, আপনি আমায় কি প্রশ্ন করতে চেয়েছিলেন। আমি আপনার চোখের আসুর কদর ও কিম জানি, কিন্তু আপনি আমার নিরুপায় অবস্থার খবর জানেন না।
