নয়ীম প্রশ্ন করলেন, কে তুমি? তাহলে আমি কি স্বপ্ন দেখছি না?’
জোলায়খা চাপা আওয়াজে জওয়াব দিলো, না, এ স্বপ্ন নয়। কিন্তু আপনি পড়ে গেলেন কেন?
কখন?
‘এইতো এখনই, আমি আপনাকে যখন আওয়াজ দিচ্ছিলাম। আপনি ঘাবড়ে উঠলেন, তারপরই আবার পড়ে গেলেন।’
‘উহ্, আমি এক স্বপ্ন দেখছিলাম। আমি অনুভব করছিলাম, যেনো আমি অন্ধ হয়ে গেছি। উযরা আমায় ডাকছে আর আমি এগিয়ে যাচ্ছি তার দিকে। অমনি একটা কিছুতে ধাক্কা খেয়ে আমি পড়ে গেছি। কিন্তু আপনি এখানে?
জোলায়খায় বললো, আস্তে কথা বলুন। যদিও ওরা সবাই ঘুমিয়ে আছে এখন, তবু কারুর কানে আপনার আওয়াজ গিয়ে পৌঁছলে সব কৌশল ব্যর্থ হয়ে যাবে। নিজের সব যেওর দিয়ে আমি বহু কষ্টে পাহারাদারদের বাধ্য করে এ কুঠরীর দরজা খুলিয়েছি। আমাদের জন্য তারা দুটো ঘোড়া তৈরী করে রেখেছে। তারা কেল্লার দরজা খুলে দেবার ওয়াদা করেছে। আপনি উঠে হুঁশিয়ার হয়ে আমার সাথে চলুন। দু’টো ঘোড়া। কি জন্য?
‘আমি আপানার সাথে যাবো।
‘আমার সাথে?’ নয়ীম হয়রান হয়ে প্রশ্ন করলেন।
হ্যাঁ আপনার সাথে। আমার উম্মীদ, আপনি আমার হেফাযত করবেন। আমার বাপ-মার ঘর দামেস্কে। আপনি সেখানে পৌঁছে দেবেন আমায়।’
এ কেল্লায় কি করে এলেন আপনি?
জোলায়খা বললো, কথার সময় নেই এখন। আমিও আপনারই মতো এক বদনসীব।’
নয়ীম খানিকটা ইতস্তত করে বললেন, এখন আপনার আমার সাথে যাওয়া ঠিক হবে না। আপনি আশ্বস্ত হোন, কয়েকদিনের মধ্যেই আমি আপনাকে মুক্ত করবো এ লোকটির হাত থেকে।’
না, না, খোদার দিকে তাকিয়ে আমায় হতাশ করবেন না। জোলায়খা কেঁদে বললো, আপনার সাথেই যাবো আমি। আপনি চলে যাবার পর যদি ওরা জানতে পারে যে, আপনাকে আযাদ করবার ভিতরে আমার কোনো হাত ছিলো, তা হলে ওরা আমায় কতল না করে ছেড়ে দেবে না। আর তা না জানলেও আপনার চলে যাবার পর আপনার দিক থেকে বিপদের আশংকা করে ওরা কেল্লা ছেড়ে কোথাও অদৃশ্য হয়ে যাবে। তখন আমায় ওরা এমন এক পিঞ্জরে কয়েদ করবে, যেখানে পৌঁছা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে না। আপনি জানেন না, এ লোকটি যবরদস্তি করে আমায় শাদী দিতে চাচ্ছে ইসহাকের সাথে এবং সে ওয়াদা করেছে যে, মুহাম্মদ বিন কাসিমকে কতল করে আসতে পারলে আমায় তার হাতে সঁপে দেবে। খোদার ওয়াস্তে আমায় এ যালেম নেকড়ের হাত থেকে বাচাঁন। কথা কটি বলে সে নয়ীমের জামা ধরে হাঁপাতে লাগলো।
‘আপনি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে চলতে পারবেন?’ নয়ীম প্রশ্ন করলেন। জোলায়খা আশান্বিত হয়ে জওয়াব দিলো, আমি এ যালেমের সাথে ঘোড়ায় চড়ে প্রায় আধা দুনিয়া ঘুরেছি। এখন সময় নষ্ট করবেন না। আপনার তামাম হাতিয়াসহ এক পাহারাদার ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেল্লার বাইরে।
নয়ীম জোলায়খার হাত ধরে কুঠরীর দরজার দিকে গেলে বাইরের কারুর পায়ের আওয়াজ শোনা গেলো। তিনি থেমে গিয়ে চুপি চুপি বললেন, কে যেনো আসছে এদিকে।
এ কুঠরীর দু’জন পাহাদারকেই আমি কেল্লার দরজার পাঠিয়ে দিয়েছি। এ আর কেউ হবে। এখন কি হবে?
নয়ীম তার মুখে হাত রেখে দেয়ালের দিকে ঠেলে দিলেন। তারপর নিজে দরজার বাইরে উঁকি মেরে দেখতে লাগলেন। পায়ের আওয়াজ যতো নিকটতম হতে লাগলো, তার দীলের স্পন্দন ততো প্রবল হতে লাগলো। এক পাহারাদার দেয়ালের গা ঘেঁসে দরজার কাছে এসে মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়ালো। সাথে সাথেই নয়ীম তাকে ঘুষি লাগালেন এবং তার গর্দান নয়ীমের লৌহ কঠিন মুঠোর মধ্যে পিষ্ট হতে লাগলো। নয়ীম কয়েকটা ঝাঁকুনি দিয়ে বেঁহুশ অবস্থায় তাকে কুঠরীর ভিতর ঠেলে ফেললেন এবং জোলায়খার হাত ধরে বাইরে এসে দরজটা বন্ধ করে দিলেন।
কেল্লার দরজায় এক সিপাহী তার নযরে পড়লো। জোলায়খাকে দেখেই সে দরজা খুলে দিলো। আর একটি সিপাহী কেল্লার বাইরে নয়ীমের হাতিয়ার আর ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে। নয়ীম হাতিয়ার বেঁধে জোলায়খাকে এক ঘোড়ায় সওয়ার করে দিয়ে নিজে অপর ঘোড়ায় সওয়ার হলেন। কিন্তু কয়েক কদম চলেই তিনি ফিরে পাহারাদারদের বললেন, তোমরা কি নিশ্চিত জানো যে আমাদের জন্য তোমাদের জান বিপন্ন হবে না?’
পাহারাদার জওয়াব দিলো, আপনি আমাদের চিন্ত করবেন না। ওই যে দেখুন। সে একটি গাছের দিকে ইশারা করে বললো ‘ভোর হবার আগে আমরাও কয়েক ক্রোশ দূরে চলে যাবো। এ নেকড়ের দলে আর আমাদের মন বসছে না।’ নয়ীম দেখলেন, গাছের সাথে আরো দুটি ঘোড়া বাঁধা।
দুর্গম পাহাড়ী পথের সাথে নয়ীমের পরিচয় নেই। সিতারার ঝলকে পথ দেখে তিনি এগিয়ে চলেছেন জোলায়খাকে নিয়ে। ঘন গাছপালার ভিতর দিয়ে কয়েক ক্রোশ চলবার পর তার নযরে পড়লো এক বিস্তীর্ণ ময়দান। কয়েক মাস পর তিনি খোলা হাওয়ায় এসে দেখছেন আসমানের দীপ্তিমান সিতারারাজির দৃশ্য। নির্জণ পথে মাঝে মাঝে শোনা যায় শিয়ালের ডাক। চাঁদের মুগ্ধকর আলোর বন্যা গাছের পাতায় পাতায় দীপ্তিমান জোনাকীর দল, হালকা হালকা ঠান্ডা সুরভী হাওয়া-মোটকথা, সেই রাতের সবকিছুই যেনো নয়ীমের কাছে অসাধারণ আনন্দদায়ক মনে হতে লাগলো। খানিকক্ষণ পরেই ভোরের রোশনী রাত্রির কালো পর্দা ভেদ করে উঁকি মারতে শুরু করলো। আলো-আঁধারে নয়ীমের চোখে দেখা দিলে একদিকে সারি সারি পাহাড় শ্ৰেণী, আর একদিকে ময়দানের আবছা দৃশ্য। তিনি জোলায়খার দিকে তাকালেন। তার রূপ ও আকৃতি সেই অস্পষ্ট দৃশ্যরাজিকে যেনো আরো মোহময় করে তুলেছে। নয়ীমের কাছে সে যেনো প্রকৃতির দৃশ্য পরিক্রমারই একটা অংশ। জোলায়খাও তার সাথীর দিকে তাকিয়ে লজ্জায় গদান নীচু করলো। সে কি করে ইবনে সাদেকের হাতে পড়েছিলো জানুতে চাইলেন নয়ীম। তার জওয়াবে জোলায়খা তার মর্মন্তুদ কাহিনী আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলো। বলতে বলতে কয়েকবার সে আপনার অলক্ষ্যে কেঁদে ফেলেছে। নয়ীম বারবার তাকে দিয়েছেন। সান্তনা।
