জোলায়খা প্রতি রাত্রে কোনো না কোনো সময়ে আসে এবং খানাপিনার ব্যবস্থা ছাড়াও নয়ীমের অন্ধকার কুঠরীতে রেখে যায় খানিকটা আশার কিরণ।
চারদিন পর আবার নয়ীমকে হাযির করা হলো ইবনে সাদেকের সামনে। ইবনে সাদেক তার শারীরিক অবস্থায় বিশেষ কোনো পরিবর্তন না দেখে হয়রান হয়ে বললো, ‘তোমার জান বড্ড শক্ত। হয়তো খোদার মনযুর, তুমি যিন্দাহ থাকবে। কিন্তু তুমি নিজ হাতে নিজের মওত খরিদ করছে। আমি এখনো তোমায় চিন্তা করবার মওকা দিচ্ছি। আমার একিন রয়েছে যে, তোমার ভাগ্যের সিতারা খুবই বুলন্দ। কোনো বড় কর্তব্য সাধনের জন্যই পয়দা হয়েছো তুমি। আমি তোমায় সেই উচ্চস্তরে পৌঁছাবার ওয়াদা করছি, যেখানে তোমার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না তামাম ইসলামী দুনিয়ায়। আমি তোমার দিকে প্রসারিত করছি দোস্তির হাত আর এই-ই হচ্ছে শেষ মওকা। এখনো তুমি আমার আন্তরিকতাকে উপেক্ষা করলে পস্তাবে শেষ পর্যন্ত।
নয়ীম বললো, ইতর কুত্তা কোথাকার! আমায় বারংবার কেন বিরক্ত করছো?
‘এ ইতর কত্তার কামড় কখনো সুখের হবে না। তোমায় কামড়ে দেবা জন্য এ ইতর কুত্তার মুখ খুলবার সময় হয়েছে এখন। অপরিণামদর্শী যুবক! একবার চোখ খুলে দেখে নাও, দুনিয়া কতো সুন্দর। চেয়ে দেখো, পাহাড়ের দৃশ্য কতো মুগ্ধকর। যে সক:জিনিস দেখবার ইচ্ছা জাগে, আজই ভাল করে দেখে নাও + দীলের উপর সব কিছুর ছবি ভাল করে এঁকে নাও। কাল সূর্যোদয়ের আগেই উপড়ে ফেলা হবে তোমার চোখ। আর ও কান দুটো দিয়েও আর কিছু শুনতে পাবে না কখনো। যা কিছু দেখতে চাও, আজই দেখে নাও; যা কিছু শুনতে চাও, শুনে নাও।’ বলে সে সিপাহীদের হুকুম দিলো এবং তারা নয়ীমকে খুঁটির সাথে বেঁধে দিলো।
“হ্যাঁ, এবার বলো, চোখের দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবার আগে কোন জিনিস তুমি দেখতে চাও।’
নয়ীম নীরব রইলেন।
ইবনে সাদেক বললো, তুমি জান,আমার ফয়সালা অটল। আজ সারাদিন তোমার এখানেই কাটিয়ে দেবার ব্যবস্থা হবে। এই সময়টার ফায়দা নিয়ে নাও। যা কিছু আসবে তোমার সামনে, ভালো করে দেখে নাও, আর যে সুর ঝংকার বাজবে তোমার সামনে, প্রাণ ভরে শুনে নাও।’
ইবনে সাদেক হাততালি দিলো। অমনি কয়েকটি লোক সেখানে এসে হাজির হোল বাদ্য বাজনার নানা রকম সরঞ্জাম নিয়ে। ইবনে সাদেকের ইশারায় তারা বসে গেলো একদিকে।
আস্তে আস্তে সুর-ঝংকার বুলন্দ হতে লাগলো। এর পর বহু বিচিত্র বর্ণের লেবাসে সজ্জিত কয়েকটি নারী এককোণ থেকে বেরিয়ে এসে নাচতে শুরু করলো নয়ীমের সামনে। নয়ীমের ন্যর তখন নীচে তার পায়ের দিকে। তার কল্পনা তখন তাঁকে নিয়ে গেছে বহুক্রোশ দূরে এক বস্তির পথে।
মজলিস বসরার পর কয়েক মূহুর্ত চলে গেছে। হঠাৎ কয়েকটি দ্রুতগামী ঘোড়ার পায়ের আওয়াযে মজলিসে হাজির লোকেরা চমকে উঠলো। ইবনে সাদেক উঠে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো; ইসহাক পৌঁছে গেছে বলে খবর দিলো এক হাবশী গোলাম।
ইবনে সাদেক নয়ীমকে লক্ষ্য করে বললো, নওজোয়ান, হয়তো তুমি এখন খুব আনন্দের একটি খবর শুনবে।’
খানিকক্ষণ পর ইসহাক এক তশতরী হাতে নিয়ে ভিতরে ঢুকে সসম্ভ্রমে ইবনে সাদেকের সামনে রাখলো। ইবনে সাদেক উপরের রুমালখানা তুললে নয়ীম দেখলেন, তাতে একটি মানুষের মস্তক।
হয়তো এটি দেখে তুমি খুশী হবে। বলে ইবনে সাদেক এক হাবশীকে ইশারা করলো। হাবশী তশতরী তুলে নয়ীমের কাছে নিয়ে রাখলো যমিনের উপর। তশতরীতে রাখা মস্তকটি চিনতে পেরে নয়ীমের দীলে লাগলো এক প্রচন্ড আঘাত। ইবনে আমেরের মস্তক! শুকিয়ে যাওয়া মুখের উপর তখনো খেলছে এক অপূর্ব হাসির রেখা। নয়ীম অশ্রুসজল চোখ দুটি বন্ধ করলেন। জোলায়খ ইবনে সাদেকের পিছনে দাঁড়িয়ে দেখছে মর্মবিদারক দৃশ্য! ধৈর্য ও মহিমার প্রতিমূর্তি নয়ীমের চোখে অশ্রুধারা দেখে তার কলজে ফেটে যাচ্ছে।
ইবনে সাদেক আসন ছেড়ে উঠলো। ইসহাকের কাছে গিয়ে পিঠ চাপড়ে দিয়ে সে বললো, ইসহাক! এখন আর একটিমাত্র শর্ত বাকী। আমি চাই মুহম্মদ বিন কাসিমের মস্তক এই নওজোয়ানের সাথে দাফন করতে। যদি সে অভিযানে কামিয়াব হয়ে ফিরে আসতে পার তুমি, তাহলে জোলায়খা হবে তোমারই। তাকে তোমার মতো বাহাদুর নওজোয়ানের জীবনসঙ্গিনী করে দিতে আর কোনো বাধা থাকবে না।
বলতে বলতে ইবনে সাদেক ফিরে জোলায়খার দিকে তাকালো। জোলায়খা অশ্রুভরা চোখে চলে গেলো নিজের কামরার দিকে। ইবনে সাদেক নয়ীমের কাছে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলো, আমি জানি, ইবনে কাসিমের প্রতি তোমার অশেষ মুহব্বত। যদি কোনো কারণে তার মস্তক এখানে পৌঁছা পর্যন্ত তুমি যিন্দাহ না থাকতে পার, তা হলে আমি ওয়াদা করছি, তার মস্তক তোমারই সাথে দাফন করা হবে।
ইবনে সাদেকের হুকুম সিপাহীরা নয়ীমকে রেখে গেলো কয়েদখানায়।
*
রাতের বেলা নয়ীম বহুক্ষণ কয়েদখানার চার দেওয়ালে মধ্যে ঘুরতে লাগলেন অস্থির চঞ্চল হয়ে। তার দীল দীর্ঘকালের আত্মিক ও দৈহিক ক্লেশ সহ্যকরে নির্বিকার হয়ে উঠেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও চোখ ও কান থেকে বঞ্চিত হবার শাস্তির কল্পনা করাটা খুব মামুলী ব্যাপার নয়। প্রতি মুহূর্তে তার মনের চাঞ্চল্য বেড়ে চলেছে। কখনো তার মনে কামনা জাগে, এ রাত্রি কিয়ামতের রাত্রির মতো দীর্ঘ হোক, আবার কখনো তার মুখ থেকে দোআ বেরিয়ে আসে, এখনই ভোর হয়ে প্রতীক্ষার দীর্ঘ রাত্রির অবসান হোক। টহল দিয়ে বেড়াতে বেড়াতে তিনি ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লেন। খানিকক্ষণ পাশ ফিরবার পর মুজাহিদদের চোখে নামলো ঘুমের মায়া। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, ভোর হয়ে এসেছে এবং তাকে কুঠরী থেকে বের করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে এক গাছের সাথে। ইবনে সাদেক হাতে খঞ্জর নিয়ে এগিয়ে আসছে। সে তার চোখ দুটি উপড়ে ফেলছে। চারদিক ছেয়ে নেমে আসছে ঘন অন্ধকার। তারপর তা হচ্ছে একটি তরল পদার্থ। শাঁই শাহঁ করছে তার কানের ভিতর। তিনি কিছুই শুনতে পারছেন না। ইবনে সাদেকের সিপাহী তাঁকে সেখান থেকে এনে ফেলে যাচ্ছে কুঠরীর ভিতরে। সেখান থেকে বেরিয়ে যাবার পথ তার নজরে আসছে না। সিপাহী আর একবার এসে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কুঠরীর বাইরে; তারপর তাঁকে ফেলে আসছে খানিকটা দূরে। তারপর তিনি অনুভব করছেন, যেনো সহসা খুলে গেলো তার কানের পর্দা। পাখিদের কলকালি আর হাওয়ার শাঁ শাঁ আওয়াজ আসছে তার কানে। উযরা নয়ীম নয়ীম’ বলে ডাকছে তাঁকে। যেদিক থেকে উযরার আওয়াজ আসছে, তিনি উঠে কদম ফেললেন-সেদিকে কিন্তু কয়েক পা চলবার পর পা কাঁপতে কাঁপতে তিনি পড়ে যাচ্ছেন যমিনের উপর। আবার ফিরে আসছে তার চোখের দৃষ্টি। তিনি দেখছেন, উযরা তার সামনে দাঁড়িয়ে। আবার উঠে তিনি উযরা উযরা’ বলে দু’হাত প্রসারিত করে এগিয়ে যাচ্ছেন তার দিকে, কিন্তু কাছে গিয়ে ভালো করে তাকিয়ে দেখে তিনি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার স্বপ্নের শেষাংশ বাস্তব সত্য হয়ে উঠেছে, কিন্তু উযরার পরিবর্তে কুঠরীর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে তারই মতো রূপ ও সৌন্দর্যের আর এক মূর্ত প্রতীক। দেয়ালের ছিদ্রপথ দিয়ে তার মুখে এসে পড়ছে চাঁদের রোশনী। খানিকক্ষণ ভালো করে তাকিয়ে দেখে তিনি চিনলেন সে ছায়া মূর্তিটি জোলায়খা, কিন্তু বহুক্ষণ পেরেশান অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকে তিনি অনুভব করতে লাগলেন যেনো তিনি স্বপ্ন দেখছেন। ধীরে ধীরে তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হতে লাগলো। কয়েকবার চোখ মেলে নিজের শরীরে হাতের স্পর্শ অনুভব করতে তার মনে হলো, এ স্বপ্ন নয়-বাস্তব সত্য।
