ইবনে সাদেক কিছুটা দমে গিয়ে বললো, কয়েকদিনের মধ্যেই তুমি এমন সব কাজ করতে রাযী হবে, যা দেখে শয়তানও শরম পাবে।’
এই কথা বলে সে তার চারপাশে বসা লোকদের দিকে তাকালো এবং ইসহাক নাম ধরে এক ব্যক্তিকে ডাকলো। যে সুগঠিত দেহ জোয়ান তাকে প্রতারণা করে গ্রেফতার করেছে, আওযায় শুনে সেই লোকটিই এগিয়ে এলো সামনে। নয়ীম প্রথমবার জানলেন যে, লোকটির নাম ইসহাক!
ইবনে সাদেক বললেন, ইসহাক! এর মাথাটা ঠিক করে দাও।’
ইবনে সাদেকের হুকুমে নয়ীমকে আঙিনায় এক খুটির সাথে বাঁধা হলো। লোকটি এগিয়ে গিয়ে নয়ীমের গায়ের জামা ছিঁড়ে ফেললো। তারপর সে এক রক্তপিপাসু নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে কোড়া বর্ষণ করতে লাগলো নয়ীমের উলংগদেহের উপর। নয়ীম কোনো আওয়ায না করে মযবুত পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে কোড়া খেতে লাগলেন। সামনের কামরা থেকে চুপি চুপি কদম ফে েএক বালিকা ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ালো ইবনে সাদেকের কাছে। সে কখনো বেকারার হয়ে তাকাঁচ্ছে নয়ীমের দিকে, আবার কখনো অনুনয়-ভরা দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে ইবনে সাদেকের দিকে। তার নাযুকদীল আর বরদাশত করতে পারছে না এ নিষ্ঠুর খেলা। অশ্রুভরা চোখে সে ইবনে সাদেকের দিকে তাকিয়ে বললো, চাচা লোকটি বেঁহুশ হয়ে যাচ্ছে।
হতে-দাও। ও যে সায়ফুল্লাহ। আমি ওর তেযী খতম করে তবে ছাড়বো।
‘চাচা!’
ইবনে সাদেক বিরক্ত হয়ে বললো, “চুপ করো জোলায়খা। এখানে কি চাও? যাও।’
জোলায়খা মাথা নীচু করে ফিরে গেলো। দু’একবার সে ফিরে তাকালো নয়ীমের দিকে। নিজের অক্ষমতা ও অসহায়তা মুখভংগীতে প্রকাশ করে সে অদৃশ্য হয়ে গেলো এক কামরার মধ্যে। আঘাতের তীব্রতায় বেঁহুশ হয়ে নয়ীমের গর্দান যখন ঢিলা হয়ে পড়লো, তখন তাকে আবার ফেলে রাখা হলো কয়েদখানায়।
নয়ীমকে কয়েকবার বাইরে নিয়ে কোড়া মারা হলো। তাতেও যখন তাঁর মনোভারের পরিবর্তন দেখা গেলো না, তখন ইবনে সাদেক হুকুম দিলো যে, কয়েকদিন তাকে ভুখা রাখতে হবে। নানা রকম শারীরিক কষ্ট সহ্য করার পর নয়ীমের ভিতরে পয়দা হলো এক অসাধারণ সহনশক্তি। তিনি ক্ষুধা ও পিপাসায় যখন রাতের বেলায় ঘুমোবার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন, তখন কে যেন কুঠরীর ছিদ্রপথ দিয়ে আওয়ায দিয়ে ভিতরে ফেলে দিলো কয়েকটি সেব ও আঙ্গুরফল।
নয়ীম হয়রান হয়ে উঠে ছিদ্রপথ দিয়ে বাইরে উঁকি মেরে দেখলেন। রাতের অন্ধকারে দেখা গেল কে যেন কয়েক কদম দূর গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তার লেবাস ও চলার ধরণ দেখে তিনি আন্দায করলেন, কোনো নারী রাতের অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে চলে যাচ্ছে। দরদী মেয়েটিকে চিনে নিতে তার মুশকিল ছিলো না মোটেই। কোড়ার ঘা খেতে গিয়ে কতোবার তিনি দেখেছেন এক যুবতাঁকে তার জন্য বেকারার হতে। তার নিষ্পাপ সুন্দর মুখের উপর যুলুম ও অসহায়তার চিহ্ন অংকিত হয়ে গেছে নয়ীমের দীলের ফলকে। কিন্তু কি তার পরিচয়? এ ভায়ানক জায়গায় কি করে সে এলো? নয়ীম এ সব প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করতে করতে একটি সেব তুলে নিয়ে খেতে লাগলেন।
নয়ীমের জন্য এতটা বেদনা-বোধ যে মেয়েটির, তার নাম জোলায়খা। জীবনের ষোলোটি বছর অন্তহীন মুসীবতের ভিতর দিয়ে কাটিয়েও সে ছিলো দৈহিক সৌন্দর্যের এক পরিপূর্ণ প্রতীক। প্রতিটি মানুষের প্রতি অন্তহীন বিদ্বেষ পোষণ করতে জোলায়খা। ইবনে সাদেকের সাহচর্যে সে কাটিয়েছে তার যিন্দেগীর তিক্ত মুহূর্তগুলো এবং হামেশা মানবতার নিকৃষ্ট রূপই রয়েছে তার চোখের সামনে। তাই প্রত্যেকটি মানুষই তার দৃষ্টিতে ছিলো ইবনে সাদেকের মত ধূর্ত, স্বার্থপর, নিষ্ঠুর কমিনা। শিকল-বাঁধা নয়ীমকে কেল্লায় আনতে দেখে প্রথমে তার মনে হয়েছে, একটি স্বার্থপর মানুষ একদল স্বার্থপর মানুষের কব্যয় এসে গেছে, কিন্ত নয়ীমকে ইবনে সাদেকের সাথী হতে অস্বীকার করতে দেখে তার পুরোনো খেয়াল বদলে গেছে। তার মনের হচ্ছে, যে দুনিয়ায় সে কাটিয়ে দিয়েছে তার যিন্দেগীর বৈচিত্রহীন দিন আর ভয়ানক রাতগুলো, সে দুনিয়ার বাসিন্দা নয় এ নওজোয়ান। তাঁর ঈমান আর তে দেখে সে হয়রান হয়ে গেছে। গোড়ার দিকে সে তাকে মনে করতো মযলুম-কৃপার পাত্র, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি তাঁর কাছে হয়ে উঠেছেন অন্তহীন শ্রদ্ধার দাবীদার।
বাপ-মায়ে মর্মান্তিক পরিণতির খবর জোলায়খা জানতো না তাদের সাথে মিলিত হবার কামনা জানিয়ে সে হয়ে গেছে হতাশ। তার কাছে দুনিয়া এক অবাস্তব স্বপ্ন আর পরকাল একটি নিছক কল্পনা।
ইবনে সাদেকের নির্মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের তুফান বারংবার তার আহত দীলকে তোলপাড় করে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। দরিয়ার বুকে ভাসমান মনযিল হারা মাল্লার মতো ঢেউয়ের আঘাতে মুহ্যমান সে হয়েছে সাঁতরে পার হবার বা ডুবে যাবার সম্ভাবনা সম্পর্কে বেপরোয়া এবং চোখ বন্ধ করে মুসীবতের তুফানের উপর দিয়ে সে ভাসিয়ে দিয়েছে। তার জীবন-তরী কোনো বিপদের পরোয়া না করে। কখনো কখনো চোখ খুলে হাল সামলাবার খেয়াল তার আসে, কিন্তু আবার হতাশা তাকে করে অভিভূত। এই ঘরছাড়া মাল্লাকে উপকূল বা মনযিলের নির্দেশ দেবার মতো দিশারীর ছিলো প্রয়োজন, আর প্রকৃতি সে ভার চাপিয়ে দিয়েছিলো নয়ীমের উপর। নয়ীমের সাথে মামুলী সম্পর্ক জোলায়খার দীলের ঘুমন্ত তুফানকে করে তুললো উত্তাল এবং ইবনে সাদেকের পাঞ্জা থেকে রেহাই পেয়ে নয়ীমের দুনিয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবার আকাংখা তার দীলকে করে তুললো চঞ্চল।
