ইবনে সাদেক বললো, তুমি মনে কর, দুনিয়ার সবচাইতে বড় শাস্তি মওত; কিন্ত আমি তোমার কাছে প্রমাণ করে দিতে চাই যে, দুনিয়ায় আরো বহুত শাস্তি রয়েছে, যা মওতের চাইতেও ভয়ানক। এমন শাস্তি আমি তোমায় দিতে পারি, যা, বরদাশত করবার মতো হিম্মৎ তোমার হবে না। তোমার যিন্দেগী আমি এমন তিক্ত করে তুলতে পারি যে, তোমার জীবনের প্রতি মূহূর্তে মওতের চাইতেও অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে। কিন্তু আমি তোমার দুশমন নই। তুমি যিন্দা থাক, এই আমি চাই। আমি তোমায় এমন এক যিন্দেগীর পথ বলে দিতে পারি, যা তোমার পরলোকের কল্পনার চাইতেও সুন্দর। যুদ্ধের বিপদ-মুসীবৎকে তুমি বরদাশত করে যাও, কেননা যিন্দেগীর আয়েশ-আরাম তোমার জানা নেই। জীবন উপভোগের স্বাদ পাওনি বলেই এমন আপন-ভোলা তুমি। দুনিয়ায় কয়েক বছরের যিন্দেগী খোদা তোমায় দিয়েছেন দুনিয়ার অসংখ্য নিয়ামত ভোগ করবার জন্য। তার কদর ও কীমৎ তোমার জানা নেই। তুমি বাহাদুর সত্যি, কিন্ত তোমার বাহাদুরী তোমায় কি শিখিয়েছে? তোমায় এমন সব লক্ষ্যের পথে জান দিতে শিখিয়েছে, যার সাথে তোমার ব্যক্তিত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। তোমার ধারণা, তুমি খোদার. রাহে কোরবান হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তোমার এ কোরবানীতে খোদার কোন প্রয়োজন নেই। তোমার কোরবানী থেকে যদি কারুর কোনো ফায়দা হাসিল হয় তা হয়ে থাকে খলিফা ও হাজ্জাজের-যারা ঘরে বসে বসে বিজয়ের খ্যাতি হাসিল করে থাকেন। তোমরা আত্মপ্রতারণা করে চলেছো। তোমার যৌবনদীপ্তি, চেহারা ও রূপ দেখে মনে হয় খাক ও খুনের মধ্যে লুটিয়ে পড়বার জন্য তৈরী হয়নি ও দেহ। তোমায় দেখলে মনে হয় এক শাহজাদা। তুমি রক্ত পিপাসু নেকড়ের জীবন যাপন করবে, এটাতো হতে পারে না। শাহাজাদার মতো যিন্দেগীই তোমায় মানায়। তুমি হবে এক সুন্দরী শাহজাদীর চোখের আলো, দীলের শান্তি। তোমার যিন্দেগীকে তুমি করে তুলতে পার এক রঙীন স্বপ্নে মতো সুন্দর মোহময়। তুমি ইচ্ছা করলে কঠিন মাটি, রুক্ষ পাথর আর পাহাড়ের শয্যার পরিবর্তে পেতে পার ফুল শেজ। দুনিয়ার অসংখ্য আয়েশ-আরাম দৌলতের বিনিময়ে খরিদ করা যায়। ইচ্ছা করলে দুনিয়ার ধানভান্ডার তুমি আপনার করে নিতে পার, দুনিয়ার সবচাইতে সুন্দরী নারীকে করে নিতে পার তোমার শয্যাসংগীনী। কিন্ত সে পথ তোমার কাছে অজানা। সুন্দরী নারীর কেশের খোশবুতে মাতাল হয়ে বেঁচে থাকতে তুমি শেখোনি। দুনিয়ার আড়ম্বর দেখনি বলেই আত্মভোলা হয়ে খুশী হচ্ছো তুমি।
নওজোয়ান! তোমার জন্য বহুত কিছু করতে পারি আমি। আহা! তুমি যদি আমার সহকর্মী হতে! আমরা বনু উম্মিয়ার হুকুমাত খতম করে দিয়ে কায়েম করবো এক নয়া বিধান। আমার ইকিন রয়েছে যে, খলিফা ও হাজ্জাজের ক্ষমতা গর্বিত মস্তক ভূতলশায়ী করবার চেষ্টায় আমি কামিয়াব হবো। তোমার হয়তো মনে পড়ে, আমি সেই ইবনে সাদেক, বসরার আম জলসায় তুমি যার মোকাবিলা করেছিলো, কিন্তু আমি তোমায় নিশ্চিত বলে দিচ্ছি যাতে কমযোর তুমি আমায় ভেবেছো, আমি তা নই। এইটুকু জেনে রাখাই তোমার পক্ষে যথেষ্ট হবে যে, আমার পিছনে রোমের সীজারের মতো লোকও মওজুদ রয়েছেন। আরব ও আজমে এক যবরদস্ত ইনকিলাব পদয়া করবার জন্য আমি শুধু সময়ের প্রতীক্ষা করছি। বহুদিন ধরে তোমার মতো কথার যাদুকরের সন্ধান করে ফিরেছি আমি। তোমায় আমি দেখাতে চাই সেই কর্মের ময়দান। সেখানে তুমি খোদার দেওয়া শৌর্য-বীর্য পূর্ণ প্রয়োগ করতে পারবে। তোমার মতো নওজোয়ান মামুলী সিপাহী হিসাবে খুশী হয়ে না থেকে হবে খিলাফতের দাবীদার।’
নয়ীমকে নির্বাক হয়ে থাকতে দেখে ইবনে সাদেক ভাবলো যে, তিনি তার প্রতারণাজালের মধ্যে এসে গেছেন। তাই গলার আওয়াটা খানিকটা নরম করে সে বললো, আমার সাথে যদি তুমি বিশ্বস্ত থাকবার প্রক্রিতি দাও, তাহলে আমি তোমার শিকল এখনই খুলিয়ে দিচ্ছি। বলল, তোমার ইরাদা কি? তোমার সামনে যিন্দেগীর পথ দুটো। বলল, তুমি যিন্দেগীর নিয়ামত পূর্ণরূপে করতে চাও, না এই অন্ধকার কুঠরীতে তোমার যিন্দেগীর বাকী দিনগুলো কাটিয়ে দিতে চাও এমনি করে?
নয়ীম গর্দান উপরে তুললেন। তাঁর মুখে তখন অন্তরের অপরিসীম যাতনার অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। তিনি জোশের সাথে জওয়াব দিলেন, তোমার কথা আমার কাছে যখমী কুত্তার চীৎকারের চাইতে বেশি কোনো অর্থ রাখে না। তুমি জানো না, আমি যার গোলাম, তিনি যমিনের অণু থেকে শুরু করে আসমানের সিতারা পর্যন্তের মালিক হয়েও তিনদিন পেটে পাথর বেঁধে রয়েছেন। তুমি আমায় দৌলতের মোহে প্রলুব্ধ করতে চাও? দুনিয়ার তামাম আরামেরই নাম যিন্দেগী। কিন্তু তলোয়ারের ছায়ায় আযাদীর শ্বাস গ্রহণ করে যে আয়েশ-আরাম পাওয়া যায়, তা তোমার মতো নীচ মানুষের কল্পনারও বহু উর্দ্ধে। আমায় তুমি খোদার রাস্তা থেকে সরিয়ে নিজস্ব জঘন্য উদ্দেশ্য হাসিল করবার সহকর্মী বানাতে চাও। তুমি জিহাদের বিরোধিতা কর, কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যর জন্য রক্তের নদী বইয়ে দিতে তোমার দ্বিধা নেই। যে সীজারের শক্তির উপর ভরসা তোমার, তার পূর্বপুরুষ কততবার আমাদের তলোয়ারের শক্তি পরীক্ষা করে দেখেছেন। এই মুহূর্তে আমি নিঃসন্দেহে তোমার হাতে রয়েছি, কিন্তু কয়েদ অথবা মৃত্যুর ভয় আমায় অচেতন বিবেকহীন করতে পারবে না কখনো। মুজাহিদদের যোগ্য নয়, এমন কোনো কাজের প্রত্যাশা তুমি করো না আমার কাছে।’
