ইবনে সাদেক বসরা থেকে পালিয়ে বাঁচলো এবং রমলায় খলিফার ভাই সুলায়মানের কাছে আশ্রয় নিলো। এক হাজারের জামাআত থেকে মাত্র কয়েকটি লোক গেলো তার সাথে।
সুলায়মানকে ওয়ালীআহাদের পদ থেকে বঞ্চিত করবার ব্যাপারে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ছিলেন খলীফার সমর্থক। তাই হাজ্জাজ ও তাঁর সাথীদের সুলায়মান মনে করতেন নিকৃষ্টতম দুশমন! হাজ্জাজের দুশমনদের তিনি গ্রহণ করতেন দোস্ত বলে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইবনে সাদেকের চক্রান্তের খবর পেয়েই তার পিছনে লাগিয়ে রেখেছিলেন একদল সিপাহী। রমলায় সুলায়মান তাকে আশ্রয় দিয়েছেন জেনেই তিনি সব অবস্থা জানালেন খলিফাঁকে। দরবারে খিলাফত থেকে সুলায়মানের কাছে হুকুম এলো, তক্ষুণি সাথীদের সহ ইবনে সাদেককে শিকল পরিয়ে পাঠাতে হবে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে। সুলায়মান ইবনে সাদেককে বন্ধু হিসাবে গ্রহন করেছেন এবং তার জান বাঁচাতে চান, তাই তিনি ইবনে সাদেককে ইসফাহানের দিকে সরিয়ে দিয়ে খলিফার দরবারে লিখে পাঠালেন যে, ইবনে সাদেক রমলা থেকে পালিয়ে গেছে। কয়েকদিন ইসফাহানে ঘুরে ফিরে ইবনে সাদেক ধরলো শীরাযের পথ। শীরায থেকে পঞ্চাশ ক্রোশ দক্ষিণ পূর্বে পাহাড়ের মাঝখানে পুরানো যামানার এক বিরাম কেল্লা। ইবনে সাদেক সেই কেল্লায় গিয়ে ফেললো স্বস্তির নিশ্বাস। তার সকল বিপদের দায়িত্ব নয়ীমের উপর চাপিয়ে সে তাঁকে এক অপমানকর শাস্তি দেবার কৌশল চিন্তা করতে লাগলো।
*
নয়ীম ইবনে সাদেকর সামনে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এক সিপাহী তাকে আচানক ধাক্কা মেরে উপুড় করে ফেলে দিয়ে বললো, “বেকুফ! এটা বসরার মসজিদ নয়। এ মুহূর্তে তুমি দাঁড়িয়ে আছ আমাদের আমীরের দরবারে। এখানে অপরাধীর মাথা কেটে ফেলা হয়।
ইবনে সাদেক ক্রোধ প্রকাশ করে বললো, ভারী বেকুফ তুমি। বাহাদুর লোকদের সাথে এমন ব্যবহার করে না কখনো।
এই কথা বলে ইবনে সাদেক আসন ছেড়ে উঠে বায়ুর সাহায্যে তাঁকে দাঁড় করিয়ে দিলো। মেঝের উপর পড়ে নয়ীমের নাক বেয়ে রক্ত ঝরছে তখন। ইবনে সাদেক নিজের রুমাল বের করে তাঁর মুখ মুছিয়ে দিলো।
তারপর তার দিকে বিদ্রূপভরা হাসিমুখে তাকিয়ে বললো, আমি শুনেছি, আপনি নাকি নেহায়েত বেকারার হয়ে আপনার মেযবানের নাম জানতে চেয়েছেন। আফসোস! আপনাকে দীর্ঘ সময় ইনতেযার করতে হয়েছে। আমারও ইচ্ছা ছিলো, খুব জলদী করে আপনার দেখতে হাযির হয়ে যিয়ারত করি, কিন্তু ফুরসত পাইনি। আজ আপনাকে দেখে আমার দীলে কি আনন্দ হয়েছে, তা আমিই জানি। আমি আশা করি, আপনিও পুরানো দোস্তের সাথে মিলিত হয়ে বহুত খুশী হয়ে থাকবেন। বলুন, তবিয়ত কেমন? আপনার মুখের রঙ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আমার ধারণা, এই কুঠরীর সংকীর্ণতা ও অন্ধকারে আপনার মতো মুজাহিদের তবিয়ত খুবই পেরেশান হয়ে উঠেছে। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না, এ ছোট-খাটো কেল্লায় কোনো বড়ো কুঠরী নেই। তাই আমার লোকেরা বাধ্য হয়ে ওখানেই রেখেছে আপনাকে। আজ আমি আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য এই কারণেই বাইরে আনিয়েছি, যাতে আলো অন্ধকারের পার্থক্য করবার ক্ষমতা আপনি হারিয়ে না ফেলেন। কিন্তু আপনি আমার দিকে এমন করে তাকাচ্ছেন, যেনো আমি আপনার অজানা তোক। আপনি আমায় চিনতে পারছেন না? আপনার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো বসরায়। যদিও আমাদের পয়লা মোলাকাত নেহায়েত অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির মধ্যে হয়েছে,তবু সেদিন থেকে আমাদের সম্পর্ক এমন নয় যে, আমরা এত শিগগিরই তা ভুলে যেতে পারি। বড় মুশকিলের ভিতর দিয়ে আমি আপনার সে বক্তৃতার তারিফ জানাবার এ মওকা পেয়েছি এবং আপনার মতো আত্মমর্যাদাবান মুজাহিদকে আব্দুল্লাহ বিন উবাইর উত্তারাধিকারীর সামনে এমনি করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার মনে জাগছে বহুত রহম। বলুন আপনার সাতে কিরূপ ব্যবহার করা যাবে? •
ইবনে সাদেকের প্রতিটি কথা নয়ীমের দীলের উপর বিধছে তীর ও ছুরির ফলার মতো। তিনি ঠোঁট কামড়ে বললেন, কয়েদ হবার জন্য আমার কোন দুঃখ নেই, কিন্ত তোমার মতো বুদীল ও কমিনার হাতে কয়েদ হয়েছি বলেই আমার যা দুঃখ। এখন তোমার মন যা চায়, তাই করো। কিন্তু মনে রেখো, আমার জিন্দেগী আর মওত দুই-ই তোমার জন্য বিপজ্জনক। এই মুহূর্তে আমার হাত শিকল বাঁধা, কিন্তু মনে রেখো, বন্দীদশা মুজাহিদকে বুদীল বানাতে পারেনা কখখনো!’
ইবনে সাদেক নয়ীমের শক্ত কথাগুলো শুনে বেপরোয়া মনেভাব প্রকাশ করে বললো, তুমি যেমন বাহাদুর, তেমনি বেকুফও। তুমি জানো না যে, এই মুহূর্তে তোমার মাথা রয়েছে এক আজদাহার মুখের মধ্যে। তোমার গ্রাস করা অথবা ছেড়ে দেওয়া নির্ভর করছে তারই মরীর উপর। আমার কয়েদখানা থেকে আযাদ হবার ধারণা দূর করে দাও দীল থেকে। এ কেল্লায় দু’শ সিপাহী প্রতিমূহূর্তে নাংগা তলোয়ার নিয়ে মওজুদ রয়েছে তোমার খোঁজখবর রাখবার জন্য।
এই কথা বলে ইবনে সাদেক হাততালি দিলো। অমনি কেল্লা বিভিন্ন কোণ থেকে বেরিয়ে এলো কতক সিপাহী নাংগা তলোয়ার হাতে। নয়ীমের চোখে তাদের প্রত্যেকেরই মুখ ইনে সাদেকের মতো নির্মম-নিষ্ঠুর।
নয়ীম বললেন, তুমি জানো, আমি বুযদীল নই। তোমরা কাছে আমি কখনও রহমের আবেদন করবো না। তুমি যদি আমার জান নিতে চাও, তার জন্য আমি তৈরী।’
