ইলিয়াস ছিলো এক দক্ষ রাজমিস্ত্রী। দামেস্কে তার প্রচুর আয়-রোযগারের পথ খুলে গেলো। সেখানে বাড়ি তৈরী করে তারা কাটাতে লাগলো তাদের যিন্দেগী। এক বছর পর তাদের ঘরে পয়দা হলো এক শিশু-কন্যা। তার নাম রাখা হলো জোলায়খা।
কঠিন সন্ধানের পর ইবনে সাদেক পেলো তাদের খোঁজ। সেও এসে হাযির হলো দামেস্কে। সেখানে তার মাশুক ও ভাইকে আয়েশ-আরামে যিন্দেগী কাটাতে দেখে তার দীলের মধ্যে জ্বলে উঠলো প্রতিহিংসার অগ্নিশিখা। কয়েকদিন সে ঘুরে বেড়ালো দামেস্কের অলিগলিতে। তাপর ইসলাম কবুল করে সে গিয়ে হাযির হলো দরবারে খিলাফতে। খলিফার কাছে মরিয়মকে দাবী করে সে আবেদন জানালো যে, তাকে ইলিয়াসের ঘর থেকে ছিনিয়ে এনে তার হাতে সপে দেওয়া হোক। দরবারে খিলাফত থেকে হুকুম হলো যে, ইহুদী ও ঈসায়ীরা মুসলমানদের আমানত। তাছাড়া মরিয়ম তার নিজের মর্যী মতো শাদী করেছে, তাই তাকে বাধ্য করা যাবে না। হতাশ ইবনে সাদেক এরপর না রইলো ইহুদী, না ঈসায়ী আর না মুসলমান। চারদিকের হতাশা তার দীলের মধ্যে ধুমায়িত করে তুললো প্রতিহিংসার অগ্নিজ্বালা!
দামেস্কে কিছুদিন ঘুরে ফিরে কাটিয়ে সে চলে গেলো কুফায়। হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে সে তার অতীত কাহিনী শুনিয়ে তার কাছে পেশ করলো সাহায্যের আবেদন। হাজ্জাজ চুপ করে শুনলেন তার কাহিনী। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে ইবনে সাদেক সেই সুযোগে তার তারিফ করলো আর দরবারে খিলাফতের নিন্দা করে কয়েকটি কথা বলে ফেললো।
সে বললো, আপনি আমার দীলের কথা শুনতে চাইলে আমি বলবো, ব্যক্তিগত যোগ্যতার দিক দিয়ে আপনি হচ্ছেন খিলাফতের মসনদের সবচাইতে বড়ো হকদার।’ ইবনে সাদেক তার কথা শেষ করবার আগেই হাজ্জাজ এক সিপাহীকে আওয়ায দিয়ে ইবনে সাদেককে ধাক্কা মেরে শহরের বাইরে বের করে দেবার হুকুম জারী করলেন। তারপর ইবনে সাদেককে লক্ষ্য করে বললেন, তোমায় মৃত্যুদন্ড দেওয়াই উচিত ছিলো, কিন্তু মেহমান হয়ে তুমি এখানে এসেছে বলেই তোমায় আমি মাফ করে দিচ্ছি।’
ইবনে সাদেক সন্ধ্যাবেলায় শহর থেকে বেরুলো। রাতটা এক পাদরীর ঝুপড়িতে কাটিয়ে ভোরবেলা এক ভয়ানক চক্রান্ত মাথায় নিয়ে সে ধরলো জেরুজালেমের পথ। জেরুজালেমেও সে থাকতে পালো না বেশী সময়। তার ভাই ও তার মাশুকই নয়, গোটা দুনিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার মনোভাব নিয়ে সে ঘুরে বেড়াতে লাগলো দেশ দেশান্তরে। শেষ পর্যন্ত সে গড়ে তুললো দুবৃত্তদের এক ভয়ানক জামাত এবং এক কঠিন ষড়যন্ত্রের সংকল্প নিয়ে তাদেরকে ছড়িয়ে দিলো তামাম দেশে দেশে। সে হলো সেই ছোটখাটো জামাতের আত্মিক ও রাজনৈতিক নেতা। একদিন সে তার চাচাতো ভাইর উপর প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করবার মওকা পেয়ে গেলো। তার একমাত্র কন্যা জোলায়খাকে সে চুরি করে নিয়ে গেলো। জোলায়খার বয়স তখন আট বছর। ইবনে সাদেক তাকে নিয়ে পালালো ইরানের দিকে। মাদায়েনে তার জামাতের ইসহাক নামে একটি লোকের হাতে তাকে সোপর্দ করে দিয়ে সে আবার লেগে গেলো তার ধ্বংসাত্মক সংকল্প হাসিল করবার কাজে। দু’মাস পরে তার দলের গোপন কর্মীরা হত্যা করলো ইলিয়াস ও মরিয়মকে। এই নৃশংস হত্যার পরও সে নিরস্ত হলো না। ইবনে সাদেকের বাকী যিন্দেগী তামাম দুনিয়ার জন্য হয়ে উঠলো ভয়াবহ। আলমে ইসলামের রাজনৈতিক আধিপত্য হাসিল করার জন্য সে লিপ্ত হলো হুকুমাতের বিরুদ্ধে কঠোর ষড়যন্ত্রে। খারেজী ও ইসলামের দুশমনদের ভিতর থেকে কতক লোক তাকে পূর্ণ সমর্থন করলো, কিন্তু তখনো তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে আর্থিক অসুবিধা। হঠাৎ তার মাথায় এলো এক নতুন ধারণা। সে কয়েক মাসের সফর কয়েক হফতায় শেষ করে গিয়ে হাযির হলো রোমের সীজারের দরবারে।
সীজার যদিও পূর্বদিকে তার হারানো অধিপত্য নতুন করে হাসিল করবার ইচ্ছা করতেন, কিন্তু তার দীল থেকে পূর্বপুরুষদের শোচনীয় পরাজয়ের স্মৃতি তখনো মুছে যায়নি। তিনি খোলাখুলি ইবনে সাদেকের সাথে যোগ দিতে সাহস করলেন না, কিন্তু মুসলমানদের এই নিশ্চিত দুশমনকে উৎসাহিত করাও তিনি জরুরী মনে করলেন। ইবনে সাদেককে তিনি বললেন, “আমি তোমাদের সব দিক দিয়ে সাহায্য করৰাে, কিন্তু যতদিন মুসলমানরা এক হয়ে থাকবে, ততদিন তাদের উপর হামলা করা আমরা অবিবেচনার কাজ বলে মনে করি। তোমরা ফিরে গিয়ে তোমাদের কাজ চালিয়ে যাও। তোমাদের কাজের দিকে আমার নযর থাকবে।’
ইবনে সাদেক সেখানে থেকে ফিরে এলো বহু দামী সোনা, চাঁদি ও জওয়াহেরাত তোহফা নিয়ে। বসূরার এক অজ্ঞাত এলাকায় ঘাটি করে সে শুরু করলো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ। হাজ্জাজের ভয়ে সে কয়েক বছর তার ধারণা প্রকাশ্যে ঘোষণা করবার সাহসও করলো না। সে তার কার্যকলাপ তার নযর থেকে পুশিদা রেখে পুরোপরি হুঁশিয়ার হয়ে চলতে লাগলো। কয়েক বছরের প্রাণপণ চেষ্টাও মেহনতের ফলে এক হাজার লোক এসে তার দলে বিড়লো। তাদের মধ্যে বেশির ভাগকেই সে খরিদ করলো সোনা চাদির বিনিময়ে। সীজারকে সে তার কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত রেখে প্রয়োজনমতো তার কাছ থেকে সাহায্য পেতে লাগলো। যখন সে বুঝলো যে, তার জামা’আত বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং কুফা ও বসরার বেশীর ভাগ লোক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করছে, তখন সে তৈরী হলো তার প্রতিদ্বন্দ্বীর উপর শেষ আঘাত হানবার জন্যে। একদিন তার গুপ্তচর এসে তাকে খবর দিলো যে, সেদিন হাজ্জাজ কুফায় চলে গেছেন এবং ইবনে আমের ফউজ সংগ্রহের জন্য এক বক্তৃতা করবেন। সে আরো জানালো যে, বসরার বেশির ভাগ লোক ফউজে ভর্তি হতে নারায। ইবনে সাদেক চাইলো পরিস্থিতির সুযোগ নিতে এবং প্রথমবার সে তার আড়া থেকে বেরিয়ে এসে বসরার লোকদের আম জলসায় শরীক হবার সাহস করলো। তার মনে আস্থা ছিলো যে, বসরার অসন্তোষ-প্রবণ লোকদের সে তার কথার যাদুতে প্রভাবিত করতে পারবে, কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। নয়ীম আচানক বেরিয়ে এসে তার সাজানো কৌশলজাল ছিন্নভিন্ন করে ফেললেন।
