‘আমি তোমার কর্তব্যনিষ্ঠার তারিফ করছি।’ নয়ীম বললেন।
ইতিমধ্যে আর একটি ঘোড়া তৈরী হয়ে গেছে। দেখতে দেখেতে আগাম্ভক তার উপর সওয়ার হয়ে এক নিমেষে মিলিয়ে গেলো রাত্রির অন্ধাকারে।
কয়েকদিন পর নয়ীম তাঁর সফরের তিন-চতুর্থাংশ শেষ করে এক মনোমুগ্ধকর উপত্যকা-ভূমির ভিতর দিয়ে পথ চলছেন। পথের মধ্যে আবার সেই সওয়ার তার নয়রে পড়লো। নয়ীম ভালো করে দেখে চিনতে পারলেন তাকে। লোকটি নয়ীমের কাছে এসে ঘোড়া থামিয়ে বললো, আপনি এসেছেন খুব দ্রুত গতিতে। আমার ধারণা ছিলো, আপনি অনেক খানি পিছনেই পড়ে থাকবেন।
হ্যাঁ, আমি পথের মধ্যে তেমন আরাম করিনি।’
‘আপনিও কি তবে বসরায় যাচ্ছেন?
হ্যাঁ, সেদিন যদি তুমি খানিকক্ষণ ইনতেহার করতে, তাহলে সারাটা পথ। আমরা একত্রে সফর করতে পারতাম।’
‘আমার ধারণা ছিলো, আপনি কিছুটা আরামে সফর করবেন। …….চলুন, ঘোড়া আগে বাড়ান।
‘আমার মনে হয়, এসব রাস্তা তুমি বেশ ভালো করে চেন।
জি হ্যাঁ, এ দেশে আমি বহুদিন কাটিয়েছি।’
চলো, তাহলে তুমিই আগে চলো।
আগন্তক ঘোড়া আগে বাড়িয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে চললো। নয়ীম চললো তার পিছু পিছু। খানিকক্ষন পর নয়ীম প্রশ্ন করলেন, “পরের চৌকি দেখা যাচ্ছে না কেন? আমরা পথ ভুলে আসিনিতত?
নয়ীমের সাথী ঘোড়া থামিয়ে পেরেশানির ভাব করে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলো। অবশেষে সে বললো, আমার তো তাই মনে হচ্ছে। আপনার কোন চিন্তা নেই। এই উপত্যকা পার হয়ে গেলেই আমরা ঠিক পথ খুঁজে পাবো।’ বলেই সে আবার ঘোড়া ছুটালো। আরো কয়েক ক্রোশ চলবার পর আগন্তক ঘোড়া থামিয়ে বললো, সম্ভবতঃ আমরা সঠিক পথ থেকে বহুদূরে একদিকে সরে এসেছি। আমার মনে হয়, এ পথ শিরাযের দিকে গেছে। আমাদেরকে এবার বাম দিকে মোড় ঘুরতে হবে। কিন্তু ঘোড়া বড়োই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এখানে খানিক্ষন আরাম করলেই ভাল হবে। সবুজ শ্যামল গাছ-গাছড়া ভরা এলাকাটি এমন নয়নমুগ্ধকর যে, ক্লান্ত দেহ নিয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম করার জন্য আগন্তুকের কথায় নয়ীম সায় দিলেন। ঘোড়া দু’টোকে এক ঝরণার পানি পান করিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রেখে তারা বসে পড়রেন সবুজ ঘাসের বিছানার উপর।
আগন্তক তার থলে খুলতে খুলতে বললো, আপনার তো ক্ষিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই? আমি পিছনের চৌকিতে পেট পুরে খেয়ে নিয়েছি। সামান্য কিছুটা খানা হয়তো আপনারই জন্য বেঁচে গিয়েছিলো।
আগন্তুকের অনুরোধ, নয়ীম রুটি আর পনীরের কয়েটি টুকরো খেয়ে নিলেন। তারপর ঝরণার পানি পান করে ঘোড়ায় সওয়ার হতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু মস্তিষ্কে তীর ঘূর্ণন অনুভব করে শুয়ে পড়লেন ঘাসের উপর।
আমার মাথা ঘুরছে। তিনি আগন্তুককে লক্ষ্য করে বললেন।
আগন্তুক বললো, “আপনি খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। খানিক্ষণ আরাম করে নিন।’
‘না, দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমাদের এখখুনি চলতে হবে।’বলে নয়ীম উঠলেন, কিন্তু কম্পিত পদে খানিকটা চলেই আবার বসে পড়লেন যমিনের উপর।
আগম্ভক তার দিকে তাকিয়ে ভয়ংকর অট্টহাসি করে উঠলো। নয়ীমের দীলের মধ্যে তখখুনি সন্দেহ হলো, লোকটা খানার মধ্যে কোন একটা মাদক দ্রব্য দিয়েছে তাঁকে। অমনি তাঁর মনে অনুভূতি জাগলো, তিনি এক ভয়ানক মুসীবতে গ্রেফতার হতে চলেছেন। তিনি আর একবার উঠতে চেষ্ট করলেন। কিন্তু তাঁর হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে এসেছে। তার মস্তিস্কে ছেয়ে এসেছে গভীর নিদ্রার মাদকতা। অর্ধ-অচেতন অবস্থায় তিনি অনুভব করলেন, কয়েকটি লোক তার হাত-পা বাঁধছে। তাদের লৌহকঠিন বন্ধন থেকে মুক্ত হবার জন্য তিনি হাত-পা মারতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর সকল চেষ্টা হলো নিল। তখন তিনি প্রায় বেঁহুশ। তিনি সামান্যমাত্ৰ অনুভব করেছিলেন যে, কয়েকটি লোক তাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে আর কোথায়ও।
পরদিন তখন নয়ীমের হুঁশ হলো, তখন তিনি এক সংকীর্ণ কুঠুরীতে বন্দী। যে, অচেনা লোকটি তাকে প্রতারণা করে সেখানে এনেছে, সে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে নয়ীম তার দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করে প্রশ্ন করলেন, আমায় এখানে আনার পশ্চাতে তোমার কি উদ্দেশ্য? আমি কার কয়েদ খানায় বন্দী?
সময় এলেই এসব প্রশ্নের জওয়াব পাবে। অচেনা লোকটি বাইরে গিয়ে কুঠুরীর দরজা বন্ধ করে দিলো।
কয়েদখানায় নয়ীমের তিন মাস কেটে গেলো। তার অন্তরের হতাশা যেন কয়েদখানার ভয়ানক অন্ধকারকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। আল্লাহ তার সবরের পরীক্ষা নিচ্ছেন, এইমাত্র তার সান্তনা। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় এক ব্যক্তি এসে কয়েদখানার দেওয়ালের একটি ছোট ছিদ্রপথ দিয়ে খানা পৌঁছে দিয়ে চলে যায়।
নয়ীম কয়েকবার প্রশ্ন করেছেন, ‘আমায় কয়েদ করেছে কে? কি কারণে আমায় কয়েদ করলো?’
কিন্ত কোন প্রশ্নেরই জওয়াব মেলে না। তিন মাস এমনি করে কেটে যাবার পর একদিন ভোরে নয়ীম যখন আল্লার দরগায় সিজদা করে দোয়া করছেন, তখনই কুঠুরীর দরয়া খুলে সেই অচেনা লোকটি কয়েকজন সাথী নিয়ে এসে হাযির হলো। সে নয়ীমকে বললো, উঠে আমাদের সাথে এসো।
কোথায়?’ নয়ীম প্রশ্ন করলেন।
‘একজন তোমায় দেখতে চাচ্ছে। সে জওয়াবে বললো।
নয়ীম নাংগা তলোয়ারের পাহারায় চললেন তাদের সাথে সাথে।
কেল্লার এক সুদৃশ্য কামরায় ইরানী গালিচার উপর কয়েকটি নওজোয়ানের মাঝখানে এক বৃদ্ধ উপবিষ্ট। নয়ীম তাকে দেখেই চিনলেন। লোকটি ইবনে সাদেক।
সাত
ইবনে সাদেকের অতীত যিন্দেগী ক্রমাগত ব্যর্থতার এক দীর্ঘ কাহিনী। সে পয়দা হয়েছিলো জেরুজালেমের এক স্বচ্ছল ইহুদী পরিবারে। বুদ্ধিবৃত্তির বলে ষোল বছর বয়সে তার অসাধাণ দখল জন্মাল আরবী, ফারসী, ইউনানী ও ল্যাতিন ভাষায়। তার বয়স তখন আঠারো তখন সে প্রেমে পড়লো মরিয়ম নামে এক ঈসায়ী মেয়ের। মেয়েকে তার সাথে শাদী দিতে মরিয়মের বাপ-মাকে রাযী করতে গিয়ে সে হয়ে গেলো ঈসায়ী। কিন্তু মরিয়ম কিছুদিন তাঁর মন ভুলিয়ে প্রেমে পড়লো তারই চাচাতো ভাই ইলিয়াসের। তারপর থেকেই সে ঘৃণার চোখে দেখতে লাগলো ইবনে সাদেককে। বহু চেষ্টা করে ইবনে সাদেক শাদীর জন্য রাষী করালো মরিয়মের বাপ মাকে। কিন্তু মরিয়ম একদিন মওকা পেয়ে তার প্রেমিককে নিয়ে ফেরার হয়ে চলে গেলো দামেস্কের পথে। দামেস্কে গিয়ে তাদের শাদী হয়ে গেলো। মরিয়মের প্রেমে ও স্বভাবে মুগ্ধ ইলিয়াসও ইসায়ী মহাব এখতিয়ার করলো।
