নয়ীম আবার ধনুক হাতে নিয়ে তীর বষর্ণ শুরু করলেন রাজার দিকে লক্ষ্য করে একটি তীর গিয়ে লাগলো রাজার সিনার উপর এবং রক্তাক্ত দেহে তিনি ঢলে পড়লেন এক রাণীর কোলের উপর। রাজার হত্যার খবর মশহুর হয়ে গেয়ে সিন্ধুর লশকর ময়দানের ভিতরে অগুণতি লাশ ফেলে পালালো। পরাজিত সিপাহীরা কতক গেলো ব্রাহ্মণবাদে, আর কতক গেলো আরারের দিকে।
এই আযীমুশশান বিজয়ের পর মুসলমানরা যখমীদের শ্রুষা ও শহীদের দাফন কাফনের কাজে ব্যস্ত হলেন; সাঈদের দেহে বিশটিও বেশি যখমের নিশানা দেখা যাচ্ছিলো। তার জেব থেকে ভাইয়ের চিঠিটা বের করে কবরের ভিতর ছুঁড়ে দিলেন।
মুহাম্মদ বিন কাসিম হয়রান হয়ে প্রশ্ন, করলেন কি ওটা?
‘একটা চিঠি। নয়ীম বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন।
‘কিসের চিঠি?’
‘আব্দুল্লাহ আমার কাছে দিয়েছিলেন ওটা। চিঠিটা আমি ওঁর কাছে পৌঁছে দেবার ওয়াদা করে এসেছিলাম। কিন্তু সে ওয়াদা পূরণ করাটা আল্লাহ্র মনযুর ছিলো না।
‘আমি ওটা দেখতে পারি?’ মুহাম্মদ বিন কাসিম সুধালেন।
‘ওর ভিতর, এমন কিছু নেই।’
মুহম্মদ বিন্ কাসিম নত হয়ে কবর থেকে তুলে নিলেন চিঠিখানা। পড়ে তিনি তা ফিরিয়ে দিলেন নয়ীমের হাতে। বললেন, এটা নিজের কাছে রেখে দাও। শহীদের দৃষ্টি থেকে দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো কিছুই পুশিদা থাকে না।’
মুহম্মদ বিন কাসিমের কাছে নয়ীমের যিন্দেগীর কোনো রহস্যই পুশিদা ছিলো না। নয়ীমের জন্য আব্দুল্লাহর ত্যাগ ও খোদার রাহে নয়ীমের শানদার কোরবানী তাঁর দীলের মধ্যে তাঁদের দু’ভাইয়ের প্রতি আগের চাইতে আরো গম্ভীর মুহব্বত পয়দা করে দিলো।
রাতের বেলা ঘুমোবার আগে মুহম্মদ বিন কাসিম নয়ীমকে তাঁর তাঁবুতে ডেকে নিয়ে নানারকম কথাবার্তার পর বললেন, এবার আমরা কয়েকদিনের মধ্যে ব্রাহ্মণাবাদ জয় করে যাবো মুলতানের দিকে। ওখানের হয়ত আমাদের আরো বেশি সৈন্যবলের প্রয়োজন হবে। তাই আমার ধারণা। তোমায় আবার বসরায় পাঠাতে হবে। সিপাহী সংগ্রহ করবার জন্য তুমি ওখানে গিয়ে বক্তৃতা করে বেড়াবে। পথে তোমার বাড়ি হয়ে ওদের সবাইকে আশ্বাস দিয়ে যাবে। ওদেরকে আশ্বাস দেবার কথা বলতে গেলে আমি ব্যাপারটিকে জিহাদের চাইতে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছি না। নতুন সিপাহী ভর্তি সম্পর্কে আজকের লড়াইয়ে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, সিন্ধুর জন্য আর বেশি ফউজের প্রয়োজন নেই।’
‘কিন্তু আমার ইরাদা শুধু সিন্ধু বিজয়েই সীমাব্ধ নয় হিন্দুস্তান এক বিস্তীর্ণ রাজ্য। তোমায় যেতেই হবে।’
‘একজন সিপহী হিসাবে আপনার হুকুম মেনে চলা আমার ফরয, কিন্তু দোস্ত হিসাবে আমার প্রতি আপনার এ উপকারের প্রয়োজন নেই।
‘কোন উপকার?’ মুহম্মদ বিন্ কাসিম প্রশ্ন করলেন।
‘বসরায় পাঠাবার নাম করে আপনি আমায় বাড়ি ফিরে যাবার মওকা দিচ্ছেন। আমি এটাকেই মনে করছি উপকার।
মুহম্মদ বিন্ কাসিম বললেন, ‘যদি এ উপকারের সাথে আমার অথবা তোমার কর্তব্যের সংঘাত হতো, তাহলে কখনো আমি তোমায় এজাযত দিতাম না; কিন্তু আপাততঃ এখানে তোমার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা, ব্রাক্ষনাবাদ জয় করা আমাদের কাছে বাম হাতের খেলার মতো। এরপর এদিক ওদিক কয়েকটি মামুলী রাজ্যের বিদ্রোহ দমন করে আমরা এগিয়ে যাবো মুলতানের দিকে। ততদিনে তুমি স্বচ্ছন্দে ফিরে আসবে আর তোমার সাথে আসবে কমবেশী করে যেসব সিপাহী, তারা আমাদের তাকৎ যথেষ্ট বুদ্ধি করতে পারবে।
আচ্ছা, কবে যেতে হবে আমায়?;
যথাসম্ভব শীগগীর। যখন তোমায় সফরে এজাযত দেয়া হলো তখন কালই রওয়ানা হয়ে যাবে।’
মুহম্মদ বিন্ কাসিমের সাথে আলাপের পর নয়ীম বসে থাকলেন সেখানেই, কিন্তু তার কল্পনা তখন তাঁকে নিয়ে গেছে বহুদূরে সিন্ধুর সরমিন থেকে হাজারো মাইল দুরে।
ভোর বেলা দেখা গেলো, নয়ীম বসরার পথে ফিরে যাবার জন্যে তৈরী হচ্ছেন।
*
সিন্ধুতে মুসলমানদের বিজয় অভিযান স্পর্কে হাজ্জাজ বিন্ ইউসুফকে অবহিত করবার জন্য মুহম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু থেকে বসরা পর্যন্ত দশ ক্রোশ দূরে দূরে সিপাহীদের চৌকি বসিয়েছেন। ডাক পাঠাবার জন্য প্রত্যেক চৌকিতে রাখা হয়েছে কতগুলো দ্রুতগামী ঘোড়া।
ভোর বেলায় নয়ীম রওয়ানা হলেন সিন্ধু থেকে বসরার পথে। প্রতি চৌকিতে ঘোড়া বদল করে তিনি দিনের সফরে পথ অতিক্রম করে যাচ্ছেন ঘন্টায়। রাতের বেলা তিনি বিশ্রাম করলেন এক চৌকিতে। ক্লান্তির দরুন তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন অল্প সময়ের মধ্যে। মধ্যরাত্রের দিকে সিন্ধুর দিক থেকে আগত এক সওয়ারের লেবাস দেখে তাকে এক মুসলমান সিপাহী বলেই মনে হলো। চৌকিতে পৌঁছেই সে ঘোড়া থেকে নেমে বলতে লাগলো, আমি বসরায় যাচ্ছি এক অতি জরুরী খবর নিয়ে। আমার জন্য আর একটি ঘোড়া তৈরী করে দাও জলদী।’
সিন্ধুর যে কোন ব্যাপার সম্পর্কে নয়ীমের মনে ছিলো আগ্রহ। তিনি উঠে মশালের আলোয় দেখে নিলেন আগন্তুক লোকটিকে। লোকটি গন্দমী রঙের সুগঠিত দেহ জোয়ান।
তুমি মুহম্মদ বিন কাসিমের পয়গাম নিয়ে যাচ্ছে।
‘জি হ্যাঁ!
‘কি পয়গাম?
কাউকেও তা বলবার এজাযত তো নেই।
‘আমায় চেনো তুমি?
‘জি হ্যাঁ, আপনি আমাদের ফউজের এক সালার। কিন্তু মাফ করবেন, যদিও আপনাকে বলায় কোন ক্ষতি নেই, তথাপি সিপাহসালারের হুকুম। হাজ্জাজ বিন্ ইউসুফ ছাড়া আর কাউকেও দেওয়া যাবে না এ পয়গাম।’
