তখনকার যামানায় দেবল ছিলো সিন্ধুর এক মশহুর বন্দর। শহরের চার দেয়ালের উপর সিন্ধুরাজের এতটা ভরসা ছিল যে, ময়দানে নেমে মোকাবিলা না করে তিনি তাঁর বেশুমার ফউজ নিয়ে আশ্রয় নিলেন শহরের ভিতরে। মুহম্মদ বিন্ কাসিম শহর অবরোধ করে মিনজানিকের সাহায্যে প্রস্তর বর্ষণ শুরু করলেন, কিন্তু কয়েকদিনের কঠিন হামলা সত্ত্বেও মুসলিম বাহিনী শহরের দেয়াল ভাঙতে পারলো না। অবশেষে একদিন একটা ভারী পাথর পড়লো এক মশহুর বৌদ্ধ মন্দিরের উপর। মন্দিরের স্বর্ণ-গম্বুজ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়লো নীচে এবং তার সাথেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো বুদ্ধের এক প্রাচীন মূর্তি। মূর্তিটি ভেঙে পড়ায় রাজা দাহির অশুভ লক্ষণ মনে করে ঘাবড়ে গেলেন এবং রাতের বেলায় ফউজ সাথে নিয়ে পালিয়ে গেলেন ব্রাহ্মণবাদে।
দেবল বিজয়ের পর মুহম্মদ বিন্ কাসিম এগিয়ে এলেন নীরুনের দিকে। নীরুনের বাসিন্দারা লড়াই না করেই হাতিয়ার সমর্পণ করে দিলো।
নীরুন দখল করবার পর মুহম্মদ বিন্ কাসিম ভরোচ ও সিউস্তানের মশহুর, কেল্লা জয় করলেন। রাজা দাহির ব্রাহ্মণাবাদে পৌঁছে চারদিকে দূত পাঠালেন এবং হিন্দুস্তানের রাজা-মহারাজাদের কাছে সাহায্যের আবেদন করলেন। তার আবেদনে দু’শো হাতী ছাড়া আরো পঞ্চাশ হাজার ঘোড়সওয়ার ও কিছু সংখ্যক পদাতিক সিপাহী এসে জমা হলো তার পাশে। রাজা দাহির বিপুল সেনাসামন্ত সাথে নিয়ে ব্রাহ্মণবাদের বাইরে এসে:সিন্ধুনদের কিনারে এক বিস্তৃত ময়দানে তাঁবু ফেলে মুহম্মদ বিন্ কাসিমের আগমন প্রতীক্ষা করতে লাগলেন।
মুহম্মদ বিন্ কাসিম কিশতির সেতু রচনা করে সিন্ধুনদ পার হলেন। ইসায়ী ৭১৩ সালের ১৯ শে জুন মুহম্মদ বিন কাসিমের ফউজ এসে সন্ধ্যাবেলায় তাঁবু ফেললো রাজার তাঁবু থেকে দুই ক্রোশ দূরে। ভোর বেলা বেজে উঠলো শংখঘন্টা এবং অপরদিকে জেগে উঠলো আল্লাহু আকবর’ তকবরী ধ্বনি এবং দুই লশকর নিজ নিজ দেশের সামরিক রীতি অনুযায়ী সংঘবদ্ধভাবে এগিয়ে চললো পরস্পরের দিকে।
মুহম্মদ বিন কাসিম তার ফউজকে পাঁচশ’ সিপাহীর ছোট ছোট দলে ভাগ করে হুকুম দিলেন সামনে এগিয়ে যেতে। অপরদিকে সিন্ধুর ফউজে সবার আগে দু’শো হাতী এগিয়ে এলো। ভয় পেয়ে মুসলিম বাহিনীর ঘোড়াগুলো পিছু হটে যেতে লাগলো। এ সব দেখে মুহম্মদ বিন কাসিম তাঁর ফউজকে হুকুম দিলেন তীর বর্ষণ করতে। একটি হাতি মুসলিম সিপাহীদের সারি দলিত করে এগিয়ে এলো সামনের দিকে। মুহম্মদ বিন কাসিম তার মোকাবিলা করবার জন্য এগিয়ে যেতে চাইলেন, কিন্তু তার ঘোড়া সেই ভয়ংকর জানোয়ারের কাছেও যেতে চাইলো না ভয়ে। মুহম্মদ বিন কাসিম বাধ্য হয়ে নেমে পড়লেন ঘোড়া থেকে এবং এগিয়ে গিয়ে হাতীর শুড় কেঁটে ফেললেন। নয়ীম ও সাঈদ তাঁর মতোই এগিয়ে গিয়ে কেটে দিলেন আরও দুটি হাতীয় শুঁড়। আহত হাতী উলটো দিকে ঘুরে সিন্ধুর ফউজকেই দলিত করে বেরিয়ে গেলো। বাকী হাতীগুলো তীরবৃষ্টির ভিতর দিয়ে এগুতে পারলো না। তারা যখমী হয়ে সিন্ধুর সিপাহীদের সারি ছিন্নভিন্ন করে চললো। সুযোগ বুঝে মুহম্মদ বিন কাসিম সামনের সারির সিপাহীদের এগিয়ে যেতে হুকুম দিলেন এবং পিছনের দলগুলোকে হুকুম দিলেন তিন দিক থেকে দুশমন ফউজকে ঘিরে ফেলতে। মুসলিম বাহিনীর প্রাণপাত সংগ্রামের ফলে দুশমন ফউজের পা টলে গেল। সাঈদ কয়েকজন দুঃসাহসী যযাদ্ধাকে সাথে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সারি ভেদ করে গিয়ে পৌঁছলেন দুশমন বাহিনীর মধ্যভাগে। নয়ীমও তাঁর বাহাদুর মামুর পিছনে পড়ে থাকতে রাষী ছিলেন না, তাই তিনি নেই হাতে পথ খোলাসা করে এগিয়ে গেলেন তাঁর কাছে। রাজা দাহির তার রাণীদের মাঝখানে এক হাতীর উপর সোনার আসনে বসে দেখছিলেন যুদ্ধের দৃশ্য। তার আগে কয়েকজন পূজারী একটি মূর্তি মাথায় নিয়ে ভজন গেয়ে চলেছে। সাঈদ বলে উঠলো, “এই মূর্তি হচ্ছে ওদের শেষ অবলম্বন। ওটাকে ভেঙে ফেল।’
নয়ীম এক পূজারীর সিনার উপর তীর মারলেন এবং তখনি সে কলজের উপর হাত চেপে ধরে লুটিয়ে পড়লো যমিনের উপর। দ্বিতীয় তীর গিয়ে লাগলো আর এক পূজারীর উপর। অমনি সে মূর্তিটা ময়দানে ফেলে পিছু হটলো। এই মূর্তিটাই ছিল সত্যি তাদের শেষ আশা। তামাম ফউজে ছড়িয়ে পড়লো বিশৃংখলা। কঠিন আঘাত পেয়েও সাঈদ এগিয়ে চললেন সামনের দিকে। তিনি রাজা দাহিরের হাতীর উপর হামলা করলেন, কিন্ত রাজার রক্ষীর যোদ্ধারা তখন তার চারদিকে জমা হয়ে গেছে। সাঈদ এবার তাদের নাগালের মধ্যে। সাঈদকে দুশমনবেস্টিত দেখে নয়ীম ক্ষুধিত সিংহের মতো হামলা করে ছিন্ন ভিন্ন করে দিলেন দুশমন-বাহিনীকে। সাঈদের সন্ধানে তিনি চারদিকে দৃষ্টি সঞ্চালন করলেন, কিন্তু তাকে খুঁজে পেলেন না। আচানক তাঁর শূন্যপৃষ্ঠ ঘোড়াটিকে তিনি দেখতে পেলেন এদিক-ওদিক ছুটেতে। নয়ীম এবার নীচে পড়ে থাকা লাশগুলোর দিকে তাকালেন। সাঈদ দুশমনদের কতকগুলো লাশের উপর উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। নয়ীম ঘোড়া থেকে নেমে হাত দিয়ে তাঁর মামুর মাথাটা উপরে তুলে মামুজান বলে ডাকলেন, কিন্তু তার চোখ আর খুললো না। নয়ীম উন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্ন ইলায়হি রাজেউন’ বলে আবার ঘোড়ার পিঠে চাপলেন। রাজা দাহিরের হাতী তখন তাঁর কাছ থেকে বেশী দূরে নয়। কিন্তু তখনো বিশৃংখল সিপাহীদের এক দল তাঁকে ঘিরে রয়েছে।
