মধ্যরাত্রের কাছাকাছি মজলিস শেষ হলে সবাই যার যার ঘরে চলে গেলেন। নয়ীম তাঁর মামুর সাথে যেতে চাইলেন, কিন্তু মুহাম্মদ বিন কাসিম তাঁকে কাছে রাখলেন।
মুহাম্মদ বিন্ কাসিমের অনুরোধে সাঈদ নয়ীমকে সেখানে থাকতে বললেন। ইবনে আমের ও সাঈদকে বিদায় দেবার জন্য নয়ীম ও মুহাম্মদ বিন কাসিম ঘরের বাইরে এলেন এবং কিছু দূর গেলেন তাদের সাথে সাথে। নয়ীমের সাথে তখনও সাঈদের কোনো আলাপ হয়নি বাড়ি ঘর সম্পর্কে। চললে চলতে তিনি প্রশ্ন করলেন, নয়ীম, বাড়ির খবর সব ভাল তো?’
‘জি হ্যাঁ, মামুজান! বড়িতে সবাই ভাল। আম্মিজান…..।’ নয়ীম আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। চিঠিটা বের করবার মতলব করে তিনি হাত ঢুকালেন জেবের মধ্যে, কিন্ত কি যেন চিন্তা করে খালি হাতই জেব থেকে বের করলেন।
হ্যাঁ, বোন কি বলেছিলেন?’ তিনি আপনাকে সালাম জানিয়েছেন মামুজান!
বাকী রাতটা নয়ীম বিছানায় পড়ে এপাশ-ওপাশ করে কাটালেন। ভোর হবার খানিকটা আগে তাঁর চোখে নামলো ঘুমের মায়া। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তিনি যেনো তাঁর এলাকার বাগিচার মুগ্ধকর পরিবেশে মহব্বতের সুরঝংকারের মাঝখানে প্রিয়তমার সান্নিধ্য থেকে দূরে-বহুদূরে সিন্ধুর দিগন্তপ্ৰসারী ময়দানে যুদ্ধের বিভীসিকাময় দৃশ্যের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
পরদিন নয়ীম ফউজের একজন সিপাহসালার হিসাবে রওয়ানা হয়ে গেলেন। প্রতি পদক্ষেপে তিনি যেনো তাঁর আর্যর পুরানো লোকালয় ভেঙে দিয়ে চলেছেন আর সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন নতুন আকাংকার দুনিয়া গড়তে গড়তে। সন্ধ্যার খানিক্ষণ আগে তাঁর লশকর চলেছে এক উঁচু টিলার উপর দিয়ে। যে বাগিচার ছায়ায় নয়ীম কত সুখ-শান্তির দিন কাটিয়েছেন তারই দিকে নযর পড়ছে এখান থেকে। এ পথ থেকে দু’ক্রোশ দূরে রয়েছে তাঁর যৌবনের নিষ্পাপ আশার মূর্ত প্রতীক, তাঁর অন্তরের আকাংখিত প্রিয়জন। মন চায় তখখুনি তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যান সেই মরুভূমির হুরের কাছে, তাঁকে দুটো কথা বলেন, দু’টো কথা শুনে আসেন তার কাছ থেকে এই বিদায় মূহূর্তে। কিন্তু, মুজাহিদদের আত্মা এ সূক্ষ্ম অনুভূতির উপর হয় বিজয়ী। জেব থেকে তিনি চিঠিটা বের করেন, পড়েন, আবার তা খুঁজে রাখেন জেবের মধ্যে।
*
বাড়িতে আবদুল্লাহ ও নয়ীমের শেষ কথাবার্তা শুনবার পর উযরার খুশীর অন্ত নেই। তার রূহ্ নে আনন্দের সপ্তম আসমানে উড়ে বেড়াচ্ছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে যেন শুনতে পাচ্ছে আসমানের সিতারাদের নির্বাক সংগীত। সারা রাত জেগে থেকেও যেন তার মুখে ফুটে উঠেছে আগের চাইতে বেশী খুশীর আভাস। হতাশার আগুনে জ্বলে পুড়ে যাবার পর আশাতরু আবার ফুলে ফুলে সবুজ হয়ে উঠেছে।
আবদুল্লাহর উপকারের বোঝা যেনো ভারাক্রান্ত করে তুলেছে উার মন। তার অন্তহীন আনন্দের:ভিতরে ব্যাথা হয়ে বাজে আব্দুল্লাহর উপকারের গোপন লজ্জা। সে ভাবে, আব্দুল্লাহর এ ত্যাগ তো শুধু নয়ীমের জন্যই নয়, তাদের দুজনেরই জন্য। তাঁর মুহব্বত কতো নিঃস্বার্থ! কতোটা ব্যথা তাঁর মনে লেগেছে! আহা! সে যদি এমনি করে ব্যথা না দিয়ে পারতো! আহ! নয়ীমকে যদি সে এতটা মুহব্বত না করতো আর আব্দুল্লাহর দীলে এমনি করে আঘাত না দিতে! কল্পনার এই বেদনাদায়ক অনুভূতি মুহূর্তের মধ্যে চাপা পড়ে যায় তার অন্তর থেকে উৎসারিত আনন্দের সুরঝংকারে।
উযরা ভেবেছে, নয়ীম ফিরে আসবেন সন্ধ্যার আগেই। বড়ো কষ্টে কেটেছে তার ইনতেযারের দিন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, কিন্তু নয়ীম ফিরে এলেন না। গোধূলির স্নানিমা যখন রাত্রির অন্ধকারে রুপান্তরিত হতে লাগলো, আসমানের কালো পদায় ঝিকমিক করতে লাগলো অসংখ্য সিতারার মোতি, তখন উযরার অস্থিরতা ক্রমাগত বেড়ে চললো। মধ্যরাত্রি অতীত হয়ে গেলো, দুঃখের রাতকে আশার সান্ত্বনা দিয়ে উযরা পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। পরের দিনটি কাটলো আরো অস্থিরতার ভিতর দিয়ে এবং পরের রাতটি হলো যেনো আরো দীর্ঘ।
আবার ভোর কেটে গেলো, সন্ধ্যা হলো, কিন্তু নয়ীম ফিরে এলেন না। সন্ধ্যাবেলা উ ঘর থেকে বেরিয়ে কিছু দূরে এক টিলার উপর গিয়ে নয়ীমের পথ চেয়ে রইলো। বসরার পথে বার বার ধূলো উড়ছে কম বেশি করে। বারবার সে ভাবে, ওই বুঝি নয়ীম এলেন। প্রতিবার হতাশ হয়ে সে চেপে ধরে তার কম্পিত বুক। উট ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে চলে যায় কতো পথিক। দূর থেকে সে দেখে, বুঝি নয়ীম এলেন; কিন্তু কাছে এলেই সে দেখে, সব ভুল। সন্ধ্যার ঠান্ডা হাওয়া বইছে। রাখাল ফিরে যাচ্ছে আপন ঘরে। গাছের উপর কল-গুঞ্জন করে পাখীরা তাদের সমজাতীয় পাখীদেরকে জানাচ্ছে সন্ধ্যার আগমনী পয়গাম। উ ঘরে ফিরে যাবার ইরাদা করেছে, অমনি.পিছন থেকে শুনতে পেলো কার পায়ের আওয়ায। ফিরে দেখলো; আব্দুল্লাহ্ আসছেন। হায়া ও লজ্জায় উযরার চোখ নত হয়ে এলো। আব্দুল্লাহ্ কয়েক কদম এগিয়ে এসে বললেন, উযরা! এবার ঘরে চলো। চিন্তা করো না। নয়ীম শীগগিরই এস পড়বে। বসরার কোনো বড়লোক দোস্ত ওকে আসতে বাধা দিয়েছেন।
উফরা কোনো কথা না বলে চললো ঘরের দিকে। পরদিন বসরা থেকে একটি লোক এলে জানা গেলো, নয়ীম রওয়ানা হয়ে গেছেন সিন্ধুর পথে। খবর পেয়ে সাবেরা, আব্দুল্লাহ ও উযরার মনে জাগলো নানারকম ধারণা। সাবেরা ও আব্দুল্লাহর মনে সন্দেহ হলো, হয়তো নয়ীমের আত্মম্ভরিতা তাঁর মনকে ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে বিমুখ করেছে। উর সন্দেহ তাদের থেকে ভিন্ন ধরনের। বসরার বড়ো বড়ো লোক তার দোস্ত, আর তাঁদের কেউ তাকে আসতে বাধা দিয়েছেন, আবদুল্লার এই কথা তাঁর দীলের উপর গভীর রেখাপাত করেছে। বারবার সে মনে মনে বলছে, নয়ীমের দেহ সৌন্দর্য ও বাহাদুরীর খ্যাতি বড়ো বড়ো লোককে তাঁর কাছে টেনে এনেছে। তারা হয়তো তার সাথে সম্পর্ক রাখাটাকেই মনে করে গর্বের বিষয়। সম্ভবতঃ বসরার হাজারো সুন্দরী ও বড়ো ঘরের মেয়ে তার কাছে আত্মনিবেদন করতে লালায়িত। আর আমার মধ্যে এমন গুণই বা কোথায়, যা তাকে ফিরিয়ে রাখবে অপরের প্রতি আকর্ষণ থেকে! যদি তার জিহাদে যেতেই হয়, তবু কেন আমায় বলে গেলেন না? তাঁকে বাঁধা দেবার মতো কে-ই আছে এ বাড়িতে? হয়তো এ এলাকায় তাঁর পেরেশানীর কারণ আমিই ছিলাম না। হয়তো আর কারুর সাথে তিনি পেতেছিলেন মুহব্বতের সম্পর্ক …… কিন্তু না। তা কখনো হতে পারে না। নয়ীম-আমার নয়ীম….. এমন তো নয় কখনো। তিনি তো আমায় ধোকা দিতে পারেন না। আর যদি দেনই, তাহলেই বা তাকে নিন্দা করবার কি অধিকার আছে আমার?
