এই দুনিয়ার প্রত্যেক অণু-পরমাণুর অস্তিত্ব বজায় রাখবার জন্য আঘাতের জওয়াবে আঘাত দিতে হচ্ছে। তাই জিহাদ হচ্ছে মুসলমানে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। দুনিয়াকে শান্তির আবাস করে তুলবার জন্য জরুরী হচ্ছে কুফরের অগ্নিকুন্ড নিভিয়ে দেওয়া।
কুফরের যুলুমের আগুনে জ্বলছে যে অগণিত অসহায় মানুষ, বদর, হোনায়েন, কাদসিয়া, ইয়ারমুক ও আজনাদাইনের যুদ্ধের ময়দানের আমাদের পূর্ব পুরুষদের তীর ধ্বনি ছিলো তাদেরই আর্ত হাহাকারের জওয়াব; আর আজকের দুর্গত মানবতা সিন্ধুর ময়দানে আমাদের তলোয়ারের ঝংকার শুনবার জন্য বেকারার। মুসলমান! তোমাদের কওমের যে মেয়ে রয়েছে সিন্ধরাজের কয়েদখানায় বন্দিনী, তার ফরিয়াদ শুনেছো? আমি তোমাদের সিন্ধু বিজয়ের খোশখবর দিতে চাই।’
মুজাহিদ হচ্ছে আল্লাহর তলোয়ার। যে শির তার সামনে উঁচু হয়ে উঠবে, সে ই হবে ধুলিলুষ্ঠিত। সিন্ধুরাজ তোমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন তলোয়ারের তীক্ষ্ণধার ও বায়ুর শক্তি পরীক্ষা করতে।’
মুজাহিদ দল! জেগে উঠে প্রমাণ করে দাও যে, এখনো তোমাদের শিরায় আরবের শাহ্ সওয়ারদের রক্তধারা জমে যায়নি। একদিকে খোদাওন্দ করীম তোমাদের জিহাদী মনোভাবের পরীক্ষা নেবেন এবং অপরদিকে দুনিয়া তোমাদের আত্মমর্যদাবোধের পরীক্ষা নিতে যাচ্ছে। তোমরা এ পরীক্ষার জন্য তৈরী?
আমরা সবাই তৈরী, আমরা সবাই তৈরী ‘-এই গগণভেদী আওয়ায তুলে বুড়ো জোয়ান সবাই তরুণ মুজাহিদের ডাকে সাড়া দিলো।
নয়ীম বৃদ্ধ ওস্তাদের দিকে তাকালেন। তাঁর ঠোঁটে মৃদু হাসি আর চোখে আনন্দের আঁসু। ইবনে আমের আবার উঠে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতার পর ভর্তির জন্য নাম পেশ করবার জরুরি নির্দেশ দিলে সভা ভাঙলো।
*
রাতের বেলা মুহাম্মদ বিন কাসিমের গৃহে ইবনে আমের, সাঈদ, নয়ীম ও শহরের আরো কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি দিনের ঘটনাবলীর আলোচনায় ব্যস্ত। নয়ীমের প্রভাব কেবল বসরার নওজোয়ানদের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েনি, বরং তার প্রশংসা শোনা যাচ্ছে বয়স্ক লোকদেরও মুখে মুখে। ইবনে আমের তার সুযোগ্য শাগরেদকে ভালো করেই জানতেন। তিনি জানতেন যে, অকুতোভয়ে যে কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবিলা করবার মতো যোগ্যতা তার ভিতরে রয়েছে পুরোমাত্রায়; কিন্ত নয়ীম আজ যা করেছেন, তা তাঁর প্রত্যাশার চাইতেও অনেক বেশি। সাঈদের খুশীরও সীমানা নেই। তিনি বারবার নওজোয়ান ভাগ্নের মুখের দিকে তাকান আর তার মুখ থেকে উৎসারিত হয় তার দীর্ঘজীবন কামনার নেক দোয়া। বক্তৃতার শেষে নয়ীমকে উৎসাহিত করবার জন্য তিনি সবার আগে ফউজে শামিল হবার জন্য নিজের নাম পেশ করেছেন এবং মকতবে তাঁর খেদমতের সবচাইতে জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার জন্য তৈরী হয়েছেন। ইবনে আমেরের দুর্বল হাতে তলোয়ার ধরার তাকৎ আর নেই, তথাপি তিনি তাঁর সুযোগ্য শাগরেদ মুহাম্মদ বিন কাসিম ও নয়ীমের সাথী হবার ইরাদা জানিয়েছেন। কিন্তু বসরার লোকেরা তাকে বাধা দিয়ে একবাক্যে বলেছে, মাদ্রসায় আপনার প্রয়োজন সবচাইতে বেশি। বসরার লোকেরা সাঈদকেও বাধা দিতে চেয়েছে, কিন্তু মুহাম্মদ বিন কাসিম অগ্রবর্তী দলের নেতৃত্বের জন্য একজন অভিজ্ঞ সালারের প্রয়োজন অনুভব করে তাকে নিয়েছেন সেনা বাহিনীর শামিল করে।
নয়ীম প্রতি মুহূর্তে এক মনযিলের নিকটবর্তী হচ্ছেন, আর এক মনযিল থেকে সরে যাচ্ছেন দূরে-বহুদূরে। তিনি মজলিসে বসে বেপরোয়া হয়ে শুনছেন সব আলোচনা। ইবনে আমের অভ্যাসমতো বর্ণনা করে যাচ্ছেন কুফর ও ইসলামের গোড়ার দিকের সংঘাথের কাহিনী। তিনি আলোচনা করেছেন ইসলামের আযীমুশশান মুজাহিদ খালিদ বিন ওয়ালীদের হামলার বিভিন্ন তরিকা।
কে যেন বাইরে থেকে দরজায় করাঘাত করলো। মুহাম্মদ বিন কাসিমের গোলাম দরজা খুলে দিলো। এক বৃদ্ধ আরব এক হতে একটি পুটলি ও অপর হাতে লাঠি নিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। বৃদ্ধের ভুরু পর্যন্ত ভার্ধক্যে সাদা হয়ে গেছে। তার মুখে পুরনো যখমের দাগ। দেখে মনে হয় এককালে তিনি খেলেছেন তলোয়ার-নেযাহ নিয়ে। ইবনে আমের তাকে চিনতে পেরে এগিয়ে এসে মোসাফেহা করলেন। বৃদ্ধ ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, মকতবে আমি আপনাকে খুঁজে এসেছি। সেখানে শুনলাম আপনি এখানে এসেছেন।
‘আপনি বড়ই তকলীফ করেছেন। বসুন।
বৃদ্ধ ইবনে আমেরের কাছে বসলেন।
ইবনে আমের তাঁকে বললেন, বহুদিন পর আপনার যিয়ারত নসীব হলো। বলুন, কি করে এলেন?
বৃদ্ধ বললেন, ‘আজকের মসজিদের ঘটনা শুনেছি লোকের মুখে। যেনওজোয়ানের হিম্মতের তারিফ করছে বসরার বাচ্চা-বুড়ো সবাই, তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি। শুনালাম, সে নাকি আব্দুর রহমানের বেটা। আবদুর রহমানের বাপ ছিলেন আমার অতি বড় দোস্ত। ছেলেটির সাথে দেখা হলে আমার তরফ থেকে কয়েকটি জিনিস আপনি তাকে দেবেন।
বৃদ্ধ তাঁর পুটলি খুলে বললেন, ‘পরশু তুর্কীস্তান থেকে খবর পেয়েছি, উবায়দা শহীদ হয়েছে;
‘কোন উবয়দা? আপনার নাতি? ইবনে আমের প্রশ্ন করলেন।
‘হ্যাঁ তাই। আমার ঘরে তার এই তলোয়ার আর বর্ম ফালতু পড়েছিলো। আমার ঘরে এ সব জিনিসের হক আদায় করবার মতো কেউ নেই আর। তাই আমার ইচ্ছা কোন মুজাহিদকে এগুলো ন্যরানা দেবো।’
ইবনে আমের নয়ীমের দিকে তাকালেন। তাঁর মতবল বুঝতে পেরে নয়ীম উঠে গিয়ে বৃদ্ধের কাছে বসতে বসতে বললেন, আপনার গুণগ্রাহিতায় আমি ধন্য। যথাসাধ্য আপনার তোহার সদ্ব্যবহার আমি করবো। আমায় আপনি দোয়া করুন।
