ফ্রান্সিস বেকন ঠিকই বলেছিলেন সাড়ে তিনশ বছর আগে : অল্প দর্শনে লোকে নাস্তিক হয়, কিন্তু দর্শনের মধ্যে ঢুকলে তাকে ধার্মিক হতেই হয়।
আমার মনে পড়ছে মানুষ যখন ধর্ম আর বিজ্ঞান নিয়ে তর্ক করত। নতুন বিজ্ঞান–মনোবিজ্ঞানযীশু যা শিক্ষা দিয়েছেন তাই শিক্ষা দেয়। কেন? মনস্তাত্ত্বিকরা জানেন প্রার্থনা আর তাঁর ধর্মাকাঙক্ষা সমস্ত রকম দুশ্চিন্তা দূর করে, দূর করে উদ্বেগ, ভয় আর অর্ধেক রোগ। তারা জানেন, যেহেতু তাদেরই ডঃ এ. এ. ব্রিল বলেছেন : সত্যিকার যে ধর্মপরায়ণ তার মনরোগ জন্মায় না।
ধর্ম যদি সত্য না হয়, তাহলে জীবন হয়ে পড়ে অর্থহীন। এটা হাস্যকর হলেও করুণ।
হেনরী ফোর্ডের মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তাঁর সঙ্গে আমি দেখা করি। তার সঙ্গে দেখা করার আগে ভেবেছিলাম পৃথিবীর একটি বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্লান্তি তাঁর মধ্যে প্রকাশ পাবে । তাই অবাক হয়ে গেলাম যখন আটাত্তর বছর বয়সেও তাকে শান্ত সমাহিত দেখতে পেলাম। তাই যখন জানতে চাইলাম তিনি দুশ্চিন্তা করেন কি না, তিনি জবাব দিলেন, না। আমার মনে হয় ঈশ্বরই সমস্ত কিছু পরিচালনা করছেন আর তাই তিনি আমার কোন পরামর্শ চান না। ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। তাই দুশ্চিন্তার কি প্রয়োজন?
আজকের দিনে তাই মনস্তাত্ত্বিকরাও ধর্মপ্রচারক হয়ে পড়ছেন। তারা ধর্ম পালন করার কথা পরজীবনের শান্তির জন্য বলেন না বরং বলছেন এ জীবনের নরকাগ্নি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য। সেই নরকাগ্নি হল পাকস্থলির আলসার, এনজাইনা পেকটরিস, স্নায়ু ভেঙে পড়া আর পাগল হওয়া।
হ্যাঁ, খ্রিস্টধর্ম অত্যন্ত উৎসাহ ব্যঞ্জক স্বাস্থ্যদায়ক কাজ। যীশু বলেছেন : আমি এসেছি এইজন্যেই যে তোমরা আরও জীবন লাভ করতে পারো। যীশু তাঁর আমলে ধর্মের সূক্ষ্ম নিয়ম কানুন সম্বন্ধে প্রতিবাদ জানাতেন। তিনি ছিলেন এক বিদ্রোহী! তিনি এক নতুন ধর্ম সৃষ্টি করেন–যে ধর্ম পৃথিবীকে বদলে দিতেই চেয়েছিল। তাই তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। তিনি বলেছিলেন ধর্ম মানুষেরই জন্য ধর্মই মানুষ নয়। দুটি মানুষের জন্য–ছুটির জন্য মানুষ নয়। তিনি ভয়ের বিরুদ্ধে যত কথা বলেছিলেন পাপের জন্য ততটা নয় । যীশু তাঁর শিষ্যদের আনন্দ করতে বলতেন। তিনি এই শিক্ষাই দিতেন।
যীশু বলতেন ধর্মের দুটো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে : মন প্রাণ ঢেলে ঈশ্বরকে ভালোবাসো আর পড়শীকে নিজের মত মনে করো।
আধুনিক মনস্তত্বের জনক উইলিয়াম জেম্স তার বন্ধু প্রফেসর টমাস ডেভিডসনকে লিখেছিলেন। ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে আমার চলা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
বইটির গোড়ায় দুটি গল্পের কথা বলেছিলাম । একটি আগে বলেছি, এবার দ্বিতীয়টি বলছি। একজন মহিলার কাহিনী এটি, যিনি ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে কিছুতেই চলতে পারেন নি।
আমি মহিলাটির নাম বলছি মেরী কুশম্যান, যদিও এটা তার আসল নাম নয়। এটা তাঁর পরিবারের পরিচয় গোপন রাখার জন্যই মাত্র। তবে কাহিনীটি সত্য। সেটা এই রকম :
তিনি লিখেছিলেন–অর্থনৈতিক ডামাডোলের সময় আমার স্বামীর সাপ্তাহিক আয় ছিল মাত্র আঠারো ডলার। মাঝে মাঝে তাও জুটত না কারণ তিনি অসুস্থ থাকতেন। মাঝে মাঝে নানা ব্যাধি আসত, মামপস, পীতজ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি। যে বাড়িটা নিজেদের হাতের তৈরী করি সেটাও শেষ পর্যন্ত চলে যায়। মুদীর দোকানে আমার দেনা ছিল পঞ্চাশ ডলার। পাঁচটা সন্তানকে খাওয়াতেও হত। পড়শীদের জামা কাপড় ইস্ত্রী করতাম আমি আর পুরনো জামা কাপড় কিনে ছেলেমেয়েদের ব্যবহারের মত করে নিতাম। দুশ্চিন্তায় আমার অসুখ করে । একদিন যে মুদীর কাছে আমাদের ধার ছিল পঞ্চাশ ডলার সে অভিযোগ করল আমাদের এগারো বছরের ছেলে কয়েকটা পেন্সিল চুরি করেছে। ছেলে আমায় কেঁদে সব কথা বলল । আমি জানতাম আমার ছেলে সৎ আর নম্র সে কখনই পেন্সিল চুরি করেনি। ব্যাপারটায় আমি ভেঙে পড়লাম। কত যে কষ্ট আমরা সহ্য করেছি তা ভাবলাম–ভবিষ্যতের কোন আশাই আমাদের রইল না। এরপর সাময়িক ভাবেই বোধ হয় আমার মাথা খারাপ হয়ে যায় । আমি কাপড় কাঁচা কল বন্ধ করে পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে ঘরের জানালা দরজা সব বন্ধ করে গ্যাস চালিয়ে দিলাম কিন্তু আগুন ধরালাম না। বাচ্চা মেয়েটি আমায় বলল, মা তুমি এরকম করছ কেন। আমি বললাম হাওয়া আসছে, তাই। মেয়েকে ঘুমুতে চেষ্টা করতে বললে সে বলল, কী আশ্চর্য, আমরা তো একটু আগেই ঘুম থেকে উঠলাম। আমি বললাম, তা হোক আরও একটু ঘুমবো। একথা বলে হিটার থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসের শব্দ শুনতে লাগলাম। গ্যাসের গন্ধ জীবনে ভুলবো না….
আচমকা আমার মনে হল গান শুনতে পেলাম । মন দিয়ে শুনতে চাইলাম। রান্নাঘরে রেডিওটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। এখন তাতে কিছু আসে যায় না। আচমকা কানে এল কে যেন প্রার্থনা গাইছে, সেই সঙ্গীতের মর্মার্থ হল এই : প্রভু যীশু আমাদের কত বড় বন্ধু, তাঁর কাছে কেন আমরা আমাদের দুঃখ বেদনার কথা জানাই না। ঈশ্বরের কাছে এই কষ্টের কথা বলিনা বলেই আমরা যন্ত্রণা পাই।
ওই গান শুনে আমি বুঝলাম কত বড় ভুল করেছি। আমি একাকী দুঃখ বহন করতে চেয়েছি। ঈশ্বরকে প্রার্থনার মধ্যে সব জানাই নি …। লাফিয়ে উঠে গ্যাস বন্ধ করে জানালা দরজা খুলে দিলাম।
