আমি সারাদিন কাদলাম আর প্রার্থনা করলাম। একমাত্র সাহায্যের জন্য প্রার্থনা জানাইনি–বরং ঈশ্বরের যে আশীর্বাদ পেয়েছি তার জন্য ধন্যবাদ জানালাম : আমার পাঁচটি স্বাস্থ্যবান ছেলেমেয়ে পেয়েছি বলে। আমি ঈশ্বরের কাছে শপথ করলাম জীবনে কখনও অকৃতজ্ঞ হব না। সে প্রতিজ্ঞা আমি রেখেছি।
আমাদের বাড়ি হারাবার পর একটা স্কুল বাড়িতে মাসে পাঁচ ডলার ভাড়ায় থাকতে পেলাম। তবুও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলাম, এই কারণেই যে অন্ততঃ এ জায়গায় শুকনো আর গরম থাকা যায়। আরও ধন্যবাদ দিলাম এজন্য যে, সব কিছু এর চাইতে আরও খারাপ হয়নি।
আমার মনে হয় ঈশ্বর আমার কথা শুনেছিলেন। কারণ একটু একটু করে অবস্থা ভালো হতে লাগলো–রাতারাতি অবশ্য নয়, তবে অবস্থার উন্নতি হলে কিছু টাকা জমালাম। আমি একটা কাজও পেলাম । আমার ছেলেও কাজ পেয়ে গেল । আজ আমার ছেলেমেয়রা সবাই বড়, তারা বিয়েও করেছে। আমার তিনজন সুন্দর নাতি নাতনী আছে। আজ ভাবি সেই ভয়ানক গ্যাস খোলার কথা, হায়! যদি সময় মত না উঠে পড়তাম? তাহলে কত আনন্দময় মুহূর্তই না হারাতাম! কেউ আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে শুনলেই তাই বলি, কখনও একাজ করবেন না। কখনও না । যে অন্ধকার মুহূর্ত আমাদের জীবনে আসে, তা ক্ষণিকের–এরপরেই রয়েছে ভালো সময়…।
আমেরিকায় গড়ে পঁয়ত্রিশ মিনিটে একজন আত্মহত্যা করে। একশ কুড়ি সেকেন্ডে গড়ে একজন পাগলও হয়। এই সব আত্মহত্যা আর উন্মাদ হওয়ার ঘটনা অনেকটাই কমত, যদি এই সব মানুষ ধর্ম আর ঈশ্বরের স্মরণ নিত।
জীবিত মনস্তাত্ত্বিকদের মধ্যে ডঃ কার্ল জাঙ্গ অতি সুনামের অধিকারী। তিনি তার আত্মার সন্ধানে মানুষ বইতে লিখেছিলেন : গত ত্রিশ বছরে পৃথিবীর সব সভ্যদেশের বহু মানুষ আমার পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। আমি শত শত রোগীর চিকিৎসা করেছি। আমার পঁয়ত্রিশ বছর উর্ধ্বের রোগীদের সবাইকার একটাই প্রয়োজন দেখেছি–জীবনে কোন ধর্ম খুঁজে পাওয়া। এটা নির্ভয়েই বলতে পারি তাদের প্রত্যেকেই অসুস্থ হয় প্রাণময় ধর্মের কাছ থেকে তারা যা পেতেন তা হারিয়েছেন বলে, ওদের মধ্যে যারা ধর্মে বিশ্বাস ফিরে পাননি তারা সুস্থও হননি। এই কারণেই কার্ল জাঙ্গের লেখাটি বারবার পড়া দরকার।
উইলিয়াম জেমস ও ঠিক এই কথাই বলে গেছেন : বিশ্বাস এমন একটা শক্তি যার উপর নির্ভর করেই মানুষ বেঁচে থাকে, আর এর অনুপস্থিতি মানেই ধ্বংস অনিবার্য।
বুদ্ধের পর ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা মহাত্মা গান্ধী ও প্রার্থনার শক্তিতে উজ্জীবিত না হলে ঢের আগেই ভেঙে পড়তেন। একথা কি করে জেনেছি? গান্ধী নিজেই কথাটা বলেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, প্রার্থনা ছাড়া অনেক আগেই আমি পাগল হয়ে যেতাম।
হাজার হাজার মানুষের কথাও তাই। আমার বাবা, যার কথা আগেই বলেছি–তিনি আমার মা–র প্রার্থনা আর বিশ্বাস ছাড়া হয়তো জলে ডুবে আত্মহত্যাই করে বসতেন। আমাদের পাগলাগারদগুলোর হাজার হাজার নিপীড়িত মানুষ যদি একাই তাদের ভার বহন না করে বড় শক্তির কাছে প্রার্থনা করত তাহলে তাদের আত্মা শান্তি পেত।
আমরা যখন কষ্টে পড়ি তখন ঈশ্বরের স্মরণ নিই। যে বিপদে পড়ে সে আর নাস্তিক থাকে না। কিন্তু বিপদে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি কেন? আমরা নিজেদের শক্তি রোজই বাড়াব না কেন? শুধু রবিবারের জন্যই অপেক্ষা করব কেন? বহুঁকাল ধরেই আমি শনি বা রবিবার ছাড়া ফাঁকা গির্জায় গিয়েছি। যখন খুব তাড়াহুডোর ব্যাপার করি তখনই নিজেকে বলতে চাই : এক মিনিট দাঁড়াও, ডেল কার্নেগী। এত তাড়াহুড়ো কেন? ক্ষুদ্র মানুষ, তোমার ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা দরকার। এরকম অবস্থায় আমি প্রথম যে গিজা পাই তাতেই প্রবেশ করি। যদিও আমি প্রটেস্টান্ট ধর্মে বিশ্বাসী, তবুও আমি ফিফথ এ্যাভিনিউর রোমান ক্যাথলিক চার্চে ঢুকে পড়ি এবং মনে করি আর মাত্র ত্রিশ বছরের মধ্যে আমার আয়ু সীমাবদ্ধ; কিন্তু সমস্ত চার্চের আধ্যাত্মিক সত্য চিরকালীন। সেখানে চোখ বন্ধ করে বসে আমি প্রার্থনা করতে থাকি। এর ফলে আমার ক্ষমতা আর মুল্যবোধ ফিরে পাই। আপনাকেও এরকম করার পরামর্শ দিতে পারি ।
এ বই লেখার সময় গত ছ’বছর ধরে আমি অসংখ্য উদাহরণ জোগাড় করেছি। স্ত্রী পুরুষরা কিভাবে প্রার্থনার মধ্য দিয়ে তাদের ভয় আর উৎকণ্ঠা দূর করেছেন। এখানে একজন বই বিক্রেতা জন আর, অ্যান্টনীর বিচিত্র অভিজ্ঞতার কাহিনী শোনাব । তিনি সেটা আমাকে বলেছিলেন।
বাইশ বছর আগে আমি আমার আইন ব্যবসার প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে এক আমেরিকান আইন বই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রেতা হই। আমার বিশেষত্ব ছিল নিতান্ত দরকারী আইনের বই আইনজ্ঞদের বিক্রী করা।
আমি বেশ দক্ষই ছিলাম। সব কায়দা কানুনই আমার জানা ছিল। আইনজ্ঞের কাছে যাওয়ার আগে আমি তার আয়, কাজ কর্ম ইত্যাদি সম্পর্কে জেনে নিতাম । সাক্ষাতের সময় ওই খবরগুলোই কাজে লাগাতাম। তবুও কোথাও একটা গোলমাল হত, আমি অর্ডার পাচ্ছিলাম না।
খুবই হতাশ হয়ে পড়লাম । দ্বিগুণ উৎসাহে কাজে নামলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের খরচও উঠতো । একটা ভয় আমায় চেপে ধরল। লোকের কাছে যেতেই ভয় লাগত। ভয়টা এমনই হল যে কারও। কাছেই হাজির হতে পারতাম না, ঘুরে চলে আসতাম।
আমার ম্যানেজার আমাকে তিরস্কার করে জানালেন বিক্রী না বাড়াতে পারলে আগাম টাকা বন্ধ করে দেবেন। বাড়িতে আমার স্ত্রী তিনটি সন্তানকে মানুষ করতে এবং মুদির টাকা মেটানোর জন্য আরও টাকা চাইতে লাগলেন। দুশ্চিন্তা আমায় চেপে ধরল। ক্রমেই মরীয়া হয়ে উঠলাম। কি করব বুঝতে পারলাম না। আমি একেবারে ভেঙে পড়লাম। হোটেলের বিল মেটাবার ক্ষমতাও আমার ছিল না। বাড়িতে ফেরার গাড়ি ভাড়াও আমার ছিল না–নৈশভোজ হিসেবে খেলাম মাত্র একগ্লাস দুধ। সম্পূর্ণ পরাজিত এক মানুষই ছিলাম আমি। হতাশা আর দুঃখে ভেঙে পড়ে বুঝলাম মানুষ কেন জানালা দিয়ে লাফিয়ে আত্মহত্যা করে। সাহস থাকলে আমিও হয়তো তাই করতাম। অবাক হয়ে কেবল ভাবতাম এ জীবনের উদ্দেশ্য কি?
