এক বছর বন্যা হলনা, প্রচুর শস্য জন্মালো। আমাদের গরু বাছুরদের খাইয়ে মোটা করা হল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সে বছর শস্যের দাম কমে গেল আর আমরা বিক্রি করে পেলাম মাত্র বিশ ডলার। সারা বছরের পরিশ্রমের দাম মাত্র ত্রিশটা ডলার।
দুশ্চিন্তামুক্ত নতুন জীবন সব কাজেই আমাদের ক্ষতি হচ্ছিল। কোন ব্যাপারেই সাফল্য ছিল না। দশ বছরের হাড়ভাঙা খাটুনির ফল হল আমরা দেনায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত। যে ব্যাঙ্কে খামার বাধা দেওয়া ছিল তারা বাবাকে অপমান করে সেটা নিয়ে নেবে জানালো। বাবার বয়স ছিল সাতচল্লিশ, ত্রিশ বছরের কঠোর পরিশ্রমে তিনি পান শুধু দেনার দায় । বাবা সেটা সহ্য করতে পারেন নি–দুশ্চিন্তায় তার শরীর ভেঙে গেল। খিদে ছিল না তার, স্বাস্থ্য ভেঙে গেল, ওজন কমে গেল। ডাক্তার বললেন বাবা আর ছ’মাসও বাঁচবেন না। বাবা খামারে ঘোড়াদের খাওয়াতে গিয়ে ফিরতে দেরী করলে মা ছুটে যেতেন। মা ভয় পেতেন হয়তো দেখবেন বাবার নিষ্প্রাণ দেহ পড়ে আছে। বাবা ১০২ নদীর ব্রিজে দাঁড়িয়ে ভাবতেন ঝাঁপিয়ে পড়ে সব জ্বালা শেষ করে দেবেন কি না।
অনেক বছর পরে বাবা বলেছিলেন তিনি ঝাঁপ দেননি শুধু মা–র ঈশ্বরে বিশ্বাসের জন্য। মা বলতেন আমরা যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি তাহলে শেষ পর্যন্ত সব ঠিক হয়ে যাবে। মা ঠিকই বলেছিলেন, সব শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় মিটে গেল। বাবা এরপরেও বিয়াল্লিশ বছর বেঁচে ছিলেন আর ১৯৪১ সালে উননব্বই বছর বয়সে মারা যান।
ওই সমস্ত বছরের কষ্ট আর হৃদয় বেদনায় মা কখনও দুশ্চিন্তা করেন নি। তিনি ঈশ্বরের কাছে সব কষ্টের কথা বলে প্রার্থনা করতেন। প্রতি রাতে শুতে যাওয়ার আগে মা বাইবেল থেকে খানিকটা পড়ে শোনাতেন। মা আর বাবা প্রায়ই যীশুর সান্ত্বনার সেই বাণী পড়তেন : আমার পিতার প্রাসাদে অনেক ঘর আছে ….সেখানে তোমাদের জন্য ঘর রাখবো …আমি যেখানে থাকবো তোমরাও সেখানে থাকবে। এরপর আমরা হাঁটু মুড়ে বসে ঈশ্বরের কাছে চাইতাম ভালবাসা আর আশ্রয় ।
উইলিয়াম জেমস যখন হার্ভার্ডের প্রফেসর, তিনি বলেছিলেন : দুশ্চিন্তার একমাত্র ওষুধ হল ধর্মে বিশ্বাস রাখা।
এটা আবিষ্কারের জন্য হার্ভার্ডে যাওয়ার দরকার হবে না। আমার মা মিসৌরীর খামারেই তা জানতে পারেন। বন্যা, দেনা বা কষ্ট তার সুখী হাস্যোজ্জ্বল মুখের ভাব নষ্ট করতে পারেনি। আমার এখনও কানে ভেসে আসে মা কাজ করতে করতে এই গানটা গাইছেন :
ঈশ্বরের কাছ থেকে বর্ষিত হয়ে চলেছে অপরূপ শান্তি,
প্রার্থনা করি চিরকাল যেন আমার শক্তি প্রেমে ডুবে থাকে।
মা চেয়েছিলেন আমি ধর্মের কাজে আত্মনিয়োগ করি। আমি বিদেশে মিশনারীর কাজ নেব ভেবেও ছিলাম। তারপর কলেজে ঢুকলাম। তারপর আস্তে আস্তে আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এল। আমি জীববিদ্যা, বিজ্ঞান, দর্শন আর তুলনামূলক ধর্মপুস্তক নিয়ে পড়তে আরম্ভ করলাম। বাইবেল কিভাবে রচিত হয় তা পড়লাম। আমি বাইবেলের অনেক বিষয়েই প্রশ্ন তুলোম। সেকালের ধর্ম প্রচারকদের কাজকর্মের সম্বন্ধেও এসব প্রশ্ন তুলোম। আমি একটু বিহ্বল হয়ে পড়ি। ওয়াল্ট হুইটম্যানের মতই আমার অদ্ভুত সব প্রশ্ন জেগে উঠল। জীবনের কোন মূল্য আছে বলে মনে হল না। কি বিশ্বাস করা উচিত বুঝতে পারলাম না। প্রার্থনা বন্ধ করে দিলাম। মনে জাগল কোটি কোটি বছর আগের ডাইনোসরদের মতই মানুষের কোন স্বর্গীয় উদ্দেশ্য নেই। ভাবলাম ডাইনোসরদের মত মানুষও একদিন লুপ্ত হবে। আমি জানতাম বিজ্ঞানে আছে সূর্য আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে আসবে এবং তাপ শতকরা দশভাগ কমলেই পৃথিবী থেকে সব প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
এসব প্রশ্নের উত্তর জানি বলে প্রচার করব? না। কোন মানুষই এখনও জীবন রহস্য ব্যাখ্যা করতে পারেনি। আমরা রহস্যেই আবৃত। আমাদের শরীরটাই রহস্য। বাড়িতে যে বিদ্যুৎ আছে সেটাও তাই। ফাটা দেওয়ালে ফুল ফোঁটাও তাই। জানালার বাইরে সবুজ ঘাসও তাই । জেনারেল মোটরস রিসার্চ এর চার্লস এফ কেটারিং ঘাস কেন সবুজ জানার জন্য নিজের পকেট থেকে অ্যান্টিয়ক কলেজকে বছরে হাজার ডলার করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন আমরা যদি জানতে পারি ঘাস কি করে সূর্যালোক, জল আর কার্বনডাই–অক্সাইডকে খাদ্য আর শর্করায় পরিণত করে, তাহলে আমরা সভ্যতাকে বদল করতে পারব।
আপনার গাড়ির ইঞ্জিনের কাজও কম আশ্চর্য নয়। জেনারেল মোটরস, রিসার্চ ল্যাবরেটরিগুলি কোটি কোটি টাকা খরচ করে জানার চেষ্টা করেছেন সিলিন্ডারে সামান্য এক স্ফুলিঙ্গ কিভাবে মোটর চালায়।
আমাদের শরীর, বিদ্যুৎ, ইঞ্জিন ইত্যাদির রহস্য না জানলেও এসব আমাদের ব্যবহারে বাধা নেই। প্রার্থনা ও ধর্মের রহস্য আমি বুঝিনা বলে তা উপভোগ করতে পারব না এমন কথাও নেই। শেষ পর্যন্ত আমি সান্ডায়নের কথার মর্ম অনুধাবন করছি : মানুষ জীবন কি জানার জন্য জন্মায় নি, জন্মেছে তা উপভোগ করার জন্য।
আমি বোধ হয় ধর্মের ব্যাপারে কথা বলছি মনে হবে। আসলে তা নয়। আমি ধর্মের এক নতুন উপলব্ধি লাভ করেছি। গির্জায় যে মতভেদ আছে তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু ধর্ম আমার কি করতে পারে তা নিয়ে আমার ভাবনা আছে। যেমন ভাবনা আছে বিদ্যুৎ, ভাল খাদ্য ইত্যাদি নিয়ে । এগুলো আমায় আরও ভালো জীবন যাপনে সাহায্য করে, কিন্তু ধর্ম তার চেয়েও বেশি করে। এ দেয় সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ। এ আমায় সুখী, পূর্ণ জীবন কাটাতে সাহায্য করে। উইলিয়ম জেমসের ভাষায় আমরা যা পাই তাহল জীবনের নব আনন্দ …আরও জীবন …আর পরিপূর্ণ জীবন। এ আমায় দেয় সুস্বাস্থ্য, বিশ্বাস, আশা এবং সাহস। জীবনের এক নতুন দিগন্তই আমাদের সামনে খুলে ধরে।
