একবার ভাবতে পারেন যে মানুষ পথ চলতে গিয়ে কুলির করমর্দন করে, পাঁচককে সহানুভূতি জানায় আর কুকুরের প্রশংসা করে; তাকে কখনও কোন মনস্তাত্বিকের কাছে যেত হয় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে? কখনই তা বলতে পারবেন না। এক চীনা প্রবাদ আছে : হাতে গোলাপ ফুল ধরলে তার কিছু গন্ধ লেগে থাকে।
বিলি ফেলপস একথা যে জানতেন তা আর বলতে হয় না ।
আপনি যদি পুরুষ হন তাহলে এই অংশটা না পড়তেও পারেন। এতে আপনার আগ্রহ না লাগাই সম্ভব। এতে শোনাব এক অসুখী, দুশ্চিন্তা পীড়িত তরুণীকে কিভাবে বেশ কজন পুরুষ বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি আজ ঠাকুমা হয়েছে। বেশ ক বছর আগে আমি ওই মেয়েটির এবং তার স্বামীর বাড়িতে রাত কাটাই। ওদের শহরে আমি বক্তৃতা দেবার জন্য গিয়েছিলাম পরদিন সকালে সে আমায় গাড়ি চালিয়ে পঞ্চাশ মাইল দূরে স্টেশনে পৌঁছে দেয়। কথায় কথায় আমি তাকে বন্ধুত্ব অর্জন নিয়ে কথা বললে সে বলে : মিঃ কার্নেগী, আপনাকে এমন কিছু শোনাবো যা আমার স্বামীকেও বলিনি । সে আমায় জান্নাত। সে মানুষ হয় ফিলাডেলফিয়ার এক সমাজ সেবার অফিসে। সে বলে : আমার শৈশব কাটে চরম দাদি। এবং পোষাক ছিল খুব সস্তার। আমার এতে লজ্জার অবধি ছিল না, তাই কাঁদতাম। আমার সহকারীকে তাই সব সময় তার নিজের কথা জিজ্ঞাসা করতাম, যাতে সে আমার পোষাকের দিকে না তাকায়। এতে একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটে গেল। আমি ওই তরুণদের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে উঠলাম। আমি চমৎকার শ্রোতা ছিলাম, তারাও তাই খুব খুশি হত। তাই আমি হয়ে উঠলাম সবচেয়ে জনপ্রিয় তরুণী । ওদের তিনজন আমায় বিয়ের প্রস্তাব করল।
এ কাহিনী শুনে অনেকেই হয়তো বলবেন, অন্যের ব্যাপারে আগ্রহী হওয়া বাজে ব্যাপার! এসব আমার চলবে না। আমার টাকা আমার ব্যাগেই রাখব, ইচ্ছেমত সব খরচ করবো–কারও কথায় কান দেব না!
তা আপনার অভিমত এ রকম হলে করার কিছু নেই, তবে আপনার কথা যদি ঠিক হয় তাহলে ইতিহাসের প্রারম্ভ থেকে আজ পর্যন্ত যত দার্শনিক আর শিক্ষাগুরু জন্মেছেন যেমন,যীশু, কনফুসিয়াস, বুদ্ধ, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস, সেন্ট ফ্রান্সিস–সবাই ভুল করেছেন। ধর্মগুরুদের কথা আপনার ভাল না লাগলে আসুন কজন নাস্তিক কি বলেছেন শোনা যাক। প্রথমেই ধরা যাক কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এ.ই. হাউসম্যানের কথা। এ যুগের তিনি একজন বিখ্যাত পণ্ডিত। ১৯৩৬ সালে তিনি কেম্ব্রিজে এক ভাষণে অবতার নাম ও প্রকতি নিয়ে বলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন : যীশুর এই কথাই সব সেরা : সবচেয়ে বড় নীতি তারই আবিষ্কার–যে জীবন আবিষ্কার করতে পারে, সেই তা হারায়, আর যে আমার জন্য জীবন হারাবে সেই তা খুঁজে পাবে।
আমার সারা জীবন ধরেই ধর্মপ্রচারকদের একথা বলতে শুনেছি। কিন্তু হাউসম্যানের কথা আলাদা, তিনি ছিলেন ঘোর নাস্তিক আর বাস্তববাদী; একসময় আত্মহত্যার কথাও তিনি ভেবেছিলেন। তিনিই। বলেছিলেন : যে শুধু নিজের কথা ভাবে সে জীবনে কিছুই পায় না। সে বড় দুঃখী। কিন্তু অন্যের উপকার যে করে সে জীবন পরিপূর্ণ উপভোগ করতে পারে।
হাউসম্যান যদি আপনার মনে দাগ কাটতে না পারেন তাহলে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আমেরিকান নাস্তিক থিয়োডোর ড্রেইসারের পরামর্শ নিতে পারেন। ড্রেইসার সব ধর্মকে বলতেন : নিছক রূপকথা আর বোকাঁদের উদ্ভট কল্পনা। জীবন তার কাছে মূল্যহীন। এসত্ত্বেও ড্রেইসার যীশুর একটা কথা মানতেন–অপরকে সেবা করা।
অতএব অপরের জীবন যদি আমরা সুখময় করতে চাই, তাহলে কেবল নিজের জন্য নয়, অন্যদের উন্নতি জন্য চেষ্টা করা উচিত। নিজের আনন্দ নির্ভর করে অন্যদের আনন্দের উপর। তাই ড্রেইসারের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা যদি অন্যদের উন্নতির চেষ্টা করি তা এখনই করা উচিত। যদি দুশ্চিন্তা কাটিয়ে শান্তি আহরণ করতে চাই, চাই সুখ, তাহলে সাত নম্বর নিয়ম হলো :
অপরের প্রতি আগ্রহী হয়ে নিজেকে ভুলে যান। প্রতিদিন অন্তত একজনের মুখে হাসি আর আনন্দ ফুটিয়ে তুলুন।
১৯. আমার বাবা মা কীভাবে দুশ্চিন্তা দূর করেন
আগেই বলেছি, আমি মিসৌরীর এক খামারে মানুষ হই। সে কালের কৃষকদের মতই আমার বাবা মা খুবই কষ্ট করতেন। মা এক গ্রামে শিক্ষিকার কাজ করতেন আর বাবা প্রচুর খেটে মাসে মাত্র বারো ডলার আয় করতেন। মা শুধু আমাদের পোশাকই বানাতেন না, সাবান তৈরিও করতেন কাপড় কাঁচবার জন্য ।
আমাদের কদাচিৎ নগদ পয়সা থাকতো–একমাত্র বছরে একবার যখন শুয়োর বিক্রি করা হত। আমাদের মাখন আর ডিম বদলে আমরা পেতাম ময়দা, চিনি আর কফি। আমার যখন বারো বছর বয়স তখনও বছরে খরচা করার জন্য পঞ্চাশ সেন্টও পেতাম না। আমার আজও মনে পড়ে একদিন ৪ঠা জুলাই বাবা আমায় খরচ করার জন্য দশ সেন্ট দেন। আমার মনে হয়েছিল যে ভারতবর্ষের সমস্ত সম্পদ হাতে পেয়েছি।
আমি এক মাইল হেঁটে গ্রামের এক কামরার স্কুলে যেতাম। যখন হাটতাম তখন হাঁটু অবধি বরফ ঠেলে যেতে হত, তাপমাত্রা শুন্যের আঠাশ ডিগ্রী নিচে। চৌদ্দ বছর বয়সের আগে রবার ঢাকা জতো পাইনি। সারা শীতকালই আমার পায়ের পাতা ঠান্ডায় ভিজে থাকতো। ছোট বেলায় ভাবতেই পারিনি কারও শীতকালে পায়ের পাতা শুকনো থাকে।
আমার বাবা মা রোজ মোল ঘন্টা খাটতেন, তবু আমাদের দুর্দশা কাটেনি, সব সময় ধার দেনা আর দুশ্চিন্তা ছিল । আমার মনে পড়ে একবার ১০২ নদীর প্রবল বন্যায় আমাদের সব শস্যক্ষেত্র ভাসিয়ে নেয়। বছরের পর বছর শুয়োরগুলো কলেরায় মারা যায়, তাদের পুড়িয়েও ফেলা হয়। সেই গন্ধ এখনও নাকে আসে।
