ফোন করতে গিয়ে আমার নিজের কথা ভুলে গেলাম। এতই উত্তেজিত হই যে আমার পঙ্গুত্ব আর রইল না। অপরের জন্যই আমি আবার নিজেকে ফিরে পেলাম আর কখনও শয্যায় পড়ে থাকতে হল না আমাকে। এখন বুঝি জাপানীরা পার্ল হারবার আক্রমণ না করলে এটা হতো না, আমি সারাজীবন পঙ্গু হয়েই থাকতাম।
পার্ল হারবার আক্রমণ আমেরিকার ইতিহাসে বিরাট এক বিয়োগান্ত অধ্যায়, কিন্তু আমার কাছে হয়েছে আশীর্বাদ। ওই প্রচণ্ড প্রয়োজনই আমায় জাগিয়ে তোলে, তাই নিজের কথা ভাববার সুযোগ ছিলো না।
মনস্তাত্ত্বিকদের কাছে যারা সাহায্যের আশায় ছোটেন তাঁদের অন্ততঃ এক তৃতীয়াংশ রোগ মুক্ত হতেন যদি তারা মার্গারেট ইয়েটসের মত অপরের ভালো করার কথা ভাবতেন। এটা আমার কথা? মোটেই না, ঠিক এই কথাই বলেছেন কার্ল জাঙ্গ, তিনি বলেছিলেন : আমার রোগীদের এক তৃতীয়াংশই কোন রোগে ভোগে না, তারা ভোগে অসাড় উদ্দেশ্যহীন আর শূন্যতায়।
আপনি হয়তো বলবেন, এ কাহিনী আমার মনে দাগ কাটছে না। আমি নিজেও দুজন অনাথকে নিয়ে সময় কাটাতে পারতাম বা পার্ল হারবারে থাকলে মার্গারেট ইয়েটসের মতোই কাজ করতাম। কিন্তু আমার জীবন আলাদা। সাধারণ জীবন আমার। রোজ আটঘণ্টা বাজে কাজ করি। নাটকীয় কিছুই আমার জীবনে ঘটে না। অন্য লোকের ব্যাপারে আমার আগ্রহ জাগবে কেন? এতে আমার লাভ কী হবে?
প্রশ্নটার যথাযথ জবাব দেয়ার চেষ্টাই করব। আপনার জীবন যতই একঘেয়ে হোক, রোজই কোনো কোনো মানুষের সঙ্গে আপনার দেখা হয়। তাদের ব্যাপারে কি করেন? শুধু কি তাকিয়ে দেখেন না ভাবেন তারা কীভাবে থাকে? যে ডাকপিওন কয়েকশ মাইল হেঁটে আপনার চিঠি বিলি করে একবারও ভেবেছেন কি সে কোথায় থাকে? তার বৌ ছেলেমেয়েদের ছবি কোনোকালে দেখতে চেয়েছেন কি? কখনও কি প্রশ্ন করেছেন তার ক্লান্তি আসে কিনা বা কাজ তার একঘেয়ে লাগে কিনা?
মুদির দোকানের ছেলেটির কথাই ধরুন। তার সম্বন্ধে কখনও ভেবেছেন? আপনার দৈনিক খবর কাগজওয়ালার সম্বন্ধে কোনো খবর রাখেন? কিংবা ঐ যে ছেলেটি জুতো পালিশ করছে তার কোন খবর? মানুষ হিসেবে এদের মনে দুঃখ, কষ্ট, এবং যে উচ্চাশার স্বপ্ন দেখে তাদের কথা কোনদিন শুনতে চেয়েছেন কি? এই রকম কথাই বলছি। পৃথিবীকে ভালোভাবে উন্নতি করতে আপনাকে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল বা সমাজসংস্কারক হতে হবে না। যে সব মানুষের দেখা পান তাদের দিয়ে কাল থেকে কাজ শুরু করতে পারেন।
এসব করে আপনার কি হবে? আরও বেশি সুখ পাবেন, পাবেন আত্মগর্ব। অ্যারিস্টটল একেই বলেছিলেন, ‘আলোকপ্রাপ্ত স্বার্থপরতা’। জরথুষ্ট বলেছিলেন, ভালো কাজ করা কোনো কর্তব্য পালন করা নয়। এ হল একটি আনন্দ, এতে আপনার স্বাস্থ্য আর সুখ বেড়ে যাবে। বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন আরও সরলভাবে বলেছিলেন–আপনি অন্যের প্রতি ভালো হলে আপনি হবেন সর্বশ্রেষ্ঠ।
অন্যের কথা ভাবলে আপনার যে কেবল দুশ্চিন্তা দূর হবে তাই নয়, এর ফলে আপনার ঢের বন্ধু হতে আর মজাও পাবেন। কেমন করে? কথাটা একবার ইয়েলের প্রফেসর উইলিয়াম লিও ফেলসূকে জিজ্ঞাসা করি। তিনি যা বলেছিলেন তা এইরকম : আমি হোটেল, নাপিতের দোকান বা কোন দোকানে যখনই যাদের দেখা পাই তাদের মিষ্টি কথা না বলে যাই না। আমি এমনভাবে কথা বলি যাতে তারা বোঝে তারা কোন যন্ত্র নয়। কোন দোকানে গেলে যে মেয়েটি আমায় জিনিস পত্র বিক্রি করে তাকে বলি তার চুল বা চোখ কি সুন্দর। নাপিতকে বলি সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকতে তার কষ্ট হয় কিনা। আমি দেখেছি মানুষের নিজেদের সম্পর্কে আগ্রহ দেখালে তাদের মুখ চোখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। আমি তাদের সঙ্গে প্রায়ই করমর্দন করি। মনে পড়ছে এক গ্রীষ্মঝরা দিনে আমি নিউ হ্যাঁভেন রেলপথের ডাইনিং কামরায় মধ্যাহ্ন ভোজ সারতে যাই। ভিড় উপচে পড়া কামরাটাকে মনে হচ্ছিল যেন আগুনের চুল্লী, কাজকর্মও বেশ ধীর। শেষ পর্যন্ত যখন স্টুয়ার্ড আমার হাতে মেনু তুলে দিল আমি বললাম : যে ছেলেরা এই গরমে রান্না করছে তাদের আজ খুবই কষ্ট। স্টুয়ার্ড চাপা গলায় অভিশাপ বর্ষণ করছিল, ওর গলার স্বর ছিল তিক্ত। প্রথমে ভাবলাম সে ক্রুদ্ধ । আচমকা সে বলল : ঈশ্বর সর্বশক্তিমান। লোকে এখানে এসে কেবল খাদ্য খারাপ এই কথাটাই বলে। তারা ধীর কাজ, দাম আর গরম সম্বন্ধে অভিযোগ জানায়। গত উনিশ বছর ধরে এই অভিযোগ শুনে আসছি আমি, আর আজ আপনিই একমাত্র মানুষ যিনি ফুটন্ত রান্নাঘরের পাঁচকদের জন্য এ কথা বললেন। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি আপনার মত আরও যাত্রী যেন আসেন।
স্টুয়ার্ড অবাক হয়েছিল কারণ আমি ওই রেলপথের রান্নাঘরের নিগ্রো পাঁচকদের মানুষ বলেই ভেবেছিলাম, তাদের রেলপথের মেশিনের যন্ত্র মাত্র ভাবতে পারিনি। তাদের মানুষ মনে করেছিলাম। মানুষ যা চায় তা হল তাদের একটু মানুষ বলেই ভাবা হোক। রাস্তায় চলার ফাঁকে কারও কোন কুকুর। দেখলে তার প্রশংসা করি আমি। তারপর এগিয়ে যাওয়ার পর পিছনে ফিরে তাকালে দেখি লোকটি কুকুরকে আদর জানাচ্ছে।
একবার ইংল্যাণ্ডে একজন মেষপালককে দেখি, তার ভেড়ার রক্ষক কুকুরটিকে দেখে আমার প্রশংসা বাঁধ মানে নি। আমার প্রশংসায় মেষপালক দারুণ খুশি হয়। ঐ কুকুর আর তার মেষপালক সম্বন্ধে সামান্য আগ্রহ দেখানোর ফলে আমি ঐ মেষপালককে আনন্দ দিয়েছিলাম এবং নিজেও আনন্দ পেয়েছিলাম।
