ড. অ্যাডলার আমাদের প্রতিদিন একটা ভাল কাজ করতে বলেছেন। কিন্তু ভালো কাজ কী? মহাপুরুষ মহম্মদ বলেছিলেন, যে কাজ করে অপরের মুখে হাসি ফোঁটানো যায় সেটাই ভালো কাজ।
প্রতিদিন কোনো ভালো কাজ করলে যে করে তার উপর এমন চমৎকার প্রতিক্রিয়া হয় কেন? কারণ অপরকে সুখী করতে গিয়ে আমরা নিজেদের কথা ভুলে যাই। সেটাই যে আমাদের সব দুশ্চিন্তা, ভয় আর বিপদের কারণ।
নিউ ইয়র্কের মিসেস উইলিয়াম টি, মুনকে দুসপ্তাহ ধরে অন্যকে কেমন করে সুখী করা যায় ভাবতে হয়নি। তাঁকে ড. অ্যাডলারের মতো চৌদ্দ দিন পরিশ্রম করতে হয় নি। তার চেয়ে তাড়াতাড়িই তিনি তা করেন মাত্র দুই অনাথকে সুখী করে ।
ঘটনা এই রকমই, যেমন মিসেস মুন আমায় লেখেন : পাঁচ বছর আগে ডিসেম্বরের একদিন আত্মগ্লানি আর দুঃখ আমায় চেপে ধরে। বহুদিন সুখী বিবাহিত জীবন কাটানোর পর স্বামীকে হারাই। বড়দিনের ছুটি এসে গেল আমার দুঃখ আরও বেড়ে গেল। কোনদিন একা বড়দিন কাটাইনি–তাই বড়দিন এগিয়ে এলে ভয়ও বাড়তে লাগল। বন্ধুরা আমায় তাদের সঙ্গে বড়দিন কাটানোর আহ্বান জানিয়েছিল কিন্তু আমার তা ইচ্ছে হল না। আমি জানতাম তাদের মধ্যে বেমানান হয়ে পড়ব। ক্রমশ বড়দিন এগিয়ে এলে আমার আত্মধিক্কার জাগল। এটা সত্যি, অনেক ব্যাপারেই আমার ধন্যবাদ জানাবার ছিল, সকলেরই যা থাকে । বড়দিনের আগের দিন বেলা সাড়ে তিনটের সময় আমি একাকী উদ্দেশ্যহীনভাবে ফিফথ অ্যাভিনিউ বরাবর হাঁটতে শুরু করলাম, আশা ছিল বিষাদ দূর হবে। সারা পথ আনন্দমগ্ন মানুষে জমজমাট–আমার মনে অতিতের সুখ স্মৃতি জেগে উঠল । কিছুতেই মানতে পারলাম
একাকী নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটে ফিরে যাব। কী করব বুঝতে পারলাম না, চোখের জলও বাধা মানল না। একঘণ্টা হাঁটার পর একটা বাসে উঠে পড়লাম। হাডসন নদী পার হয়ে বাসটা কোথাও এসে দাঁড়াতে কন্ডাক্টরকে বলতে শুনলাম, শেষ স্টপ, মহাশয়া। আমি নেমে পড়লাম । এ শহরের নামও জানিনা, তবুও হাঁটতে আরম্ভ করলাম। একটা গির্জার সামনে এসে পড়লাম, সেখানে নীরব রাত্রি সঙ্গীতের মুর্হনা ভেসে আসছে। গির্জা খালি, একমাত্র অর্গ্যান বাদক বসে অর্গান বাজাচ্ছেন। তার অলক্ষে একটা ঘেরা চেয়ারে বসে পড়লাম। সুন্দর সাজানো খ্রিস্টমাস ট্রিতে আলো ঝলমল করে যেন আকাশের তারার দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছিল। পরিবেশটা এমনই যে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতে পারিনি।
যখন জেগে উঠলাম কোথায় আছি বুঝতে পারলাম না। দারুণ ভয় হল। সামনে দেখলাম দুটি শিশু সম্ভবত খ্রিস্টমাস ট্রি দেখতে এসেছিল। একটি মেয়ে আমায় দেখিয়ে বলেছিল, ওঁকে বোধ হয় সান্টাক্লস নিয়ে এসেছে। আমি জেগে উঠলে ওরা ভয় পেয়ে গেল। আমি ওদের বললাম ওদের কিছু করব না। ওদের পোশাক ছিল খুবই মলিন। আমি ওদের বাবা মা কোথায় জানতে চাইলাম। ওরা বলল, আমাদের কোন বাবা মা নেই। বুঝলাম ওই দুজন অনাথের অবস্থা আমার চেয়েও খারাপ। ওদের কথা ভেবে আমার নিজের জন্য লজ্জা হল। আমি ওদের খ্রিস্টমাস ট্রি দেখিয়ে একটা দোকানে নিয়ে গিয়ে খাওয়ালাম আর কিছু জিনিস কিনে দিলাম। আমার নিঃসঙ্গতা নিমেষে যাদুবলেই দূর হয়ে গেল। ওই দই অনাথ আমার মনে যে সুখ এনে দিল তা বহুমাসই পাইনি। ওদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম আমি কত ভাগ্যবান। আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলাম যে ছোটবয়সে কত আনন্দে বাবা মার কাছে বড়দিনের আনন্দ উপভোগ করেছি। ওই দুই অনাথ আমার জন্য যা করল, তার তুলনায় ওদের জন্য কিছুই আমি দিইনি । আমি দেখলাম সুখ বড় ছোঁয়াচে। দিলেই কিছু পাওয়া যায়। কাউকে সাহায্য করে আমি শোক আর নিঃসঙ্গতা দূর করেছি। আমি নতুন মানুষ হয়ে উঠেছি–আর তা বরাবরের জন্য।
.
আমি এমন বহুলোকের গল্প বলতে পারি যারা নিজেদের ভুলে সুখী হয়েছিলেন। এমন গল্পে বহু বই লেখা হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে মার্গারেট টেলার ইয়েটসের কথাই ধরুন তিনি হলেন আমেরিকার নৌবাহিনীর সবচেয়ে জনপ্রিয় মহিলা।
মিসেস ইয়েটস ঔপন্যাসিক, তবে তার রহস্য কাহিনী তাঁর জীবন কাহিনীর চেয়ে বেশি আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি। তার জীবনের সেই সত্য কাহিনী, যেদিন জাপানীরা পার্ল হারবার আক্রমণ করে। মিসেস ইয়েটস প্রায় একবছর ধরে পঙ্গু হয়ে ছিলেন–হার্ট খারাপের জন্য। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বাইশ ঘণ্টায় । শুয়ে কাটাতেন। সবচেয়ে বেশি হাঁটাহাঁটি করতেন তিনি মাত্র দু–ঘণ্টার জন্য বাগানে গিয়ে, পরিচারিকার কাঁধে ভর দিয়ে। তিনি আমায় বলেছিলেন, তিনি ভাবতেন সারা জীবনটাই তাঁর পঙ্গু হয়ে কাটবে। আমি সত্যিই জীবন ফিরে পেতাম না যদি না জাপানীরা পার্ল হারবার আক্রমণ করত আর আমার মনকে এমনভাবে নাড়া না দিত।
এটা যখন ঘটল, মিসেস ইয়েটস লেখেন : সবকিছুতেই গন্ডগোল লেগে যায়। একটা বোমা আমার বাড়ির এতই কাছে পড়ে যে ঝাঁকুনিতে বিছানা থেকে ছিটকে যাই। ট্রাকগুলো পাগলের মত ছুটোছুটি করে সেনাবাহিনীর সবার স্ত্রী আর ছেলেমেয়েদের একটা স্কুল বাড়িতে নিয়ে আসতে থাকে। রেডক্রস থেকে যাদের বাড়িতে বাড়তি ঘর আছে তাদের সবাইকে রাখতে বলে। আমার বাড়িতে ফোন ছিল, তখনই জেনে নিলাম আমার স্বামী নিরাপদেই আছেন। আমি এরপর ফোন করে সকলকে সান্ত্বনা জানাতে লাগলাম । যে সব মহিলার স্বামী মারা গেছিলেন তাদেরও সান্ত্বনা জানালাম। প্রায় আড়াই হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন।
