সি. আর. বার্টনের প্রশংসা করাই উচিত। কী করে বন্ধুত্ব করতে হয় তিনি জানেন। আর এও জানেন কিভাবে দুশ্চিন্তা কাটিয়ে জীবনকে উপভোগ করতে হয়। ঠিক এমনটাই জানতেন ওয়াশিংটনের ডঃ ফ্রাঙ্ক লুপ। তিনি প্রায় তেইশ বছর ধরে বাতের অসুখের ফলে চলৎশক্তি হীন । সিরটল স্টারের স্টুয়ার্ট হোয়াইট হাউস আমায় লেখেন, আমি ডঃ লুপকে বহুবার দেখেছি। তার মত এমন নিঃস্বার্থ মানুষ আর দেখিনি। তাঁর মতো জীবন উপভোগ করতেও কাউকে দেখিনি।
একজন চলৎশক্তিহীন মানুষ কীভাবে জীবন উপভোগ করলেন? তিনি কি সবসময় অনুযোগ আর সমালোচনা করতেন?নাকি চিৎকার করে অপরের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন? এটাও না। প্রিন্স অব ওয়েলসের মত তাঁর জীবনের ব্রত ছিল : ইখ ডিয়েন’–আমি সেবা করি। তিনি অন্যসব চলৎশক্তিহীন মানুষের ঠিকানা জোগাড় করে প্রেরণা দিয়ে চিঠি লিখতেন–এতে তার প্রচুর আনন্দ হত। এইভাবে তিনি একটা লেখার ক্লাবই গড়ে তোলেন। তিনি শেষ পর্যন্ত একটা সঙঘ প্রতিষ্ঠা করেন–তার নাম দেন বন্ধ হয়ে থাকাঁদের সমাজ।
তিনি বিছানায় শুয়ে বছরে গড়পড়তা চৌদ্দশ চিঠি লিখতেন। তিনি হাজার হাজার পঙ্গুকে রেডিও আর বই পাঠাতেন।
ড. লুপ আর অন্যান্যদের মধ্যে তফাৎ কী? এটাই যে ড. লুপের অন্তরে একটা প্রজ্জ্বলিত বাসনা জেগেছিল, একটা উদ্দেশ্য কাজ করত। তিনি জানতেন তার কাজের মধ্যে রয়েছে একটা মহান উদ্দেশ্য। বার্নার্ডাশ বলেছিলেন, অনেক আত্মকেন্দ্রিকই অভিযোগ করে যে সবাই তাকে সুখী করার চেষ্টা করছে না।
বিখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক অ্যাডলার, অ্যাডলারের যে চমৎকার বক্তব্য শুনেছিলাম এখানে সেটাই বলতে চাই। তিনি এগুলো তার মনোবিকলনে আক্রান্ত রোগীদের বলতেন, আপনারা চৌদ্দদিনেই সেরে উঠবেন যদি এই নিয়ম মেনে চলতে পারেন। প্রতিদিন ভেবে দেখুন প্রতিদিন কীভাবে অন্তত একজনকে খুশি করতে পারেন।
কথাটা এতই অবিশ্বাস্য মনে হয় যে ড. অ্যাডলারের বই থেকে কয়েকটা লাইন না পড়লে বিশ্বাস হবে না। বইটার নাম হোয়াট লাইফ সুড মিন টু ইউ।
বইটির ২৫৮ পৃষ্ঠায় ড. অ্যাডলার বলেছেন :
মনোবিকলন জন্মায় বহুদিন ধরে অন্যের প্রতি রাগ আর বিদ্বেষ পুষে রাখার ফলে। এই রোগ হলে রোগীরা নিজেদের দোষ সম্বন্ধে অপ্রসন্ন বোধ করে আর তারা তা করে অন্যের কাছ থেকে যত্ন, দয়া আর সমর্থন আদায় করার জন্য। বিষাদগ্রস্ত রোগীরা প্রথমেই এই রকম ভাবে, আমার মনে পড়ছে আমি যে কোচটায় শুয়ে থাকি আমার ভাই সেখানে শুয়ে ছিল। আমি এমনই কাঁদলাম যে সে জায়গা ছেড়ে উঠে যায়।
বিষাদগ্রস্ত রোগীরা প্রায়ই নিজেদের উপর প্রতিশোধ নিতে আত্মহত্যা করতে চায়। তাই ডাক্তারের প্রথম চেষ্টা হয় তাদের কোন আত্মহত্যার সুযোগ না দেওয়া । আমি তাদের এ থেকে নিবৃত্ত করার জন্য বলি : যা আপনার ভাল লাগে না তা করবেন না। ব্যাপারটা খুবই সামান্য মনে হলেও আমার ধারণা এতে একেবারে রোগের মূলে পৌঁছানো যায়। কোন বিষাদগ্রস্ত রোগী যা চায় সে যদি তাই করতে পারে তাহলে সে কার উপর রাগ করবে? নিজের উপর তার প্রতিশোধ নেবারই বা দরকার কী? যদি আপনার থিয়েটার বা ছুটিতে যেতে ইচ্ছে করে তাহলে তাই করবেন এই হল আমার কথা । পথে যদি আবার ইচ্ছে না হয় তাহলে বন্ধ করবেন। এরকম অবস্থায় থাকাই সবচেয়ে মজার। নিজের শ্রেষ্ঠ হওয়ার চেষ্টাকে এটা মিটিয়ে দেয়। এ নিয়মটা চমৎকার আরাম দেয়। এর ফলে আমার রোগীদের মধ্যে একটাও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেনি।
সাধারণত রোগীরা বলে, আমার কিছুই করতে ইচ্ছে করে না। এর উত্তরও আমার ঠিক করা আছে। আমি বলি, তাহলে যা ইচ্ছে হয় না তা করবেন না। কখনও সে হয়তো বলে, আমায় সারাদিন শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। আমি জানি তিনি তা কখনই করবেন না, আবার বাধা দিলে লড়াই শুরু করবেন। আমি তাই সব সময় রাজি হয়ে যাই।
এ হল একটা নিয়ম। অনেকে আবার নিজেদের জীবনযাত্রা প্রণালী নিয়ে সরাসরি আক্রমণ করে। আমি তাদের বলি, আপনারা চৌদ্দ দিনেই রোগ মুক্ত হবেন যদি এই নিয়মটা মেনে চলেন। একেবার ভেবে দেখুন প্রতিদিন অন্তত একজনকে কিভাবে সুখী করতে পারেন। এতে তাদের কি মনে হয় একবার ভাবুন। তাদের মনে ভাবনা জাগে, কাউকে কীভাবে জ্বালাই। এর উত্তরও বেশ মজার। কেউ বলে, এটা আমার কাছে বেশ সহজ। সারা জীবনই এটা করেছি আসলে তারা এটা কখনই করেনি। আমি তাদের ভাবতে বলি। তারা তা করে না। আমি তখন বলি, যখন ঘুম আসবে না তখন ভাববেন অন্যদের কেমন করে খুশি করা যায়, এতে আপনার স্বাস্থ্য ভালো হবে। পরের দিন দেখা হলে বলি, যা বলেছিলাম ভেবে দেখেছেন? তাদের উত্তর হল : গতরাতে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ি। এসবই করতে হয়। ধীরে, কোন রকম শ্রেষ্ঠত্বের ভাব না রেখে।
.
অন্যেরা বলে, আমি কিছুতেই দুশ্চিন্তার জন্য এটা করতে পারিনি। আমি তাদের বলি, দুশ্চিন্তা বন্ধ করবেন না তবে সেই সঙ্গে অন্যদের কথাও ভাববেন। অনেকে এতে বলে, অন্যদের সুখী করব কেন? তারা তো আমাকে সুখী করতে চায় না। আমি বলি প্রথমে তোমার স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করতে হবে অন্যরা পরে জ্বরে ভুগবে। এমন কোন রোগী মেলা সত্যিই ভার যে বলে, আপনি যা বলেছেন তা নিয়ে ভেবেছি। শুধু তাদের সামাজিক বোধ জাগ্রত করতে আমার সমস্ত চেষ্টা কাজে লাগাতে চাই। ধর্মেও আছে সবচেয়ে ভালো কাজ হল তোমার প্রতিবেশীকে ভালোবাসো। যে অন্যদের সম্পর্কে আগ্রহী নয় সে নিজেও কষ্টে পড়ে অন্যকেও কষ্ট দেয়। তাই দরকার সকলের সহযোগিতা করা। মানুষ হিসেবে একজনের কাছে আমাদের দাবি সহযোগিতা, বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার, ভালোবাসায় এবং বিয়েতে যাতে সত্যিকার অংশীদার হয়।
