ধরুন আমরা হতাশ হয়ে যদি ভাবি আমাদের লেবু দিয়ে সরবত বানানোর আশা নেই–তাহলে আমাদের চেষ্টা করা উচিত দুটো কারণে। যে দুটি কারণে আমাদের লাভই হবে, ক্ষতির কিছু নেই।
এক নম্বর কারণ : আমরা সাফল্য পেতে পারি ।
দু নম্বর কারণ : যদি আমরা সফল নাও হই, আমাদের বিয়োগকে যোগে পরিণত করার চেষ্টাই আমাদের সামনে তাকাতে সাহায্য করবে। তাই এটা আমাদের অতীত নিয়ে দুঃখ বা অনুতাপ করতে ব্যস্ত রাখবে না।
পৃথিবীর বিখ্যাত ওলিবুল নামে বেহালাবাদক প্যারীতে তাঁর বাজনা শোনাবার সময় বেহালার একটা তার ছিঁড়ে যায় । কিন্তু ওলিবুল তিনটি তারেই বাজনা শেষ করেন। হ্যাঁরী এমার্সন ফসডিক তাই ঠিকই বলেছেন : এই হল জীবন। বেহালার একটা তার ছিঁড়ে গেলেও তিনটি তারেই বাজবে।
এ শুধু জীবন নয়, এ হল জীবনের চেয়েও বেশি। এ হল বিজয়ী জীবন।
আমার ক্ষমতা থাকলে আমি উইলিয়াম বোলিথের এই কথাটা ব্রোঞ্চে বাঁধিয়ে দেশের প্রতিটি জায়গায় ঝুলিয়ে দিতাম।
জীবনের উদ্দেশ্য কেবল লাভ নিয়ে নয়। যে কোন বোকাই তা পারে। আসল প্রয়োজন ক্ষতি থেকে লাভ করা …।
অতএব সুখ আর সমৃদ্ধি পেতে হলে ৬ নম্বর নিয়ম হল :
ভাগ্য কোন লেবু হাতে দিলে তা দিয়ে সরবত বানান।
১৮. দুই সপ্তাহে মন ভালো করুন
এই বইটা যখন লেখা শুরু করি তখন আমি সবচেয়ে প্রেরণাদায়ক আর উপকারে লাগে এমন সত্যিকার একটা কাহিনীর জন্য দশ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করি। কাহিনীর বিষয় ছিল; কী করে দুশ্চিন্তা দর করেছি।
বিচারক ছিলেন তিনজন নামকরা লোক : ইষ্টার্ণ এয়ার লাইনসের প্রেসিডেন্ট এডি বিকেনব্রেকার, লিঙ্কন মেমোরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ডঃ ম্যাকব্লেল্যাণ্ড আর বেতার বিশেষজ্ঞ ভি ক্যাপ্টেনবর্ণ। যাই হোক আমরা এমন দুটো সত্য কাহিনী পেলাম যে, কোনটা শ্রেষ্ঠ তা বিচার করা অসম্ভব হয়ে পড়ল। শেষ পর্যন্ত পুরস্কার দুজনকে ভাগ করে দেওয় হল। প্রথম পুরস্কার প্রাপ্ত একটি কাহিনী ছিল সি, আর, বার্টনের, যিনি মোটরগাড়ি বিক্রীর প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। কাহিনীটি এই রকম :
আমার ন’বছর বয়সে আমি মাকে হারাই আর বারো বছর বয়সে বাবাকে, মি. বার্টন লেখেন, আমার বাবাব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আর মা শেফ উনিশ বছর আগে বাড়ি থেকে চলে যান,আর কখনও তাকে দেখিনি । আমার ছোট্ট যে বোন দুটিকে তিনি নিয়ে যান তাদেরও আর দেখিনি। সাত বছর কাটার আগে মা কোন চিঠিও পর্যন্ত লেখেন নি। বাবা, মা চলে যাওয়ার তিন বছর পরে দুর্ঘটনায় মারা যান। তিনি তার এক বন্ধুর সঙ্গে মিসৌরীতে একটা কাফে খুলেছিলেন। বাবা ব্যবসার কাজে বাইরে গেলে তাঁর বন্ধু সব বেচে দিয়ে টাকা কড়িসহ পালিয়ে যায়। এক বন্ধুর তার পেয়ে তাড়াহুড়ো করে আসতে গিয়ে গাড়ির র্ঘটনায় বাবার মৃত্যু ঘটে। বাবার তিনজন বৃদ্ধা, রুগ্ন আর গরিব বোন, তিনটে শিশুর ভার নেন। কেউ মামায় আর আমার ছোট ভাইকে রাখল না। আমরা শহরের দয়ায় নির্ভর করে বেঁচে রইলাম । আমাদের অনাথ বলা হবে ভেবে দারুণ ভয় পেতাম। হলও তাই। এক দরিদ্র পরিবারে আমরা থাকতাম, সেই লোকটির চাকরি গেল, ফলে তার পক্ষে আর খাওয়ানো সম্ভব হল না। এরপর মি. আর মিসেস লফটিন এগারো মাইল দূরে তাঁদের খামারে নিয়ে গেলেন। বৃদ্ধ আমায় এক শর্তে নিয়ে যান। তা হল : আমি যতদিন খুশী সেখানে থাকতে পারি, কিন্তু কোনদিন মিথ্যে বলব না। চুরি করব না। যা বলা হবে তাই করব। আমি বর্ণে বর্ণে তা মেনে চলোম। এ আমার কাছে বাইবেলের মত পবিত্র ছিল। এরপর স্কুলে গেলাম আর বাড়ি এসে অঝোরে কাঁদলাম। অন্য ছেলে মেয়েরা আমার নাক দেখে তামাশা করত আর মিচকে অনাথ বলে ক্ষেপাতো। মাঝে মাঝে ওদের সঙ্গে মারামারি করতে ইচ্ছে হত। মিঃ লফটিন একদিন বললেন, মারামারি সবাই করতে পারে। তা না করে ফিরে আসাই সাহসের কাজ। কথাটা মনে রেখ। কিন্তু একদিন একজনকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বেশ পিটলাম। ঐদিন একটি ছেলে মুরগীর নাড়িভুঁড়ি আমার মুখে ছুঁড়ে মেরেছিল তাই তাকে উচিত শিক্ষা দিয়েছিলাম। এর ফলে দু একজনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বও হল ।
একদিন মিসেস লফটিন বললেন, আমি যদি লোকের কাজ করি, উপকার করি তাহলে তারা আর বিরক্ত করবে না বন্ধুত্ব করবে। আমি তাই করতে লাগলাম আর পড়াশুনায় মন দিলাম ফলে পরীক্ষায় প্রথমও হলাম। কেউ আমায় দেখে ঈর্ষা করেনি।
আমি বহু ছেলেকে তাদের লেখাপড়ায় সাহায্য করতাম। আমি বিতর্কের কিছু বিষয় ছেলেদের খাতায় লিখে দিতাম। একটি ছেলে যাকে আমি সাহায্য করতাম সে বাড়িতে তার মাকে একথা বলতে লজ্জাবোধ করতো। সে তার মাকে বলতো পোশম শিকার করতে যাচ্ছে। তারপর আমি একটি ছেলেকে তার বইয়ের সমালোচনা এবং সন্ধ্যায় একটি মেয়েকে অঙ্ক শেখাতাম। অনেকেই তাই আমার কাছে আসত ।
এরপর আমাদের পাড়ায় মৃত্যু হানা দিল। দুই বয়স্ক কৃষক মারা গেল আর এক মহিলার স্বামী তাকে ত্যাগ করে গেল। চারটি পরিবারে আমিই একমাত্র পুরুষ তাই সব দায়িত্ব আমাকেই নিতে হল । আমি তাদের সাহায্য করলাম । কেউ আর আমায় গাল দেয়না সবাই বন্ধু হল । আমি যখন নৌবাহিনী থেকে ফিরলাম দুশরও বেশি লোক আমায় দেখতে এল, তাদের অনেকেই আশি মাইল দূর থেকে এসেছিল। আমার প্রতি তাদের ভালবাসা ছিল অন্তরের। অন্যকে সাহায্য করেছি বলে আমার দুশ্চিন্তা ছিলো না। আমায় গত তেরো বছর কেউ আর অনাথ বলেনি।
