পড়ায় আগ্রহের জন্য তিনি রাজনীতিতে আগ্রহী হলেন, জনসাধারণ সম্পর্কেও আগ্রহী হলেন আর হুইল চেয়ারে বসেই বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন। তিনি জনগণ সম্পর্কে জানতে আরম্ভ করলেন আর জনগণও তাই তাঁকে জানতে চাইল। আর আজ বেন ফর্টসন এখনও হুইল চেয়ারেই আছেন–তিনি জর্জিয়ার সেক্রেটারি অব স্টেট।
গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে নিউইয়র্কে বয়স্ক শিক্ষার ক্লাস নিয়ে আমি আবিষ্কার করেছি যে অনেক বয়স্কর ই ক্ষোভ তারা কলেজী শিক্ষা পাননি। তাঁদের ধারণা কলেজী শিক্ষা না পেলে বিরাট ক্ষতি হয়। আমি জানি এ ধারণা ঠিক নয়, কারণ এমন হাজার হাজার মানুষ আছেন যারা যথেষ্ট উন্নতি করলেও উঁচু স্কুলেরও গন্ডী পার হননি। আমি এমন একজনের কথা জানি যিনি প্রাথমিক স্কুলও পেরোননি এবং চরম দারিদ্রের মধ্যে লালিত হন। তাঁর বাবার মৃত্যুর পরে কবর দেবার জন্য বাবার বন্ধুরা চাদা করে কফিন জোগাড় করেছিলেন। তাঁর মা এক ছাতা তৈরীর কারখানায় কাজ করতেন আর রোজ দশ ঘন্টা ধরে রাত এগারোটা পর্যন্ত কাজ করতেন।
ছেলেটি ওই পরিবেশে মানুষ হয়ে চার্চের ক্লাবে সৌখীন নাটুকে দলে যোগ দেয়। নাটক করতে তার এতই ভাল লাগল যে তিনি বক্তৃতা দানে আগ্রহী হলেন–এর ফলে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি হল। ত্রিশ বছর বয়স হতে তিনি নিউইয়র্কের বিধান সভায় নির্বাচিত হলেন । তিনি আমায় বলেছিলেন, ব্যাপারটা তাঁর বোধগম্যই হতো না। হিসেবের বিল নিয়ে তিনি প্রচুর লেখাপড়া করতেন। কিন্তু সেগুলো পড়ে তার অর্থ বুঝে ওঠা তার পক্ষে খুবই কষ্ট সাধ্য ছিল। কোন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার আগে তিনি নির্বাচিত হলেন স্টেট ব্যাঙ্কিং কমিশনে। অথচ ব্যাঙ্ক সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট ধারণাই এর আগে ছিল না। এসবের জন্যই তিনি রোজ ষোল ঘন্টা পড়াশোনা করে নিজের জ্ঞান বাড়াতে সচেষ্ট হলেন। তিনি বলেছিলেন প্রতি মুহূর্ত তখন আমার এত খারাপ লাগত যে পদত্যাগ করবার কথা প্রায় ঠিক করে ফেলেছিলাম কিন্তু মায়ের কাছে পরাজয় স্বীকার করতে হবে,এই ভেবে তা করতে পারিনি। এই করে তিনি লেবুকে লেমনেডে পরিণত করলেন। এরই ফলে দেশের চারদিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়লো, তিনি হয়ে উঠলেন একজন জাতীয় বীরের মত । নিউইয়র্ক টাইমস তাকে নিউইয়র্কের সবচেয়ে প্রিয় নাগরিক আখ্যা দেয়।
আমি অল স্মিথ সম্বন্ধে বলছি।
দশ বছর ধরে অল স্মিথ রাজনীতির আত্ম–শিক্ষা নেবার পর নিউ ইয়র্কের সবসেরা সরকারী বিশেষজ্ঞ হয়ে পড়েন। তিনি চারবার নিউইয়র্কের গভর্ণর হন এ একটা রেকর্ড। ১৯২৮ সালে তিনি ডেমোক্র্যাটিক দলের হয়ে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হন। কলম্বিয়া এবং হার্ভার্ডসহ ছটি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানীয় ডক্টরেট ডিগ্রী দেয়, অথচ যিনি কোনদিন স্কুলের গন্ডী পার হননি।
অল স্মিথ আমাকে বলেছিলেন, তিনি যদি রোজ ষোল ঘন্টা খেটে তাঁর বিয়োগকে যোগে পরিণত না করতেন তাহলে কিছুই ঘটত না।
শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে নীটশের মত হল যে, কেবল অভাবকে সহ্য করা নয় তাকে ভালবাসারও ক্ষমতা থাকা চাই।
বিখ্যাত কৃতি মানুষদের জীবনী পড়ে আমি এটাই বুঝেছি যে যারা জীবনে বাধা পেয়েছেন ততই তারা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন সে বাধা কাটিয়ে জীবনে উন্নতি করতে। উইলিয়াম জেম্স যেমন বলেছিরেন : আমাদের অক্ষমতাই আমাদের অভাবিতভাবে সাহায্য করে।
হ্যাঁ, এটা খুবই সম্ভব। কারণ হয়তো মিলটন অন্ধ হয়ে যান বলেই উচ্চশ্রেণীর কাব্য রচনা করেছিলেন আর বিঠোফেন বধির ছিলেন বলেই এতো ভালো সঙ্গীত রচনা করতে পেরেছিলেন।
হেলেন কেলারের অন্ধত্ব আর বধিরতুই তাকে এত উন্নতিতে সাহায্য করে। চেইকোভস্কি যদি হতাশ না হতেন যদি না তার জীবন করুণ বিবাহের জন্য নষ্ট না হত তা হলে কখনই তিনি করুণ সিম্ফনি সৃষ্টি করতে পারতেন না।
ডস্টয়ভস্কি আর টলস্টয় জীবন যন্ত্রণা ভোগ না করলে কখনই তাঁদের অমর উপন্যাস রচনা করতে পারতেন না।
পৃথিবীতে জীবনধারার বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক প্রবক্তা বলেছিলেন–আমি যদিও ওই রকম পঙ্গু না হতাম, তাহলে যা করেছি তত কাজ করতে পারতাম না। এ হল চার্লস ডারউইনের স্বীকারোক্তি । তার মশক্ততাই আশ্চর্যজনকভাবে তাকে ওই কাজে উদ্বুদ্ধ করে।
যেদিন চার্লস ডারউইন ইংল্যান্ডে জন্ম নেন ঠিক তখনই আমেরিকার কেনটাকীতে এক কাঠের কেবিনে এক শিশু জন্ম নেয়। তার অক্ষমতাও তাকে সহায়তা করেছিল। তিনি হলেন লিঙ্কন–আব্রাহাম লিঙ্কন। ইনি যদি অভিজাত বংশে জন্ম নিয়ে হার্ভার্ডে শিক্ষা নিয়ে আইন পাশ করে সুখী বিবাহিত জীবন যাপন করতেন, তাহলে গেটিসবার্গে তিনি যে চমৎকার বক্তৃতা দেন তা তিনি দিতে পারতেন না, বা তার দ্বিতীয় অভিষেকের সময় যে আশ্চর্য কবিতা উচ্চারণ করেন তা করতে পারতেন না। যা ছিল কোন শাসকের শ্রেষ্ঠ উক্তি : কারও প্রতি নাহি মোর ঘৃণা, শুধু আছে দয়া আর স্নেহ …।
হ্যারী এমার্সন ফসডিক তাঁর পাওয়ার টু সী ইট থ্র, গ্রন্থে বলেছেন একটি স্ক্যান্ডীনেভীয় প্রবচন আছে যেটা আমাদের জীবন সঙ্কেত হতে পারে! উত্তুরে হাওয়া ভাইকিংদের সৃষ্টি করেছে। কথাটার অর্থ হল কোথায় কবে শোনা গেছে আরাম আর নিশ্চিন্ত মানুষকে সুখী আর ভালো করতে পেরেছে? ঠিক এর উল্টোটাই যে সব লোক সহজে সন্তুষ্ট হয় না। তারা নরম গদীতে শুয়েও খুঁতখুঁতে করে । ইতিহাসেও দেখা যায় লোকেরা চরিত্রবান হয়েছে, সুখী হয়েছে তখনই তারা নিজের দায়িত্ব নিতে পেরেছে। উত্তুরে হাওয়াই তাই বারবার ভাইকিংদের সৃষ্টি করেছে।
