আমি স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলাম, তাদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে অবাক হয়ে গেলাম। আমি তাদের বোনা আর মৃৎশিল্পে আগ্রহ দেখানোয় তারা তাদের প্রিয় জিনিসগুলো আমাকে উপহার দিয়ে দিলো, এগুলোই তারা টুরিষ্টদের কাছে বিক্রি করেনি। আমি ক্যাকটাস, ইয়ুক্কাস আর যোশুবা গাছের শোভা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমি প্রেইরী কুকুরদের বিষয় জানলাম, মরুভূমির সূর্যাস্ত একদৃষ্টে লক্ষ্য করতাম আর সমুদ্রের ঝিনুক কুড়োতাম। এ মরুভূমি লক্ষকোটি বছর আগে সমুদ্রের তলায় ছিল।
আমার মধ্যে এমন পরিবর্তনের কারণ কি? মোজাভে মরুভূমি তো বদলে যায়নি । রেড ইণ্ডিয়ানরাও বদলায়নি,কিন্তু আমি বদলে গেছি। আমার মনের ভাব বদল ঘটেছে। আর এর সাহায্যেই আমার যন্ত্রণা কাতর মন বদলে যায় জীবনের এক শ্রেষ্ঠ অ্যাডভেঞ্চারে, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে। এই নতুন জগত আবিষ্কার করে আমার মধ্যে নতুন এক উত্তেজনার জন্ম হল। এতই উত্তেজনা জাগল যে একটা বই লিখে ফেলোম–একটা উপন্যাস। বইটি ছাপা হল ব্রাইট র্যাম্পার্টস নামে …আমি জেলের জানালা দিয়ে কাদার বদলে তারা খুঁজে পেলাম।
খেলমা টমসন আপনি যা আবিষ্কার করেন সেটা গ্রীকরা যীশুখ্রীষ্টের জন্মের পাঁচশ বছর আগেই আবিষ্কার করে : সবচেয়ে ভালো জিনিসই সবচেয়ে কঠিন।
হ্যারী এমার্সন ফসডিক এটারই পুনরাবৃত্তি করেন বিংশ শতাব্দীতে : সুখ শুধু আনন্দের নয়; এ হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জয়লাভ। হ্যাঁ, সে জয় আসে কোন কিছু চেষ্টা করে পাওয়ায়। লেবুকে সরবতে পরিণত করার মধ্য দিয়ে এ রকম আনন্দ হয়।
আমি একবার ফ্লোরিডার একজন সুখী খামার মালিকের সঙ্গে দেখা করি, লোকটি বিষময় লেবুকে সরবতে পরিণত করে। প্রথম যখন সে খামারটা পায় তার ভাল লাগেনি। জমিটা এতই খারাপ ছিল যে তাতে ফলচাষ দূরের কথা শূকর পালনও করতে পারত না। জমিটায় কেবল ছিল র্যাটল সাপ আর ঝোঁপের মধ্যে ছিল ওক গাছ । তারপরেই তার মাথায় একটা মতলব গজালো। সে তার খামারকে লাভজনক করে তুলবে–এই সব র্যাটল সাপ নিয়েই কাজ শুরু করবে। সকলে অবাক হলো, সে তখন র্যাটল সাপের মাংস টিন বোঝাই করে চালান আরম্ভ করল। ক বছর আগে ওর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখলাম যে তার র্যাটল সাপ দেখতে বছরে কুড়ি হাজার লোক ভিড় জমাচ্ছে। ওর ব্যবসা ফুলে উঠেছে। দেখলাম তার খামারে গবেষণাগারের জন্য র্যাটল সাপের বিষ বের করা হচ্ছে, সাপের চামড়া প্রচুর দামে বিক্রি হচ্ছে মেয়েদের জুতো আর ব্যাগ তৈরির জন্য। দেখলাম সারা বিশ্বে বোতলভরা সাপের মাংস চালান যাচ্ছে । আমি এখানকার একটা ছবিওয়ালা কার্ড কিনে ডাকঘর থেকে পাঠিয়ে দিলাম। ডাকঘরের নাম এখন বদলে রাখা হয়েছে র্যাটল সাপ ডাকঘর, ফ্লোরিডা। এটা করা হয়েছে এমন একজন লোককে সম্মান জানাতে, যে বিষাক্ত লেবুকে মিষ্টি সরবতে পরিণত করেছে।
আমি এই দেশটা জুড়ে বহুবার ঘুরেছি। তখন আমি দেখেছি অসংখ্য স্ত্রী–পুরুষ কিভাবে বিয়োগকে যোগে পরিণত করেছেন, অর্থাৎ ক্ষতি থেকে লাভ করেছেন।
ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বারোজন’ গ্রন্থের লেখক উইলিয়াম বলিথো কথাটা এইভাবে বলেছেন : জীবনে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় হলো লাভের উপর নির্ভর না করা। যে কোন বোকাই এটা পারে। সবচেয়ে জরুরি হলো ক্ষতি থেকে লাভ করা। এর জন্য চাই বুদ্ধি–এতেই একজন কেরানি আর বোকার তফাতটুকু বোঝা যায়।
বলিথো কথাটা বলেছিলেন এক দুর্ঘটনায় একটা পা হারানোর পর। কিন্তু আমি একজনকে জানি যিনি দুটো পা হারিয়ে বিয়োগকে যোগে পরিণত করেন। ভদ্রলোকের নাম বেন ফর্মটন। তাঁর সঙ্গে আমার জর্জিয়ার আটলান্টায় দেখা হয়। এলিভেটরে উঠতেই হাসিখুশি দু–পা হারানো লোকটিকে দেখি। তিনি সেখানে একটা হুইল চেয়ারে বসেছিলেন। এলিভেটর থামতেই তিনি নম্রভাবে জানতে চাইলেন আমি একটু পাশে সরে যাবো কিনা যাতে চেয়ারটা নিয়ে যেতে পারেন। আপনার অসুবিধা করার জন্য মাপ চাইছি, ভদ্রলোক হৃদয় গলানো হাসি হেসে বললেন।
আমি এলিভেটর ছেড়ে নিজের ঘরে এসে ওই হাসিখুশি মানুষটির কথা ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত ভদ্রলোককে খুঁজে বের করে তাঁর জীবনের কাহিনী বলতে অনুরোধ করলাম।
ভদ্রলোক একটু হেসে বললেন, এটা ঘটে ১৯২৯ সালে । আমি একরাশ বাদাম কাঠ কেটে ফোর্ড গাড়িতে করে আসছিলাম। আচমকা মোড় ফেরার সময় একটা কাঠ সামনে এসে পড়ল। গাড়িখানা সঙ্গে সঙ্গে সোজা সামনে হড়কে গিয়ে একটা গাছে ধাক্কা খায় । আমার মেরুদণ্ডে আঘাত লাগে আর পা দুটো অসাড় হয়ে যায়।
এটা যখন ঘটে তখন আমার বয়স চব্বিশ আর তারপর একপাও আমি হাঁটতে পারিনি।
চব্বিশ বছরে বিকলাঙ্গ সারা জীবনেরই জন্য। আমি ভদ্রলোককে প্রশ্ন করেছিলাম এত সাহসের সঙ্গে ব্যাপারটা তিনি কিভাবে নিলেন। তিনি বললেন, আমি নিইনি। তিনি বলেন, প্রথমত রাগে দুঃখে ফেটে পড়েন তিনি, বিদ্রোহ করেন। কিন্তু সময় কেটে চললে তিনি বুঝেছিলেন ঐ বিদ্রোহে কোন লাভ হবে না শুধু তিক্ততাই বাড়বে। তাছাড়া তিনি আরও বলেছিলেন, আমি বুঝলাম লোকেরা যখন আমার প্রতি ভদ্র ব্যবহার করে, তখন আমিও তাদের প্রতি ভদ্র হব।
আমি তাকে প্রশ্ন করলাম এত বছর পরে তার কি মনে হয় না তার পা হারানো দুর্ভাগ্যের কারণ।, তিনি বলেন, ঘটনাটা যে ঘটেছিল তার জন্য আমি খুশি। তিনি আমাকে জানান প্রাথমিক আঘাত আর শোক কাটিয়ে ওঠার পর তিনি এক নতুন জীবন কাটাতে আরম্ভ করেন। ভাল সাহিত্যে তার আগ্রহ জাগল। চোদ্দ বছরে তিনি প্রায় চোদ্দশ বই পড়ে ফেলেন আর ওই সব বই তাঁর জীবনকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেয় এবং মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে। তিনি ভাল সঙ্গীতে আকৃষ্ট হন আর সিম্ফনি আগ্রহের সঙ্গে শুনতে আরম্ভ করেন, অথচ আগে যা তাকে বিরক্ত করত। সবচেয়ে বড় জিনিস হল তিনি চিন্তা করার প্রচুর সময় পেলেন। এই প্রথম তিনি পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে জীবন সম্বন্ধে অবহিত হলেন। তিনি বুঝলেন আগে যে সব জিনিসে আগ্রহ প্রকাশ করতেন তার কোনই দাম নেই।
