মেরী মার্গারেট ম্যাকব্রাইড যখন প্রথম বেতারে যোগ দেন তিনি এক আইরিশ কমেডিয়ান হতে চেয়ে ব্যর্থ হন। তারপর যখন তিনি নিজে যা অর্থাৎ মিসৌরীর এক সাধারণ গ্রাম্য মেয়ে বলে পরিচিতি রাখেন–তিনি হয়ে ওঠেন নিউইয়র্কের অন্যতম জনপ্রিয় এক বেতার শিল্পী।
জিন অট্রি তার টেক্সাস কথার ভঙ্গী পাল্টানোর জন্য চেষ্টা করে শহরে ছেলের মত পোশাকও পরতে শুরু করে। সে দাবী করতে আরম্ভ করেছিলো যে নিউইয়র্ক থেকেই এসেছে। ব্যাপারটা দেখে সবাই আড়ালে হাসাহাসি করতে শুরু করে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিন অট্রি তার ব্যাঞ্জো বাজিয়ে কাউবয়দের গান গাইতে আরম্ভ করার পরেই সে হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র আর বেতারে অত্যন্ত জনপ্রিয় এক কাউবয়।
আপনি এবং এ দুনিয়া একটা নতুন কিছুই । এটা ভেবেই খুশী হয়ে উঠুন আর প্রকৃতি যা আপনাকে দিয়েছে তাই যতটা পারেন কাজে লাগান। বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় সমস্ত শিল্প কর্মই আত্মজীবনী মূলক। আপনার নিজের মতই আপনি গাইতে পারেন আর নিজের মত আঁকতে পারেন। আপনাকে হতে হবে আপনার অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিকতা আর বংশধারা আপনাকে যা দিয়েছে। খারাপই হোক আর ভালোই হোক আপনার নিজের বাগানের পরিচর্যা আপনাকেই করতে হবে। ভালো বা মন্দ যাই হোক আপনার জীবনের সঙ্গীত ব্যঞ্জনা আপনাকেই বাজিতে যেতে হবে ।
এমার্সন তার ‘আত্ম–নির্ভরতা’ নামের প্রবন্ধে যেমন লিখেছিলেন : প্রত্যেক মানুষের শিক্ষাজীবনে একটা সময় আসে যখন তার বোধ জাগে, ঈর্ষা হলো অজ্ঞতা, নকল করা হলো আত্মহত্যা আর কে ভালো বা মন্দ হোক এ শিক্ষা গ্রহণ করতেই হবে। সমস্ত পৃথিবী যদিও উদারতায় ভরা তবুও গড়ে ওঠার জন্য যে শস্যের প্রয়োজন সেই শস্যের জন্য পরিশ্রম করা চাইই, চাই চাষ করা । তার মধ্যে মসলা আছে তা প্রকতিতে নতুন আর সে নিজে জানতে না চাইলে বা চেষ্টা না করলে সেও সেটা বুঝতে পারবে না।
এমার্সন এই ভাবেই তার কথা বলে গেছেন। এছাড়াও ঠিক এমন কথাই আবার কবিতায় লিপিবদ্ধ করে গেছেন কবি ডগলাস ম্যালচ।
তাঁর কবিতার মূল কথা হল এই রকম :
তুমি যদি পাহাড়ের বুকে দেবদারু না হতে পারো,
তবে হয়ে উঠো উপত্যকায় কোন ঝোপ।
তুমি ঝোপও যদি না হতে পারো,
তবে হয়ে উঠো এক মুঠো ঘাস।
যদি দলপতি না হতে পারো।
হয়ে উঠো কিছু সেনা।
যদি রাজপথ না হতে পারো।
হতে চেও কোন সরু পথ।
আসলে মূল কথাটি হলো আমাদের সকলেরই নিজের মত কিছু করার রয়েছে সেটাকেই কাজে লাগানো চাই।
আমাদের মনকে তৈরি করে চিন্তাভাবনা ছেড়ে শান্তির পথ আবিষ্কার করতে হলে এই নিয়মটা মেনে চলা চাই :
অন্যকে নকল করবেন না। নিজেদের আবিষ্কার করে আসুন নিজেদের মতই হয়ে উঠি।
১৭. লেবু থাকলে সরবৎ তৈরি করুন
এই বইটি লেখার সময় একদিন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর রবার্ট মেনার্ড হাচিস এর কাছে জানতে চেয়েছিলাম তিনি কিভাবে দুশ্চিন্তা দূর করেন। তিনি বলেছিলেন, আমি সব সময় প্রয়াত জুলিয়াস রোজেন ওয়ালডের উপদেশ মেনে চলি । তিনি ছিলেন একটি কোম্পানীর প্রেসিডেন্ট । তার উপদেশ হলো : তোমার কাছে লেবু থাকলে সরবৎ তৈরি করো।
একজন বড় শিক্ষাবিদ এই রকমই করেন। আর মুখরা করে ঠিক তার উল্টো। সে যদি দেখে ভাগ্য তার হাতে একটা লেবু দিয়েছে তাতে সে হতাশায় বলে আমি হেরে গেলাম। আমার ভাগ্যই খারাপ আশা নেই। এরপর সে সারা পৃথিবীকে ঘৃণা করে নিজেকে করুণা করতে আরম্ভ করে। কিন্তু কোন বুদ্ধিমান কেউ ওই লেবু পেলে বলবে : এই দুর্ভাগ্য থেকে কি শিক্ষা নেব? কিভাবে অবস্থাটা বদলানো যায় । কি করে লেবুটাকে সরবৎ বানাতে পারবো।
বিখ্যাত মনস্তত্ববিদ অ্যালফ্রেড অ্যাডলার সারা জীবন ধরে মানুষ আর তাদের অন্তরের শক্তি সম্বন্ধে গবেষণা করে বলেন, মানুষের আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য হলো তারা বিয়োগকে যোগে রূপান্তরিত করতে পারে।
এবার আমার পরিচিত এক মহিলার কৌতূহলোদ্দীপক গল্প শোনাই, তিনি ঠিক তাই করেছিলেন । ভদ্রমহিলার নাম খেলমা টমসন থাকেন নিউইয়র্কে। তিনি বলেছেন যুদ্ধের সময় আমার স্বামী ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ায় মোজাভে মরুভূমিতে এক শিক্ষণ শিবিরে । আমি তার কাছাকাছি থাকবো বলে যাই। জায়গাটা আমার দারুণ খারাপ লাগে। জীবনে এত খারাপ আগে কখনও লাগেনি। স্বামী যখন শিক্ষার জন্য চলে যেতেন আমি একা পড়ে থাকতাম। অসহ্য গরম–প্রায় ১২৫ ডিগ্রী তাপে ফণিমনসার ঝোঁপের আড়ালে বসে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না। কথা বলার কেউ নেই, শুধু মেক্সিকান আর ইণ্ডিয়ান ছাড়া, আর তারাও একবর্ণ ইংরাজী জানেনা। সারাক্ষণ বাতাস বইছে আর শ্বাস টানলেই শুধু বালি আর বালি।
এমন দুরবস্থায় পড়েছিলাম যে নিজের জন্যই কষ্ট হত। তাই বাবা মাকে চিঠি লিখলাম। তাতে লিখলাম আমার আর একমুহূর্তও সহ্য হচ্ছে না বরং এর চেয়ে জেলে থাকাই ভালো। আমার বাবা উত্তরে দুটো মাত্র লাইন লিখেছিলেন–সেই দুটো লাইন সারা জীবন আমার মনে থাকবে–দুটো লাইন আমার জীবন যাত্রা বদলে দেয় :
দুজন মানুষ কারাগারের জানালা দিয়ে তাকিয়েছিল,
একজনের চোখে পড়ত কাদা, অন্যজন দেখত তারা।
বারবার লাইন দুটো পড়লাম। নিজের ব্যবহারে আমার লজ্জা হলো। আমি ঠিক করে ফেলোম আমার এই অবস্থায় যা ভালো তাই খুঁজে নেব। আমি আকাশের তারা দেখব।
