আমি এই আপনার নিজের মত হয়ে ওঠা নিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলে যেতে পারি কারণ এ ব্যাপারে আমার আগ্রহ অপরিসীম। কি নিয়ে কথা বলছি আমি বেশ ভালোই জানি। এটা আমি লাভ করেছি বেশ তিক্ত আর ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। উদাহরণ হিসেবে বলছি : আমি যখন প্রথম মিসৌরীর শস্যক্ষেত্রে থেকে নিউইয়র্কে আসি, তখন আমেরিকান অ্যাকাডেমী অব ড্রামাটিক আর্টসে আমি ভর্তি হই। আমার ইচ্ছে ছিলো অভিনেতা হওয়া। ব্যাপারটা আমার মনে হয়েছিলো দারুণ একটা কিছু আবিষ্কার করেছি। এটা আমার কাছে সাফল্যের সহজ পথ বলেই মনে হয়েছিলো–কেমন সহজ সরল ব্যাপার। আমি বুঝতেই পারিনি এমন একটা পথ উচ্চাকাঙ্ক্ষী হাজার হাজার মানুষ কেন আগেই আবিষ্কার করতে পারেনি। ব্যাপারটা এই রকম : আমার কাজ হবে সেকালের সব বিখ্যাত অভিনেতা কেমন করে কাজ করতেন সেটা শেখা–যেমন জন ডু, ওয়াল্টার হ্যাঁম্পডেন আরও অনেকে কেমন করে খ্যাতির শিখরে ওঠেন। এরপর আমি তাঁদের প্রত্যেকের সেরা ব্যাপারগুলো নকল করবো আর তার ফলে তাদের সকলের কৃতিত্ব জড়িয়ে আমি হয়ে উঠবে দারুণ খ্যাতিমান দক্ষ শিল্পী । কিন্তু কি বোকার মত ধারণা! কতখানি অবাস্তব, অসম্ভব! অন্য সব লোককে নকল করতে গিয়ে এইভাবে আমার জীবনে বেশ মূল্যবান কটা বছর আমি নষ্ট করে বসলাম । মিসৌরী এলাকায় আমার মোটা মাথায় এটা ঢুকলোনা, আমায়–আমার মতই হতে হবে, আর পক্ষে অন্য কেউ হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।
ওই দুঃখজনক অভিজ্ঞতা থেকে আমার চিরকালীন একটা শিক্ষা হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু তা হলো । অন্ততঃ আমার ক্ষেত্রে হলো না। আমি নেহাতই আকাট ছিলাম। আমাকে আবার গোড়া থেকেই শিখতে হলো। বেশ ক’বছর পরে আমি ব্যবসাদারদের জন্য একখানা বক্তৃতা দেওয়ার বই লিখতে আরম্ভ করেছিলাম, আমি ভেবেছিলাম এমন বই আগে আর কেউ লেখেন নি যাতে সব থাকবে। বইটা লেখার সময় আমার সেই আগেকার বোকার মত ধারণা ছিলো, সেই অভিনেতা হওয়ার ধারণা–আমি এমন বই লিখতে চাইছি, যে সব ধারণা আগে বহু লেখকই তাদের বইতে লিখে গেছেন। অতএব আমি কি করলাম? আমি বেশ কিছু বই জোগাড় করে ফেলোম জনগণের সামনে বক্তৃতা দেওয়ার উপর লেখা, তারপর একবছর ধরে সব কিছু আমার বইয়ের পাণ্ডুলিপিতে লিপিবদ্ধ করলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার মাথায় জাগলো আমি আবার সেই বোকার মত কাজ করতে চলেছি। অন্য সব মানুষের ধারণা মেশানো আমার লেখাটা এমনই একটা খিচুড়ির মত ব্যাপার আর সেটা এমনই মূল্যহীন, নীরস যে কোন ব্যবসাদার মানুষ তাতে চোখ বোলাতেও চাইবেন না। অতএব আমি সব কিছু বাজে কাগজের ঝুড়িতেই ফেলে দিয়ে আবার গোড়া থেকে শুরু করলাম। এবারে নিজেই নিজেকে বললাম : তোমাকে ডেল কার্নেগী হতে হবে, তার সব ত্রুটি আর যত কম ক্ষমতাই থাকনা কেন । তুমি সম্ভবতঃ অন্য কেউ হয়ে উঠতে পারবে না। অতএব আমি অন্য কারো মিশেল না হতে চেয়ে জামার হাতা গুটিয়ে প্রথমেই যা করা উচিত ছিলো তাই করতে লেগে গেলাম।
.
আমার নিজের দেখা অভিজ্ঞতা, দেখাশোনা আর বক্তৃতা এবং বক্তৃতা শিক্ষক হিসেবে যে ধারণা আর অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল তাই সম্বল করেই একটা বই লিখতে আরম্ভ করলাম । আমি সারা জীবন ধরে যা শিখলাম–আমার মনে হয় স্যার ওয়াল্টার র্যালে যা শিখেছিলেন তাই। (আমি অবশ্য সেই ওয়াল্টার র্যালের কথা বলছি না যিনি রাণীর যেতে সুবিধে হবে বলে নিজের কোট কাদায় বিছিয়ে দেন। আমি বলছি ১৯০৪ সালের কাছাকাছি অক্সফোর্ডের ইংরাজী সাহিত্যের অধ্যাপক স্যার ওয়াল্টার র্যালের কথা ।) তিনি, বলেছিলেন, শেক্সপিয়ারের মত কোন বই আমি লিখতে পারি না তবে আমি নিজের যোগ্য বই লিখতে পারি।
নিজের মত হোন। প্রয়াত জর্জ গার্সউইনকে আরভিং বার্লিন যে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছিলেন সেই ভাবেই কাজ করুন। বার্লিন আর গার্স উইনের যখন প্রথম দেখা হয়, তখন আরভিং বার্লিন বিরাট খ্যাতিমান মানুষ আর গার্স উইন জীবন সংগ্রামরত টিন প্যানআলীতে সপ্তাহে মাত্র পঁয়ত্রিশ ডলার উপার্জনকারী এক তরুণ গীতিকার । বার্লিন গার্স উইনের দক্ষতা লক্ষ্য করে তাঁকে তাঁর সঙ্গীত সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার জন্য প্রায় ওর তখনকার মাইনের তিন গুণ বেশী দিতে চাইলেন। তাসত্বেও বার্লিন ওকে উপদেশ দিয়ে বললেন, তুমি কাজটা নিওনা। যদি এটা নাও, তুমি হয়ত দ্বিতীয় শ্রেণীর এক বালিন হয়ে উঠবে । কিন্তু তুমি যদি নিজের মত হছে চাও তাহলে তুমি কোনদিন হয়তো প্রথম শ্রেণীর গার্স উইন হতে পারবে।
গার্স উইন ওই সতর্কতার কথা মেনে নিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে সে সময়কার একজন বিখ্যাত আমেরিকান সঙ্গীত রচয়িতা করে গড়ে তুলেছিলো।
চার্লি চ্যাপলিন, উইল রোজার্স, মেরী মার্গারেট ম্যাকব্রাইড, জিন অট্রি আর এই রকম লক্ষ লক্ষ মানুষকে আমি এই পরিচ্ছেদে যে শিক্ষা আপনাদের মাথায় ঢোকাতে চাইছি, ঠিক সেইভাবেই শিখতে হয়েছিলো। তাদের সকলকেই কঠিন পথে সব শিখতে হয়–যেভাবে আমাকেও হয়।
চার্লি চ্যাপলিন যখন প্রথম ছবি বানাতে আরম্ভ করেন, ছবির পরিচালক তাঁকে সে যুগের একজন বিখ্যাত জার্মান হাস্যরসিককে নকল করার কথা বলেন। নিজের মত অভিনয় না করা পর্যন্ত চ্যাপলিন প্রায় দাঁড়াতেই পারেন নি। বব হোপের একই রকম অভিজ্ঞতা হয়–তিনি বহুবছর নাচগানের অভিনয় করেও কোথাও পৌঁছতে পারেন নিশেষ পর্যন্ত সব ঝেড়ে ফেলে নিজের মত হয়ে ওঠার পরেই তার খ্যাতি আসে। উইল রোজার্সেরও অভিজ্ঞতা একই রকম–বহুবছর ঘসার পরেই তাঁর আত্মদর্শন ঘটে, তিনি বোঝেন তার মধ্যে অদ্ভুত হাস্যরসের ভাণ্ডার রয়েছে।
