আমরা যদি দুশ্চিন্তা ত্যাগ করে জীবনকে উপভোগ করতে চাই, তাহলে এই নিয়মটাই মেনে চলা উচিত :
জীবনে যা পেয়েছেন তারই হিসেব করুন, যা পাননি তার নয়।
১৬. নিজেকে আবিষ্কার করুন : আপনার মত আর কেউ নেই
আমি নর্থ ক্যারোলিনার মাউন্ট এয়ারির মিসেস এডিথ আলরেডের কাছ থেকে একখানা চিঠি পাই। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন : ছোট বয়সে আমি অত্যন্ত স্পর্শকাতর আর লাজুক ছিলাম। বয়সের তুলনায় আমার ওজন বড় বেশি ছিলো আর আমার ফোলা গাল দুটোর জন্য আমাকে আরও মোটা দেখাতো। আমার মা ছিলেন একেবারে সেকেলে ধরনের, তার ধারণা ছিলো সুন্দর পোশাক বানানো হলো বোকামি । তিনি সব সময় বলতেন ঢিলে ঢালা পোশাক টেকে বেশি, আটো পোশাক ছেড়ে তাড়াতাড়ি। সেই ভেবেই তিনি আমায় পোশাক পরাতেন। আমি কোনদিন কোন অনুষ্ঠানে যোগ দিতাম না, কোন আনন্দও করতাম না। তাছাড়া যখন স্কুলে যেতাম অন্য সব ছেলে মেয়েদের সঙ্গে কোন ব্যাপারে যোগ দিতাম না।
এমন কি খেলাধুলোতেও না। আমি অস্বাভাবিক রকম লাজুক ছিলাম। আমার খালি মনে হতো আমি বাকি সবাইয়ের চেয়ে আলাদা আর আমাকে কেউই চায় না।
আমি যখন বড় হলাম তখন আমার চেয়ে বেশ কয়েক বছরের বড় একজনকে বিয়ে করলাম। কিন্তু আমার কোন রকম পরিবর্তন হলো না। আমার শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়–স্বজনেরা সবাই বেশ ফিটফাট আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ছিলো। তাদের মনোগত ইচ্ছে ছিলো আমিও তাদের মত হই, কিন্তু কিছুতেই তা আর হলো না। আমি আপ্রাণ চেষ্টায়, তাদের মত হতে চাইলেও পারলাম না। তারা যতই আমাকে খোলসের মধ্য থেকে বাহিরে টেনে আনার চেষ্টা চালালো আমি ততই যেন আরও বেশী করে খোলসের মধ্যে ঢুকে গেলাম । এতে আমি বেশ অস্বস্তি আর বিরক্তিও বোধ করতে আরম্ভ করলাম। সব বন্ধু বান্ধবদের এড়িয়ে চলতেও শুরু করলাম আমি। এমনই অবস্থাটা খারাপ হয়ে দাঁড়ালো যে দরজার ঘন্টা বাজার শব্দ শুনতে পেয়েও আমি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতাম! আমি বুঝতে পারতাম আমি সবদিক দিয়েই একদম ব্যর্থ। আমি এটা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারতাম আর আমার খালি ভয় হতো আমার স্বামী সব একদিন টের পেয়ে যাবেন। তাই যখনই আমরা বাইরে বেরোতাম, আমি হাসিখুশি থাকতে চেষ্টা করতাম এবং তাতে ভয়ে বেশ একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলতাম। আমি বুঝতে পারতাম এই বাড়াবাড়িটা, এবং এরপর কয়েকদিন বেশ মনমরা অবস্থায় কষ্টে কাটাতাম। শেষ পর্যন্ত আমি এমনই অসুখী হয়ে উঠলাম যে মনে হতো আর আমার বেঁচে থাকারই বোধহয় কোন যুক্তি নেই। আমি আত্মহত্যা করার কথা ভাবতে শুরু করলাম।
এই অসুখী মহিলার জীবনধারা কেমন করে কিভাবে বদলে গেলো জানেন? আচমকা বলা একটা মন্তব্যের মধ্য দিয়ে।
আচমকা বলা একটা মন্তব্যই মিসেস আলরেড তাঁর চিঠিতে লেখেন, আমার সমস্ত জীবনটাই বদলে দিলো। আমার শাশুড়ি একদিন বলেছিলেন কিভাবে তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের মানুষ করে তোলেন। তিনি বললেন, যাই ঘটুক না কেন আমি সব সময়েই তাদের নিজের মত চলতে দিতাম…নিজের মত চলতে দিতাম…এই মন্তব্যটাই সব কিছুই ওলোট পালোট করে দিলো। একটা বিদ্যুতের পরশেই যেন আমি বুঝতে পারলাম, যে অবস্থার সঙ্গে আমার খাপ খায় না আমি তার মধ্যেই কেবল আমায় মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছি।
.
রাতারাতিই আমি পালটে গেলাম। আমি নিজেকে ফিরে পেয়ে নিজের মতই হতে শুরু করলাম। আমি আমার নিজের ব্যক্তিত্ব পর্যালোচনা করতেও শুরু করে দিলাম এবং কি ছিলাম সেটা জানতে চেষ্টা করতে লাগলাম। আমি আমার দোষ গুণ সম্পর্কে কি আছে বারবার সেটা জানার চেষ্টা করলাম। আমি রঙ আর পোশাকের কায়দা কানুন পর্যালোচনা করে আমায় যা মানায় সেই পোশাক পরতে শুরুও করে। দিলাম। এরপর বন্ধুত্ব লাভের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম। একটা প্রতিষ্ঠানে আমি যোগদানও করলাম–প্রথমে এক ছোট প্রতিষ্ঠানে–সেখানে আমি ভয়ে প্রায় সিঁটিয়েও গেলাম, যখন দেখলাম তারা আমাকে একটা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার ব্যবস্থা করলো। কিন্তু প্রতিবার কথাবলার পর থেকেই একট একটু করে আমার সাহস বেড়ে গেলো। এসবে বেশ সময় লেগেছে সেটা ঠিক–তবে আজ আমি যে রকম সুখী তা কোন কালে সম্ভবপর বলে স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। আমার নিজের ছেলেমেয়েদের মানম করে তোলার কাজে আমি বিশেষ ভাবেই তাদের এটাই শিখিয়েছি। যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার জীবনে ভোগ করতে হয়েছে, আর আমি যে শিক্ষাটি লাভ করেছি তাহলো : যাই ঘটুক না কেন সব সময় নিজের মত হও।
নিজের মত হওয়ার ইচ্ছের এই সমস্যা প্রায় ইতিহাসের মতই পুরনো, কথাটা বলেন ডঃ জেমস গর্ডন গিলকি । তার আরও বক্তব্য হলো, এ ব্যাপারটা আবার মানুষের জীবনের মতই সার্বজনীনও বটে। নিজের মত না হওয়ার এই সমস্যাটা বহু জটিলতা, মনোবিকলন আর মানসিক অশান্তির আড়ালে থেকে গেছে। এঞ্জেলে পাদ্রি শিশুদের শিক্ষাদানের ব্যাপারে তেরো খানি বই আর হাজার হাজার সাময়িক খবরের কাগজে প্রবন্ধও লিখেছেন। তাঁর কথা হলো : যারা অন্যের মত হওয়ার চেষ্টা করে তাদের মত হতভাগ্য আর কেউ নেই। যদি সে নিজে শারীরিক এবং মানসিক দিক দিয়ে অন্যরকম কিছু হয়।
.
নিজে যা নয় সেই রকম হওয়ার চেষ্টা বা ইচ্ছে বিশেষ করেই হলিউডে অত্যন্ত বেশি রকম প্রকট। স্যাম উড অতীতের একজন হলিউডের অতি প্রখ্যাত পরিচালক বলেছিলেন, উঠতি অভিনেতাদের নিয়ে তার সবচেয়ে বেশি সমস্যা ছিলো এই : তাদের ঠিক নিজেদের মত গড়ে তোলা। সমস্যাটা হলো তারা প্রায় সবাই চাইতো লানা টার্নার বা ক্লার্ক গেবেল হয়ে উঠতে । জনসাধারণ তো ইতিমধ্যেই বিখ্যাত ওই সব অভিনেতাদের দেখেছে, স্যাম উড তাদের বোঝাতে চাইতেন, এখন তারা চায় নতুন কিছু।
