এ ঘটনার পর ন’বছর কেটে গেছে আর আমি এখন পরিপূর্ণ সুস্থ অবস্থায় চমৎকার জীবন কাটিয়ে চলেছি। একটা বছর যে আমায় বিছানায় শুয়ে কাটাতে হয়েছে তার জন্য আমি আজ কৃতজ্ঞ। আরিজোনায় কাটানো ওই একটা বছর আমার কাছে দারুণ মূল্যবান আর সুখের বছর। ওই সময় যে। আশীর্বাদ আমি পেয়েছি তা প্রতি সকালে স্মরণ করার অভ্যাসটি আজও আমার রয়ে গেছে। এ আমার কাছে অত্যন্ত দামী কোন সম্পদ। এটা বুঝতে আমি লজ্জাবোধ করি যে যতক্ষণ না আমি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি জানতেও পেরেছি, ততদিন সত্যি বাঁচার কথা আমি অনুভব করতে পারিনি।
প্রিয় লুসিল ব্লেক তুমি হয় তো উপলব্ধি করতে পারোনি, তবে তুমি যা শিখেছিলে সেই শিক্ষাই লাভ করেছিলেন দুশ বছর আগে ডঃ স্যামুয়েল জনসন। ডঃ জনসন বলেছিলেন : প্রতি ঘটনার ভালো দিকটা দেখা বছরে হাজার পাউন্ডের চেয়েও বেশি মূল্যবান।
এই কথাগুলো মনে রাখবেন, কোন পেশাদার আশাবাদীর মুখ থেকে বের হয়নি, বরং বেরিয়েছিলো এমন একজন মানুষের মুখ থেকে যিনি বিশ বছর যাবৎ উদ্বেগ, দারিদ্র আর অনাহার মুখোমুখি হন–আর শেষ পর্যন্ত তিনি সেই আমলের এক বিখ্যাত লেখক এবং সর্বকালের নামী বক্তা হয়ে ওঠেন। লোগান পিয়ারসন স্মিথ অল্পকথার মধ্যে একমুঠো দামী কথা প্রকাশ করেছিলেন এই ভাবে : জীবন দুটো বস্তুর জন্য নজর রাখা উচিত, আপনি যা চান তাই পাওয়া, আর তারপর সেটা উপভোগ করা। একমাত্র শুধু সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষই দ্বিতীয়টি লাভ করে থাকে।
আপনার কি জানতে ইচ্ছে আছে রান্নাঘরে শুধু ডিস ধোওয়াও কত উত্তেজনাকর অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়? তা যদি থাকে তাহলে বর্গহিল্ড ডালের লেখা একখানা বই পড়ে দেখতে পারেন। বইখানার নাম ‘আমি দেখতে চেয়েছিলাম’।
এ বইখানা লিখেছিলেন যে মহিলাটি তিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে অন্ধ ছিলেন। ভদ্রমহিলা লিখেছেন : আমার মাত্র একটা চোখ ছিলো আর সে চোখও এমন ঢাকা পড়ে গিয়েছিলো যে সামান্য একটা ফুটো দিয়ে আমায় দেখতে হতো। একেবারে চোখের কাছে এনে প্রায় চোখে লাগিয়েই কোন বই দেখতে পেতাম তারপর লেখা চোখে পড়তো চোখ টান টান করে একেবারে বাঁ পাশে তাকালে।
.
এমন হওয়া সত্ত্বেও তিনি কারও অনুকম্পা নিতে চাননি, চাননি অন্যরকম কোন ব্যবহার। ছোটবেলায় অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে তিনি এক্কাদোক্কা খেলতে চাইতেন, কিন্তু মাটিতে দেয়া দাগ তিনি দেখতে পেতেন না। তাই সব বাচ্চারা খেলার পর বাড়ি চলে গেলে তিনি মাটিতে চোখ লাগিয়ে দাগগুলো দেখার জন্য হামাগুড়ি দিতেন। এমনি করে মাটির প্রতিটি দাগই তিনি একেবারে মনে গেঁথে রেখেছিলেন। তারপর বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে তিনি সকলকে প্রায় হারিয়ে দিতেন। বাড়িতেই তিনি লেখা। করতেন, বড় বড় অক্ষরে লেখা বই প্রায় চোখের কাছে ঠেকিয়ে পড়ে ফেলতেন তিনি। এমন অs তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ডিগ্রী লাভও করেছিলেন। মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী আর কলম্বিয়া থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী।
তিনি মিনেসোটারা টুইন ভ্যালীতে ছোট্ট এক গ্রামে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন আর শেষ পর্যন্ত তিনি সাউথ ডাকোটার অগাস্টান কলেজের সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যের অধ্যাপিকা হন। সেখানে তিনি তেরো বছর শিক্ষাদান করেন আর মেয়েদের ক্লাবে বক্তৃতা দেন। তিনি রেডিওতে বই আর লেখকদের উপর কথিকাও প্রচার করেন। তিনি লিখেছেন : আমার মনের কোণে বরাবরই চিরদিনের মতো অন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তির তির করে কাপতো। এটা থেকে বাঁচার জন্যই জীবন সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ আনন্দ উচ্ছল, হাস্যময় একটা ধারণা পোষণ করতাম।
এরপর ১৯৪৩ সালে তাঁর বয়স যখর বাহান্ন বছর, একটা অলৌকিক ব্যাপার ঘটে যায়। বিখ্যাত মেয়ো ক্লিনিকে তাঁর চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়। এর ফলে তিনি চল্লিশ গুণ বেশিই আগের চেয়ে দেখতে লাগলেন।
এর ফলে তার চোখের সামনে সৌন্দর্যময় উত্তেজনায় ভরপুর একটা দুনিয়ার দরজা খুলে যায়। তিনি রান্নাঘরের বেসিনে ডিস ধোয়ার মধ্যেও অদ্ভুত একটা উত্তেজনার স্পর্শ খুঁজে পেলেন। তার নিজের কথায় ব্যাপারটা এই রকম : আমি বেসিনের মধ্যে ডিসে লাগানো সাবানের ফেনা নিয়ে খেলতে আরম্ভ করেছিলাম। ওই সাবানের ফেনায় হাত ঢুকিয়ে ছোট ছোট বুদ্বুদের গোল বল তুলে এনে আলোর সামনে ধরে তার মধ্যে দেখে চলতাম ছোট্ট ছোট্ট রামধনু রঙের খেলা।
রান্নাঘরের বেসিনের উপরের জানালা দিয়ে তাকাতেই তার চোখে পড়তো সাদাকালো ডানা ঝাঁপটে তুষার স্তূপের উপর দিয়ে উড়ে চলেছে চড়ুই পাখির ঝাঁক।
চড়ুই পাখি আর সাবান ফেনার ওই অপরূপ দৃশ্য দেখে তাঁর মন ক্রমশই উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। তিনি তার বইটি শেষ করেন এই কটি কথা দিয়ে : প্রিয় ঈশ্বর, আমাদের স্বর্গের পিতা, আমি ফিসফিস করে বলি, আমি আপনাকে আমার অন্তরের ধন্যবাদ দিই, জানাই আমার প্রণাম।
একবার ভাবুন আপনি, যেহেতু ডিস ধুতে পারছেন আর সাবানের বুদবুদে রামধনু দেখতে পাচ্ছেন এবং তুষারের বুকে চড়ুইকে উড়তে দেখছেন বলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন ।
আপনার বা আমার নিজেদের সম্বন্ধে লজ্জিত হওয়া উচিত। সমস্ত সময়েই আমরা সৌন্দর্যময় রূপকথার জগতে বিচরণ করে চলেছি। কিন্তু আমরা এমনই অন্ধ যে এসব আমরা দেখেও দেখতে পারি না, আমরা এতই পরিপূর্ণ যে আমরা এই আনন্দ উপভোগ করতে পারি না।
