অন্যদিকে দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ে যদি পাকস্থলীর আলসারে আক্রান্ত হতে চাই তাহলে ওই শতকরা দশভাগের উপরেই নজর দিয়ে নব্বই ভাগকে অগ্রাহ্য করতে হবে।
ক্রমওয়েলের আমলে ইংল্যান্ডের বহু গীর্জায় চিন্তা করুন ও ধন্যবাদ জানান কথাগুলো খোদাই করা আছে। এই কথাগুলো আমাদের হৃদয়ে গেঁথে রাখা উচিত। আমরা যে যে জিনিসের জন্য কৃতজ্ঞ হতে পারি সেকথাই চিন্তা করা দরকার আর আমাদের সমস্ত রকম সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।
গ্যালিভারের ভ্রমণবৃত্তান্তের লেখক জোনাথন সুইফটই ছিলেন ইংরাজী সাহিত্যের সবচেয়ে সাংঘাতিক নিরাশাবাদী। তিনি এতই দুঃখিত থাকতেন যে তিনি সবসময় কালো পোশাক পরতেন আর নিজের জন্মদিনে উপবাস পর্যন্ত করতেন। অথচ তা সত্ত্বেও হতাশায় ভেঙ্গে পড়েও ইংরেজী সাহিত্যের অত বড় নিরাশবাদীও আনন্দিত আর সুখী থাকার স্বাস্থ্যদায়িণী ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন।
তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাক্তার বলেন, ডাক্তার কম খাওয়া, ডাক্তার শান্ত থাকা আর ডাক্তার আনন্দ।
আপনি বা আমি ওই ডাক্তার আনন্দকে প্রতিটি ঘন্টাই আমাদের কাছে রাখতে পারি শুধু আমরা যদি মনে করি আমাদের অফুরান ঐশ্বর্য–যে সম্পদের পরিমাণ আলিবাবার ধন গুহাকেও হার মানাতে পারে । কোটি টাকা পেলে আপনি কি আপনার চোখ দুটো বিক্রি করতে পারবেন? পারবেন আপনার পা বিক্রি করে দিতে? আপনার হাত? আপনার শ্রবণ শক্তি? আপনার সন্তানদের? আপনার পরিবার? সব সম্পদ যোগ করে দেখুন, তাহলেই দেখতে পাবেন রকফেলার, ফোর্ড অথবা মর্গ্যানদের সংগৃহীত সমস্ত সোনার বদলেও আপনি এগুলো বিক্রি করতে পারবেন না।
কিন্তু আমরা কি এটার কথা ভাবি কখনও? ওহঁ, না। সোপেনহাওয়ার যেমন বলেছিলেন : আমাদের যা আছে তার কথা আমরা কদাচিতই ভেবে থাকি বরং অধিকাংশ সময় চিন্তা করি যা আমাদের নেই। এটাই হলো এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিয়োগান্ত ব্যাপার। এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধ আর রোগের যুত দুঃখের সৃষ্টি করেছে তার চেয়ে বেশি দুঃখ এনেছে এই ধরণের চিন্তা।
ঠিক এই চিন্তাই জন পামারকে সুস্থ মানুষ থেকে খুঁতখুঁতে স্বভাবের এক বৃদ্ধে বদলে দেয়। আর তার সংসার প্রায় ভাঙার মুখে এনে দাঁড় করায়। এটা আমার জানা, কারণ তিনি নিজেই আমাকে বলেছিলেন।
মিঃ পামার নিউ জার্সির প্যার্টারজের ১৯ অ্যাভিনিউতে থাকতেন। তাঁর নিজের কথায় বলি। সৈন্যবাহিনী ছেড়ে আসার ঠিক পরেই আমি একটা ব্যবসা আরম্ভ করি। সারাদিন রাতই পরিশ্রম করতাম। সবই বেশ চমৎকার চলছিলো। তারপরেই গন্ডগোল আরম্ভ হলো। আমি ব্যবসার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাজারে পাচ্ছিলাম না। ভয় হলো ব্যবসা হয়তো বন্ধ করেই দিতে হবে। আমার দুশ্চিন্তা এমনই বেড়ে গেলো যে সুস্থ মানুষ থেকে খিটখিটে বুড়ো হয়ে গেলাম । তাছাড়া আমি এমনই খিটখিটে আর রাগী হয়ে পড়লাম যে তখনও বুঝতে পারিনি আমার সুখের সংসারটাই ভাঙতে বসেছে। তখন একদিন আমার এক পুরনো প্রতিবন্ধী কর্মচারি আমায় বললো, বন্ধু, তোমার লজ্জা পাওয়া উচিত। তুমি এমনভাব দেখাচ্ছো যেন পৃথিবীতে একমাত্র তোমারই যত সমস্যা আছে। হয়তো কিছুদিন ব্যবসার দরজা বন্ধ রাখতে হবে–তাতে হলোটা কি? আবার সব ভালো হলে নতুন করে সুরু করতে পারবে। তোমার যা আছে তাতে তোমার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানানো উচিত। তা সত্ত্বেও তুমি খালি অনুযোগ জানাচ্ছো, চাঁচামেচি করছে। বন্ধু, আমার ইচ্ছে করে তোমার অবস্থায় আমি যধিন থাকতাম! আমার দিকে একট তাকিয়ে দেখ । আমার একটা মাত্র হাত আছে, মুখের একটা অংশ উড়ে গেছে, তবুও আমি কোন অনুযোগ জানাচ্ছি না। এই রকম চাচামেচি আর অনুযোগ যদি বন্ধ না করো তাহলে জেনে রেখ শুধ তোমার ব্যবসাটাই হারাবে না, হারাতে হবে তোমার স্বাস্থ্য, সংসার আর বন্ধুবান্ধবকেও!
ওই মন্তব্যগুলো আমায় স্তব্ধ, হতবাক করে দিলো। আমি বুঝতে পারলাম আমি কত সুখে আছি । আমি তখন সেই মুহূর্তেই প্রতিজ্ঞা করলাম আমি আবার আগের মতই হব–আর হলামও তাই।
আমার এক বান্ধবী লুসিল ব্লেক, এক শোচনীয় অবস্থায় পড়তে পড়তেও বেঁচে গিয়েছিলো। তার দুশ্চিন্তাই কেবল ছিলো তার কি নেই, কিন্তু তার কি আছে একবার ও চিন্তা করে সে দেখেনি।
লুসিলের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে বেশ কয়েক বছর আগে আমরা যখন কলম্বিয়া বিশ্ববিদালত ছোট গল্প লেখার পাঠ নিচ্ছিলাম। নবছর আগে সে জীবনের সবচেয়ে মারাত্মক ধাক্কা খায়। সে on। আরিজোনার টাকশনে। তার কাহিনী তার জবানীতেই শুনুন :
আমি একদম ঘূর্ণীর মতো জীবন কাটাচ্ছিলাম। আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি অর্গ্যান বাজানো শিখছিলাম, তাছাড়াও শিখছিলাম অনেক কিছু, সঙ্গীতবোধ সম্পর্কে ক্লাসে বক্ততাও দিতাম। না; নাচে, ঘোড়ায় চড়ায় অংশও নিতাম। একদিন সকালে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলাম। আমার বুকের অসুখ দেখা দিলো। ডাক্তার জানালেন, আপনাকে এক বছর বিছানায় শুয়ে কাটাতে হবে, সম্পূর্ণ বিশ্রাম দরকার। তিনি একবারও উৎসাহ জানিয়ে বললেন না আবার আগের মত আমি সুস্থ হয়ে উঠতে পারবো।
বিছানায় শুয়ে এক বছর কাটাতে হবে? শয্যাশায়ী হবে–শেষ পর্যন্ত হয়তো মাই দেন, ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। আমার জীবনে এরকম হলো কেন? আমি কি অপরাধ করলাম যে আমার আমায় পেতে হবে? আমি বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লাম। এছাড়াও আমি যেন তিক্ত আর বিদ্রোহী হয়ে উঠলাম। তাসত্বেও ডাক্তারের পরামর্শ শুনে শয্যাতেই আশ্রয় নিলাম। আমার প্রতিবেশী শিল্পী মিঃ রুডলফ আমায় বললেন, তুমি ভাবছো বিছানায় একবছর শুয়ে থাকা ভারি কষ্টকর। কিন্তু দেখে নিও, তাহলে তুমি ভাববার অনেক সময় পাবে আর নিজেকে জানতে পারবে। তোমার সমস্ত আগেকার জীবনটায় যা পারোনি আগামী কয়েক মাসে তোমার আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটবে দারুণভাবে। এসব শুনে আমি কিছুটা শান্ত হলাম আর নতুন কিছু মূল্যবোধ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতে চাইলাম। অনুপ্রাণিত করার মত বই পড়তে লাগলাম আমি। একদিন একজন বেতার ঘোষককে বলতে শুনলাম : আপনার জ্ঞানে যা আছে সেটাই আপনি প্রকাশ করতে পারেন। এধরণের কথা আগে বহুবার শুনেছি, কিন্তু এখন কথাগুলো আমার শরীরে এবং মনের গভীরে শিরার শিরায় যেন ছড়িয়ে গেল। আমি মনে মনে ঠিক করলাম যে, যে চিন্তা নিয়ে আমি বাঁচতে চেয়েছি তাই শুধু ভেবে চলব–সে চিন্তা হলো আনন্দ, সুখ, আর স্বাস্থ্য। রোজ সকালে ঘুম ভাঙার পরেই যে সব জিনিসের জন্য আমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত তাই শুধু ভাবতে আরম্ভ করলাম। কোন যন্ত্রণা নেই। সুন্দর কিশোরী একটি মেয়ে। আমার দৃষ্টি শক্তি। আমার শ্রবণ শক্তি । রেডিওতে চমৎকার গান। পড়ার সময়। ভালো খাদ্য ভালো বন্ধু । আমি এমনই হাসিখুশি উচ্ছল হয়ে উঠলাম যে প্রচুর বন্ধুবান্ধবী দেখা করার জন্য আসতে সুরু করলে ডাক্তারকে বাধ্য হয়ে একটা নোটিশ টাঙিয়ে দিতে হলো, আমার কেবিনে একবারে মাত্র একজন দর্শনার্থীই আসতে পারবেন–তাও আবার নির্দিষ্ট সময়।
