অতএব মনে রাখতে হবে কৃতজ্ঞ সন্তান চাইলে তাদের কৃতজ্ঞ হবার শিক্ষা দেওয়া চাই। আমাদের মনে রাখা দরকার ছোট ছেলেমেয়েরা কথাবার্তা শুনতে ওস্তাদ হয়। এরপর তাই আমরা যেন তাদের সামনে কারও নিন্দে না করি। কখনও বলা উচিত নয়, এই দেখ সুসান তোয়ালে পাঠিয়েছে, এতে ওর একপয়সাও খরচ হয়নি। বরং বলা উচিত, এই তোয়ালে পাঠাতে সুসানের কত পরিশ্রম হয়েছে। ভারি চমৎকার, তাই না? তাকে ধন্যবাদ দিয়ে চমৎকার চিঠি লিখতে হবে। এতে আমাদের সন্তানরা অবচেতন মনেই ধন্যবাদের ঔদার্য শিখতে থাকবে।
তাই অকৃতজ্ঞতার দুঃখ আর যন্ত্রণা ভোলার জন্য তিন নম্বর নিয়ম হল :
(ক) অকৃতজ্ঞতার জন্য দুশ্চিন্তা না করে বরং সেটা আশা করাই ভালো। মনে রাখা দরকার স্বয়ং যীশু একদিন দশজন কুষ্ঠ রোগীকে ভালো করে দিয়েও কারও কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা পাননি। তাহলে যীশু যা পাননি আমরা তা আশা করব কেন?
(খ) মনে রাখবেন শান্তি পাওয়ার একটা পথই আছে কৃতজ্ঞতা আশা না করা এবং তার পরিবর্তে দান করে আনন্দ পাওয়া।
(গ) মনে রাখবেন কৃতজ্ঞতা হলো শিক্ষা সাপেক্ষ, তাই আমাদের সন্তানদের যদি কৃতজ্ঞ দেখতে চাই তাহলে তাদের সেই ভাবেই শিক্ষা দিতে হবে।
১৫. আপনার সম্পদ হাতবদল করবেন?
অনেকদিন ধরেই হ্যাঁরল্ড অ্যাবটকে আমি চিনি। তিনি ৮২০ সাউথ ম্যাডিসন অ্যাভিনিউ, মিসৌরীর ওয়েবসিটিতে থাকেন। তিনি আমার বক্তৃতার ম্যানেজার ছিলেন। তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় কানসাস সিটিতে। তিনি আমায় তাঁরই গাড়িতে আমার বেলটনের খামারে পৌঁছে দেন। পথ চলতে চলতে আমি তাকে প্রশ্ন করি উদ্বেগকে তিনি কেমন করে সরিয়ে রাখেন? উত্তরে তিনি এমন একটা উদ্বুদ্ধ করা গল্প শোনান যা কোনদিনই ভুলতে পারব না।
তিনি বলেন আমি আগে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা করতাম, তবু ১৯৩৪ সালের বসন্তকালে একদিন ওয়েব সিটির ওয়েষ্ট ডুহাটি বরাবর বেড়ানোর সময় এমন একটা দৃশ্য আমার চোখে পড়লো যাতে আমার সব। দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেলো। মাত্র দশ সেকেন্ডে ব্যাপারটা ঘটে যায়। কিন্তু ওই দশ সেকেন্ডে আমি যা শিখেছিলাম দশ বছরেও তা পারিনি।
বিগত দু’বছর ধরে ওয়েব সিটিতে আমি একটা মুদীখানার দোকান চালিয়ে আসছিলাম। কাজটা করতে গিয়ে আমার সর্বস্ব যে হারাই তাই নয়, এমন ঋণগ্রস্ত হই যে সেটা শোধ করতে ৭ বছর লেগে যায়। আমার মুদী দোকান গত শনিবার থেকে বন্ধ হয়ে গেছে, আর এখন আমি চলেছি ব্যাঙ্কে কিছু টাকা ধার করতে যাতে কানসাস সিটিতে গিয়ে একটা চাকরির খোঁজ করতে পারি। পরাজিত এক মানুষের মতই আমি চলেছিলাম। তখনই আচমকা আমার নজরে পড়লো একজন লোক আসছে যার দুটো পা নেই। সে একটা ছোট স্কেটিং করার চাকা লাগানো কাঠের তক্তায় বসে হাতে একখণ্ড কাঠ দিয়ে সেটা ঠেলে নিয়ে আসছিলো। সে লোকটি রাস্তা পার হওয়ার ঠিক পরেই তার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হলো। সে চমৎকার হাসি দিয়ে আমায় অভ্যর্থনা জানালো। সুপ্রভাত স্যার অতি চমৎকার সকাল তাই না? তার দিকে তাকাতেই আমার মনে খেলে গেলো আমি কতখানি ভাগ্যবান আমার দুটো পা আছে, আমি হাঁটতে পারি। আমার নিজের উপর ধিক্কার দেওয়ার জন্য লজ্জিত বোধ করলাম। আমি আমার নিজেকেই বললাম ও যদি ওর দুটো পা না থাকা সত্ত্বেও সুখী আনন্দিত আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর থাকতে পারে তাহলে পা নিয়ে আমি নিশ্চয়ই পারবো। ইতিমধ্যেই আমি বুকে জোর পেতে শুরু করেছিলাম। আমি ব্যাঙ্কের কাছে একশ ডলার ধার নেবো ভেবেছিলাম, এখন ঠিক করলাম দুশো ডলার নেব। আগে ভেবেছিলাম টাকা নিয়ে কানসাস সিটিতে গিতে একটা চাকরির চেষ্টা করবো। এখন ঠিক করে দৃঢ় নিশ্চিত হলাম সেখানে গিয়ে একটা চাকরি পাবোই। আমি ধারও পেলাম আর চাকরিও পেলাম।
এখন আমার স্নানঘরের আয়নার উপর নিচের কথাগুলো সেঁটে রাখা আছে। এগুলো প্রতিদিন সকালে দাড়ি কামানোর সময় আমি পাঠ করি :
একদিন আমার জুতো ছিলো না বলে মন খারাপ ছিলো, সে দুঃখ দূর হয়ে গেল রাস্তায় যখন দেখলাম একজন মানুষের দুটো পা নেই।
আমি একবার এডি রিকেন ব্যারাককে প্রশ্ন করেছিলাম, প্রশান্ত মহাসাগরে অসহায় ভাবে সঙ্গীদের নিয়ে একটা ভেলায় চড়ে একুশদিন ভেসে বেড়িয়ে কি পেয়েছেন তিনি। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ওই অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা আমি পাই; তাহলো যদি আপনার ইচ্ছে মত যথেষ্ট খাওয়ার জল থাকে, ইচ্ছেমত খাওয়ার জন্য খাদ্যও থাকে তাহলে কোন ব্যাপারেই কখনও অনুযোগ জানানো উচিত। নয়।
টাইম পত্রিকায় একবার গয়াদাল কানালে আহত এক সার্জেন্টের গল্প বেরিয়ে ছিলো । গোলার উকবো গলায় লেগে সে আহত হওয়ার পর তাকে রক্ত দিয়ে হয়। সে ডাক্তারকে একটা চিরকূট পাঠিয়ে প্রশ্ন করে : আমি কি বাচবো? ডাক্তার জবাব দেন হ্যাঁ। সে এবার লেখে : আমি কি কথা বলতে পারবো? এবারও উত্তর এলো হ্যাঁ। সে তখন আর একটা চিরকূট পাঠালো : তাহলে এতো ভাবনায় পড়ছি কেন?
আপনিও ঠিক এই ভাবে নিজেকেই প্রশ্ন করতে পারেন : আমিই বা এতো দুশ্চিন্তা করছি কেন? হয়তো একটু ভাবলেই দেখতে পাবেন চিন্তার কারণটা সত্যিই অকিঞ্চিৎকর।
আমাদের জীবনে শতকরা নব্বই ভাগ ব্যাপারই ঠিক আর মাত্র দশ ভাগই ভুল। আমরা যদি সুখী হতে চাই তাহলে আমাদের যে শতকরা নব্বই ভাগ ঠিক তার উপরেই নজর রাখতে হবে বাকি দশভাগ ভুলকে অগ্রাহ্য করতে হবে।
