তার মত এমন হাজার হাজার স্ত্রীলোক আছেন, ‘অকৃতজ্ঞতা’, একাকীত্ব আর অবহেলার শিকার। তারা ভালোবাসা চান, কিন্তু এই পৃথিবীতে ভালোবাসা পাওয়ার একটাই পথ আছে, আর তা হল ফেরত পাওয়ার আশা না করে ভালোবেসে যাওয়া।
কথাটা নিছক আদর্শবাদের মতো শোনাচ্ছে? মোটেই তা নয়। এটা সাধারণ জ্ঞানের কথা। যে সুখ আমরা সন্ধান করি এটা আমার বা আপনার পাওয়ার পক্ষে একটা খুব ভালো উপায়। এটা আমার জানা, কারণ আমার পরিবারেই এটা ঘটেছে। আমার বাবা আর মা সাহায্যের আনন্দেই অন্যকে সাহায্য করতেন। আমরা গরীবই ছিলাম–সব সময় ধার দেনা হতো। তা সত্বেও যতই গরীব হোন, আমার বাবা মা প্রতি বছর অনাথ আশ্রমে টাকা পাঠাতেন। সেটা ছিলো আইওয়াতে । বাবা মা সেটা কোনদিন দেখেন নি । আশ্রমের উপকারের জন্য কেউ বাবা মাকে ধন্যবাদও দেয়নি–একমাত্র চিঠিতে ছাড়া। তবুও বাবা মা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সাহায্য করে, কোন রকম কৃতজ্ঞতা ছাড়াই আনন্দ পেতেন।
বাড়ি ছেড়ে আসার পর আমি বাবা আর মাকে বড়দিনে কিছু টাকার চেক পাঠিয়ে জানাতাম কোন সখের জিনিস কিনতে। কিন্তু তারা কদাচিৎ তা করতেন। বড়দিনের কিছু আগে আমি বাড়ি এলে বাবা মা আমায় জানাতেন, প্রচুর সন্তান সহ এক গরিব মহিলার জন্য তাঁরা কয়লা আর খাদ্য কিনেছেন। এই উপহার পেয়ে তাদের কত আনন্দ, কিন্তু কিছু ফিরে না পাওয়ার আশা করে দান করা আনন্দও কতখানি।
আমার বিশ্বাস বাবা অ্যারিস্টটলের আদর্শ মানুষ হবারই যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন । অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, আদর্শ মানুষ সেই, যে অন্যের উপকার করে আনন্দ পায়–আর অন্যে উপকার করলে লজ্জিত হয়। কারণ কোন দান করা মহত্বের লক্ষণ আর তা গ্রহণ করা নীচতা।
এ পরিচ্ছেদে যা বলতে চাই এ হল তাঁর দ্বিতীয় বক্তব্য : আমরা যদি সুখী হতে চাই তাহলে কৃতজ্ঞতা বা অকৃতজ্ঞতার কথা ভুলে যাওয়া ভাল–আর দান করার আনন্দেই দান করা উচিত।
দশ হাজার বছর ধরে বাবা মায়েরা অকৃতজ্ঞ ছেলেমেয়ের কথা বলে আসছেন এবং নিজেদের চুল ছিঁড়ছেন।
এমনকি শেক্সপিয়ারের রাজা লিয়ার বলেছেন : যে সন্তান অকৃতজ্ঞ তার দাঁতের ধার সাপের চেয়েও বেশি।
কিন্তু ছেলেমেয়েদের আমরা না শেখালে তারা কৃতজ্ঞ হবে কেমন করে? অকৃতজ্ঞতা খুবই স্বাভাবিক–আগাছারই মত। কৃতজ্ঞতা হল গোলাপের মত। তাকে যত্ন করতে হবে, জল দিতে হবে, রক্ষা করতে হবে।
আমাদের সন্তানরা অকৃতজ্ঞ হলে দায়ী কে? হয়তো আমরাই। আমরা যদি তাদের অন্যের প্রতি কতজ্ঞ থাকতে না শেখাই তারা কি করে আমাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে?
আমি শিকাগোয় একজনকে চিনি যিনি তাঁর সৎ ছেলেদের অকৃতজ্ঞতা সম্পর্কে অনুযোগ করে থাকেন। তিনি একটা বাক্স তৈরির কারখানায় ক্রীতদাসের মত খেটে সপ্তাহে মাত্র চল্লিশ ডলার পেতেন। তিনি এক বিধবাকে বিয়ে করেন। সেই মহিলা তার ছেলেদের কলেজে পাঠাতে বলায় তাঁকে ধার করতে হয়। সপ্তাহের মাত্র চল্লিশ ডলার দিয়েই তাকে খাওয়া, বাড়ি ভাড়া, কয়লা, কাপড় কিনতে হত আর ধারও শোধ করতে হত। চারবছর কোন অভিযোগ না করে তিনি এসবই কুলির মত খেটে করে যান।
কিন্তু এজন্য কি কোন ধন্যবাদ পান তিনি? না–তাঁর স্ত্রী আর ছেলেরা এটা তার কর্তব্য বলেই ধরে নেয়। ছেলেরা ভাবেই নি তাদের সৎ বাবার এজন্য কোন কিছু পাওনা আছে–এমন কি ধন্যবাদও।
দোষটা কার? ছেলেদের? হ্যাঁ–তবে মা–র দোষ আরও বেশি। মা ভেবেছিলেন ছেলেরা কারও কান্ডে ঋণী, এই চিন্তা থাকা উচিত নয়। তিনি কখনই বলেন নি, তোমাদের বাবা কত সুন্দর কতে পড়াচ্ছেন। বরং ভাব দেখাতেন এর চেয়ে আরও ভালো করা উচিত ছিল।
তিনি ভাবতেন তিনি ছেলেদের ভালোর জন্যই এটা করছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি ছেলেদের একটা বিপজ্জনক ধারণা সৃষ্টি করেছিলেন যে, কারও ধার ধারার দরকার নেই। এই ধারণাটা শেষপর্যন্ত বিপজ্জনকই হয়, কারণ ছেলেদের মধ্যে একজন এক কোম্পানীর মালিকের কাছে কাজ করত। ধার করে শেষ পর্যন্ত জেলে যায়।
আমাদের জানা দরকার আমরা সন্তানদের যেভাবে গড়ে তুলি তারা সেই ভাবেই বেড়ে ওঠে। একটা উদাহরণ দিই–আমার মাসী, মিনিয়াপোলিসের ভায়োলা আলেকজান্ডার হলেন তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তাকে কোনদিন সন্তানদের অকৃতজ্ঞতার জন্য অনুযোগ জানাতে হয়নি। ভায়োলা মাসী তার মাকে কাছে এনে প্রচুর যত্ন করতেন। আর ঠিক তেমনটি করতেন তাঁর শাশুড়ীকেও। এখনও চোখ বুজে স্মরণ করতে পারি ভায়োলা মাসীর খামার বাড়িতে চুল্লীর সামনে দুই বৃদ্ধা বসে আছেন। তারা কী মাসীকে ঝামেলায় ফেলতেন? ফেলতেন না তা বলব না। তবে মাসী দুই বৃদ্ধাকে খুবই যত্ন করতেন আর ভালোবাসতেন। তাছাড়া মাসীর নিজের ছ’টি ছেলেমেয়ে ছিল–তার কখনই মনে হতো না তিনি কোন মহৎ কাজ করছেন আর সেজন্য লোকে তাকে পূজা করবে। তার কাছে কাজটা ছিল অতি স্বাভাবিক আর সেটাই তিনি করতে চেয়েছিলেন।
ভায়োলা মাসী এখন কোথায়? বছর কুড়ির মত হল তিনি বিধবা হয়েছেন–তার পাঁচটি বড় ছেলেমেয়েও আছে তারা সবাই মাকে কাছে রাখতে চায়। তার ছেলে মেয়েরা তাকে দারুণ ভালোবাসে। তারা ভাবে মাকে পুরোপুরি কাছে পাচ্ছে না। এটা কি কৃতজ্ঞতা থেকে? বাজে কথা। এ হলো ভালোবাসা–নিছক ভালোবাসা। এই সব ছেলেমেয়েরা শিখেছে তাদের ছোটবেলার মানবিকতার ঔদার্যের মধ্যে। এটা কি আশ্চর্য লাগছে যে ব্যাপারটা এখন ঠিক উল্টো হয়ে গেছে আর তারা সেই ভালোবাসাই ফিরিয়ে দিচ্ছে?
