এই ব্যাপারে ওই রকম ঘ্যানর ঘ্যানর না করে তিনি অবশ্যই আত্ম সমালোচনা করে জানার চেষ্টা করতে পারতেন, কেন তিনি ধন্যবাদ পান নি। হয়তো কর্মচারীদের তিনি কম মাইনে দিতেন বা বেশি খাটাতেন। হয়তো তারা ভেবেছিলো বোনাসটা তারা বড়দিনের উপহার হিসেবে পায় নি এটা না পাওনা। হয়তো তিনি সবসময় সমালোচনা করেন বা তার কাছে সবাই যেতে ভয় পায়। তাই কেউ তাকে সনাবাদ জানাতে চায়নি। এটাও হতে পারে তিনি বোনাস দিয়েছিলেন বেশির ভাগ টাকাই কর দিয়ে চলে যায় বলে।
অন্যদিকে এমনও হতে পারে কর্মচারিরাই ছিল স্বার্থপর, নীচমনা, অভদ্র। হয়তো এটাই–হয়তো বা অন্য কিছু আমার তা জানার সুযোগও নেই। তবে আমি ডক্টর স্যামুয়েল জনসনের কথাটা জানিঃ কৃতজ্ঞতা বোধ অনেক কষ্টেই জাগ্রত হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে সেটা আশা করা বাতুলতা।
আমি যা বলতে চাই তা হল এই : এই লোকটি সাধারণ মানুষের মত দুঃখজনক একটা ভুল করেছিলেন কৃতজ্ঞতা আশা করে। মানব চরিত্র সম্বন্ধে তার কোন ধারণাই ছিলো না।
আপনি যদি কোন মানুষের জীবন বাঁচান তাহলে কি কৃতজ্ঞতা আশা করবেন? হয়তো তাই করবেন–তবে স্যামুয়েল লিবোউইস, যিনি বিচারক পদ পাওয়ার আগে বিখ্যাত ফৌজদারী উঁকিল ছিলেন, অন্ততঃ আটাত্তর জনকে বৈদ্যুতিক চেয়ারে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান। এই সব মানুষদের মধ্যে কতজন তাকে বড়দিনে মনে রেখেছে ভাবছেন? কতজন বলুন তো?…একজনও না? ঠিকই বলেছেন।
যীশুখ্রীষ্ট একদিন বিকেলে দশজন কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য করেছিলেন। তাদের মধ্যে কজন তাকে ধন্যবাদ দেয়? মাত্র একজন । এটা বাইবেলে পাবেন । খ্রীষ্ট যখন তাঁর শিষ্যদের প্রশ্ন করলেন, আর নজন কোথায়? তারা সকলেই পালিয়ে গিয়েছিল। তারা ধন্যবাদ না দিয়েই পালায়। আপনাদের একটা প্রশ্ন করি আসুন : আপনি বা আমি বা ওই মালিক–বেশি ধন্যবাদ আশা করে স্বয়ং যীশুই যখন তা পাননি, আপনি বা আমি যীশুর চাইতে কম কাজ করেও ধন্যবাদ আশা করব কেন?
আর এটা আবার যখন টাকা পয়সার ব্যাপারে হয়, তখন ব্যাপারটা খুবই খারাপ হয়ে দাঁড়ায়। চার্লস্ শোয়াব আমাকে বলেছিলেন যে তিনি একবার ব্যাঙ্কের টাকা নিয়ে ফটুকা খেলে তা নষ্ট করার অপরাধ থেকে একজন ক্যাশিয়ারকে বাঁচান। এই লোকটিকে চার্লস শোয়ব টাকা দিয়ে জেলে যাওয়া থেকে বাঁচান। ক্যাশিয়ার কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে?–হ্যাঁ, তবে অল্প সময়ের জন্য। পরে সে শোয়াবের নানা রকম নিন্দা করতে থাকে–অথচ তাকেই শোয়াব জেল থেকে বাঁচান।
আপনি যদি আপনার কোন আত্মীয়কে দশলক্ষ ডলার দেন তাহলে কি আশা করবেন তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন? আন্ডু, কার্নেগী ঠিক তাই করেছিলেন। অ্যান্ড্র, কার্নেগী যদি সমাধি থেকে কদিন পরে উঠে আসতেন তাহলে দেখতেন আর ব্যথিত হতেন যে সেই আত্মীয় তাঁকে গালাগাল দিচ্ছে। কেন? কারণ বৃদ্ধ অ্যান্ড্র, প্রায় বিশ কোটি ডলার সাধারণ মানুষের জন্য দান করে যান–অথচ আত্মীয়টির ভাগে মাত্র দশ লক্ষ ডলার!
দুনিয়ায় এই রকমই ঘটে। মনুষ্য চরিত্র এই রকমই…আপনার সারা জীবনেও তা বদলাবার আশা নেই। তাহলে এটাই গ্রহণ করুন না কেন? এ ব্যাপারে মার্কাস অরেলিয়াসের মত বাস্তববাদী হওয়াই তো ভালো । রোমান সাম্রাজ্যের শাসকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে জ্ঞানী। তিনি তাঁর ডায়েরীতে একদিন লেখেন : আমি আজ একদল লোককে দেখতে যাচ্ছি যারা খালি কথা বলে–এমন সব লোক যারা স্বার্থপর, অহঙ্কারী, অকৃতজ্ঞ । তবে আমি এতে আশ্চর্য হব না, কারণ এ রকম মানুষ ছাড়া পথিবীতে ভাবতেই পারি না।
কথাটার বেশ অর্থ রয়েছে, তাই না? আপনি বা আমি যদি অকৃতজ্ঞতা নিয়ে ক্রমাগত মাথা ঘামাই দোষটা কার? এটাই মানব চরিত্র–না মানব চরিত্র সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা? আসুন আমরা আর কতজ্ঞতা আশা করব না। তাই মাঝে মাঝে হঠাৎ যদি তা পাই তাহলে আনন্দে আত্মহারাই হব। আবার কেউ তা না দিলে দুঃখিত হব না।
এই পরিচ্ছেদে যা বলতে চাইছি তার প্রথম কথা এই : কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ভুলে যাওয়াই মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক। তাই যদি আমরা কৃতজ্ঞতা আশা করি তার বদলে আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আমি নিউ ইয়র্কের এক মহিলাকে চিনি যিনি সব সময় একাকী বলে অনুযোগ করেন। তাঁর একজন আত্মীয়ও তাঁর কাছে আসতে চায় না–এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাঁর কাছে কখনও যদি যান তিনি আপনাকে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে শোনাবেন–তিনি তার ভাইঝিদের কেমন ভাবে ছোটবেলায় হাম, মাম্মস, হুপিং কাশি ইত্যাদিতে সেবা করেছেন, কীভাবে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন, একজনকে স্কুলে পাঠিয়েছেন, একজনের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আশ্রয় দিয়েছেন।
ভাইঝিরা তাঁকে কি দেখতে আসে? ওহ হ্যাঁ, মাঝে মাঝে আসে–তবে নেহাতই কর্তব্যের খাতিরে । তবে এসবে তারা কাছে আসতে ভয় পায়। তারা জানে এলে ঘন্টার পর ঘণ্টা তাদের অনুযোগ শুনে যেতে হবে। সমস্তক্ষণ ধরে ঘ্যানর ঘ্যানর এবং গালাগাল শুনতে হবে। যখন ভাইঝিদের বকাবকি শেষ হয় তখন তার হৃদরোগ দেখা দেয়।
হৃদরোগটা কি আসল? হ্যাঁ, সেটা আসল। ডাক্তারদের মতে তার বুকে প্রচণ্ড ধুকধুকুনি আছে। ডাক্তাররা এটাও বলেছেন তাদের করার কিছু নেই কারণ এর সবটাই আবেগের কারণে।
এই মহিলাটি আসলে যা চান তা হলো একটু ভালোবাসা আর স্নেহ। অথচ তিনি একে বলেন কৃতজ্ঞতা। কিন্তু তিনি কোন কালেই কৃতজ্ঞতা পাবেন না কারণ তিনি তা দাবী করেন। তার ধারণা এটা তার পাওনা।
