এরপর লরেন্স জোন্সকে যখন প্রশ্ন করা হয় যারা গলায় দড়ি পরিয়ে আগুনে পোড়তে চায় তাদের। তিনি ঘৃণা করেন কিনা। এর জবাবে বলেছিলেন–নিজের কাজ নিয়ে তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত তাই ঘৃণা করার সময় তাঁর নেই, নিজের চেয়েও কড় কাজ করবরর ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত। তিনি বলেছিলেন, আমার ঝগড়া করার সময় নেই, সময় নেই অনুশোচনা করার আর কোন মানুষই আমাকে ঘৃণা করার মত নিচে নামাতে পারবে না।
লরেন্স জোন্স যখন আন্তরিকতার সঙ্গে সুন্দর বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, এবং যখন নিজের জীবন ভিক্ষা না চেয়ে নিজের কাজ সম্বন্ধে ওকালতি করছিলেন, তখন জনতা আস্তে আস্তে নরম হতে আরম্ভ করল । অবশেষে একজন বৃদ্ধ জনতার মাঝখান থেকে বলে উঠলেন : আমি বিশ্বাস করি এই ছেলেটি সত্য কথাই বলছে। যে সাদা লোকদের নাম ও করেছে তাদের আমি চিনি। ও ভাল কাজ করছে। আমরাই ভুল করেছি। আমাদের উচিত ওকে ফাঁসি না দিয়ে সাহায্য করা। এই বলে তিনি তার টপি সকলের সামনে ধরলেন–আর বাহান্ন ডলার সাহায্য তুলে দিলেন ঠিক তাদেরই কাছ থেকে–যারা পাইনি উড স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাকে একটু আগে ফাঁসি দিতে যাচ্ছিল।
এপিকটেটাস ঊনিশ শতাব্দী আগে বলেছিলেন : যে যেরকম কাজ করে সে তদনুরূপ ফল পায়। তিনি আরও বলেন, শেষ পরিণতিতে প্রত্যেক মানুষই তার কুকর্মের ফল পায়। যে মানুষ একথা মনে রাখে সে কোন কারণেই রাগ করে না, অসন্তুষ্ট হয় না। কুৎসা রটনা করে না। কাউকে দোষ দেয় না কাউকে ঘৃণাও করে না।
আমেরিকার ইতিহাসে সম্ভবতঃ লিঙ্কনের চেয়ে আর কাউকে এত ঘৃণা, নিন্দা বা ঠকানো হয়নি। তা সত্বেও হার্নানের লেখা তার বিখ্যাত জীবনী অনুসারে, মানুষকে লিঙ্কন কখনও তার ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ দিয়ে বিচার করতেন না। যদি কোন কাজ করানো প্রয়োজন দেখা দিত তিনি ভাবতেন তার শত্রুও সেকাজ করতে পারে। কোন লোক তাকে গালমন্দ করে থাকলেও সে যদি কাজটি করার উপযুক্ত হত তিনি তাকেই সে কাজের ভার দিতেন যেটা তার যে কোন বন্ধুকেও দিতে পারতেন। …আমার মনে হয় তিনি কখনই তাঁর ব্যক্তিগত শত্রু হওয়া সত্ত্বেও বা তাঁকে অপছন্দ করলেও কাউকে কাছ থেকে সরিয়ে দেন নি।
.
লিঙ্কন যেসব মানুষকে উঁচু পদে বসান যেমন, ম্যাকলেলান, সেওয়ার্ড, স্ট্যানটন আর চেজ–তারা অনেকেই তাকে অপমান ও প্রকাশ্যে নিন্দা করেন। তা স্বত্তেও হার্ডনের কথা অনুযায়ী, লিঙ্কন কখনই তাদের নিন্দা করেন নি। লিঙ্কন বলেন : কোন লোককেই তার কাজের জন্য বেশি প্রশংসা বা নিন্দা করা উচিত নয়। কারণ আমরা সকলেই অবস্থা, পরিবেশ, শিক্ষা, অভ্যাস, বংশগত ধারা ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল আর তাই চিরকাল থাকব।
লিঙ্কন সম্ভবতঃ ঠিকই বলেছিলেন। আমি বা আপনি যদি আমাদের শত্রুদের মতই শারীরিক, মানসিক আর আবেগমন্ডিত হতাম তাহলে হয়তো তাদের মতই ব্যবহার করতাম। হয়তো অন্য কিছু আমরা করতে পারতাম না। তাই আসুন আমরা এবার আমেরিকার আদিম অধিবাসী সিউক্স ইন্ডিয়ানদের মত প্রার্থনা করি : হে মহান দেবতা, আমি যতক্ষণ না অন্য একজনের মত অবস্থায় অন্ততঃ দুসপ্তাহ কাটাচ্ছি ততক্ষণ যেন তার সমালোচনা না করি। তাই আমাদের শত্রুদের ঘৃণ্য করার বদলে আসুন তাদের অনুকম্পা জানাই আর ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই যে তাদের মত জীবন কাটাতে হয়নি। শত্রুদের দুর্নাম দিয়ে আর প্রতিশোধ গ্রহণ না করে আসুন তাদের জন্য সাহায্য প্রার্থনা আর ক্ষমতা করি।
আমি যে পরিবারে জন্মেছি সেখানে প্রত্যেক রাতে বাইবেল থেকে পাঠ করে প্রার্থনা করা হত। আমার মনে পড়ছে বাবার কথা–যিনি মিসৌরীর খামারে বসে এই কথাগুলো আবৃত্তি করতেন : শত্রুকে ভালোবাসো। যে তোমায় অভিশাপ দেয় তাকে আশীর্বাদ কর, যারা ঘৃণা করে তাদের ভালো কর । যারা তোমায় শাস্তি দেয় তাদের জন্য প্রার্থনা কর।
আমার বাবা যীশুর ওই কথাগুলো মেনে চলার চেষ্টা করতেন এতে তিনি অন্তরের শান্তি পান, যে অন্তরের শান্তির জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রাজা আর সেনাপতিরা হন্যে হয়েও তা পাননি।
শান্তি আর সুখের জন্য তাই দু–নম্বর নিয়ম হল :
কখনই শত্রুদের উপর প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবেন না, তাতে তাদের ক্ষতি করার চেয়ে নিজেরই ক্ষতি হয় বেশি। বরং জেনারেল আইসেনহাওয়ার যা করতেন তাই করা ভালো : যাদের পছন্দ করি না তাদের নিয়ে যেন এক মিনিটও ভেবে সময় নষ্ট না করি।\
১৪. এভাবে চললে অকৃতজ্ঞতা আপনাকে চিন্তায় ফেলবে না
সম্প্রতি আমার সঙ্গে টেক্সাসের একজন ব্যবসায়ীর দেখা হয়, দ্রলোক সব সময় মেজাজ খারাপ করে থাকতেন। আমাকে আগেই কেউ কেউ বলেছিল তার সঙ্গে দেখা হলেই সে তার মেজাজ খারাপের কথাটা শোনাবে। তিনি করলেনও তাই। যে ঘটনার জন্য তার রাগ সেটা ঘটে প্রায় এগারো মাস আগে–অথচ তিনি এখনও সেটা ভুলতে পারেন নি। অন্য কোন বিষয়ে তিনি কথাও বলতেন না। তিনি তার চৌত্রিশজন কর্মচারিকে মোট দশ হাজার ডলার বড়দিনের বোনাস হিসেবে দিয়েছিলেন প্রত্যেককে প্রায় তিনশ ডলার করে–এজন্য কিন্তু কেউ তাকে ধন্যবাদও দেয়নি। দ্রলোক অভিযোগ করেছিলেন, আমি দুঃখিত যে ওদের এত টাকা দিয়েছিলাম।
কনফুসিয়াস বলেছিলেন কোন ক্রুদ্ধ লোক সবসময় বিষময়, ওই লোকটি এতই বিষময় ছিলেন যে সত্যিই তার প্রতি আমার করুণা হয়। ভদ্রলোকের বয়স ছিল প্রায় ষাট । বীমা প্রতিষ্ঠানের লোকরা বলেন। আমাদের বর্তমান যা বয়স আর আশি বছরের মধ্যে যেটা বাকি থাকে তার দুই ততীয়াংশ আমরা সাধারণতঃ বাচি। এই লোকটি ভাগ্যবান হলে হয়তো আর চোদ্দ পনেরো বছর বাঁচবেন । অথচ তিনি তাঁর বাকি জীবনে একটা পুরো বছর শুধু তিক্ততায় আর মেজাজ খারাপের মধ্য দিয়ে নষ্ট করেছেন অতীতের একটা ঘটে যাওয়া ব্যাপার নিয়ে। আমি তাঁকে করুণা করি।
