আমরা হয়তো আমাদের শত্রুদের ভালোবাসার মত অতখারি সাধু হবে পারব না, তবে আমাদের স্বাস্থ্য আর সুখের জন্য আসুন তাদের ক্ষমা করে সব ভুলে যাই। এটা একটা চমৎকার কাজ। কনফুসিয়াস বলেছিলেন : অন্যায় নিগ্রহ ভোগ বা লুণ্ঠিত হওয়া কিছুই নয়, যদি তা মনে না রাখি । আমি একবার জেনারেল আইসেনহাওয়ারের ছেলে জনকে প্রশ্ন করি তার বাবা কি কোনদিন রাগ পুষে রেখেছিলেন? সে উত্তরে বলে, না বাবা যাদের পছন্দ করেন না তাদের কথা এক মুহূর্তও ভাবেন না।
একটা প্রাচীন প্রবাদ আছে যে লোক রাগতে জানে না সে মুখ, কিন্তু যে রাগ করে না সে বুদ্ধিমান। নিউইয়র্কের ভূতপূর্ব একজন মেয়র উইলিয়াম জে. গেনরের নীতিও ছিল এই । সস্তা কুরুচিকর খবর কাগজগুলো তার পিছনে লেগেছিল আর এক উম্মাদ তাকে গুলিও করে, তিনি প্রায় তাতে মরতে বসেছিলেন। হাসপাতালে চিকিৎসার সময় তিনি বলেন : প্রত্যেক রাতেই আমি সবকিছু আর সবাইকে ক্ষমা করি। একি অতিরিক্ত আদর্শবাদ? অতিরিক্ত মিষ্টি কথা? তাই যদি হয় তাহলে আসুন বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক সোপেনহাওয়ারের কথা শুনি। স্টাডিস ইন পেসিমিজম, তার রচনা। জীবন তার কাছে দুঃখ আর হতাশায় ভরা ছিল । দুঃখ আর হাহাকারে মথিত অবস্থায় থেকেও তিনি বলেছিলেন : যদি সম্ভব হয় কারও প্রতি শত্রুতা থাকা উচিত নয়।
আমি একবার ছ’জন প্রেসিডেন্ট–উইলসন, হার্ডিং, বুলিজ, হুভার, রুজভেল্ট আর টুম্যানের বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা বার্নার্ড বারুচকে প্রশ্ন করি তার শত্রুদের আক্রমণে তিনি কিছু মনে করেন কি না। তিনি জবাব দেন কেউই আমায় খারাপ লাগাতে বা ছোট করতে পারে না, তাদের করতেই দিই না।
আমি বা আপনি অন্যকে সুযোগ না দিলে তারা কেউই আমাদের ছোট করতে পারবে না। লাঠি আর পাথরে আমার হাড় ভাঙতে পারে কিন্তু কথাকে আমি ভয় পাই না।
যুগ যুগ ধরে মানুষ খ্রীষ্টের মত মানুষের উপাসনা করেছে যিনি কখনও শত্রুকে ঘৃণা করেন নি । আমি বহুবার কানাডার জ্যাসপার ন্যাশনাল পার্কে দাঁড়িয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা পর্বতের দিকে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়েছি। ওই পর্বত ব্রিটিশ নার্স এডিথ ক্যাডেলের নামে নামাঙ্কিত–যিনি ১৯১৫ সালের ১২ই অক্টোবর সন্যাসিনীর মতই জার্মান ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে মৃত্যু বরণ করেন। তার অপরাধ? তিনি গোপনে বহু আহত ফরাসী আর ইংরেজ সৈন্যকে তার বেলজিয়ামের বাড়িতে রেখে সেবা করেন আর তাদের হল্যান্ডে পালাতে সাহায্য করেন। একজন ইংরেজ পাদ্রী যখন তার মৃত্যুর আগে তার ব্রাসেলসের কারাগারে দেখা করতে আসেন এডিথ ক্যাডেল দুটি কথা বলেছিলেন, আর তা ব্রোঞ্চ গ্রানাইট পাথরে তার মূর্তির কাছে। খোদাই করে রাখা আছে : আমি বুঝতে পারছি শুধু স্বদেশপ্রেমই সব নয়। কারও প্রতিই আমার তিক্ততা বা ঘৃণা নেই। চারবছর পরে তার মৃতদেহ ইংল্যান্ডে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং ওয়েস্টমিনষ্টার অ্যাবিতে তার স্মৃতিসভা হয়। একবার লন্ডনে এক বছর কাটানোর সময় এডিথ ক্যাডেলের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে তার বাণী পড়েছিলাম।
.
শত্রুদের ক্ষমা করা আর ভুলতে পারার একটা পথ হল, আমাদের সব চাইতেও বড় কিছু করায় শপথ গ্রহণ করা। তাহলে আমরা অপমান ও শত্রুতার কথা ভুলে যাব আর আমাদের কাজই আমাদের কাছে বড় হয়ে উঠবে। উদাহরণ হিসেবে ১৯১৮ সালের মিসিসিপির পাইনের বনে যে নাটকীয় ঘটনার জন্য নেয় সেটাই দেখা যাক। বিনা বিচারে মৃত্যুদন্ড দান বা ঘৃণ্য লিঞ্চিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছিল একজন.. লরেন্স জোন্স নামে একজন কালা আদমী, যিনি একজন শিক্ষক ও পাদী, তাকেই লিগ সকাল হচ্ছিল। কয়েক বছর আগে লরেন্স জোন্স পাইনী উড কান্ট্রি স্কুল স্থাপন করেন। এ ঘটনাটা ঘটে নন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আবেগময় দিনগুলোয়। একটা গুজব রটে যায় যে জার্মানরা নিগোদের উত্তেজিত করে বিদ্রোহে প্ররোচিত করছে। যাকে লিঞ্চ করা হচ্ছিল সেই লরেন্স জোন্স একজন নিগ্রো, সন্দেহ করা হচ্ছিল তিনি নিগ্রোদের প্ররোচিত করছেন। একদল সাদা মানুষ–চার্চের সামনে জমায়েত হয়ে লরেন্স জোন্সকে কিছু লোকের সামনে এই বক্তৃতা করতে শোনে : জীবন হল একটা লড়াই আর প্রত্যেক নিগ্রোকে বেঁচে থাকতে গেলে অস্ত্র নিয়ে লড়াই করে জয়লাভ করতে হবে।
লড়াই! অস্ত্র! এই কথাগুলো যুবকদের খেপিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। তারা তাই একজোট হয়ে রইলো, পাদ্রী গির্জায় ফিরে এলে তার গলায় একটা দড়ি পরিয়ে এক মাইল দূরে টেনে নিয়ে এক রাশ। শুকনো কাঠের উপর দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর তারা সবাই ঠিক করল তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে আর সেই সঙ্গে আগুনেও পোড়ানো হবে। ঠিক তখনই একজন চেঁচিয়ে বললো, পোড়ানোর আগে ঘ্যানর ঘ্যানর মশাইর কাছ থেকে কিছু শোনা যাক। বল! কিছু বল! লরেন্স জোন্স কাঠের গাদার উপর দাঁড়িয়ে গলায় সেই দড়ি নিয়ে তাঁর জীবন আর আদর্শের কথা শুনিয়ে গেলেন। তিনি ১৯০৭ সালে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। তার সুন্দর চরিত্র, তার জ্ঞান, সঙ্গীতে দক্ষতা ইত্যাদির ফলে তিনি ছাত্র আর অধ্যাপক সকলের কাছেই জনপ্রিয় হন। স্নাতক হওয়ার পর তিনি একজন হোটেল মালিকের সঙ্গে ব্যবসার আমন্ত্রণ আর সঙ্গীত শিক্ষার জন্য অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। কেন? কারণ তিনি এক আদর্শের পূজারী ছিলেন। বুকার টি,ওয়াশিংটনের জীবনী পাঠ করে তিনি ভেবেছিলেন দারিদ্র পীড়িত, অশিক্ষিত নিগ্রো জাতের মানুষের সেবায় তার জীবন নিয়োজিত করতে চান। তাই তিনি দক্ষিণের সবচেয়ে অনগ্রসর অংশ–জ্যাকসন থেকে পঁচিশ মাইল দক্ষিণে মিসিসিপিতে চলে যান। মাত্র পৌনে দু ডলারে তার ঘড়িটি বাধা দিয়ে তিনি জঙ্গলের মধ্যে এক খোলা জায়গায় তার স্কুল খোলেন। লরেন্স জোন্স কুদ্ধ জনতাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, গরীব ছাত্রদের শিক্ষিত করে তুলতে কি অমানুষিক পরিশ্রমই না তিনি করেছেন। তিনি তাঁদের একথাও জানান পাইনী উড কান্ট্রি স্কুল খোলার জন্য কোন কোন সাদা মানুষরা তাঁকে জমি, কাঠ, শুয়োর, গরু আর টাকা দেন।
