এটাই প্রকৃতির একটা অমোঘ সত্য যা আমাদের জীবনে অলৌকিক কাণ্ড ঘটাতে পারে। আমি ক্যালিফোর্নিয়ার এক মহিলাকে জানি–অবশ্য তাঁর নাম করব না–তিনি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই সুখী হতে পারতেন শুধু যদি এই কৌশলটা জানতেন। মহিলাটি বৃদ্ধা আর বিধবা, স্বীকার করতেই হবে ব্যাপারটা খুবই দুঃখের। তবে তিনি কি সুখী হওয়ার চেষ্টা করেছেন? উত্তর হল ‘না’ তাঁকে যদি প্রশ্ন করা হয় তিনি উত্তর দেন, ওহ্, আমি ঠিক আছি–তবে তাঁর মুখভাব আর কণ্ঠস্বরই বলে দেবে কথাটা ঠিক নয় যেহেতু মনে হবে তিনি বলছেন, ওঃ ঈশ্বর, যদি জানতেন কত কষ্ট না আমি পেয়েছি। মনে হয় তাঁর সামনে সুখী থাকায় যেন আপত্তি আছে।
অনেক মেয়েই তাঁর চেয়ে কষ্টে আছে, তাঁর স্বামী তার জন্য বীমার যে টাকা রেখে গেছেন তাতে তার অভাব নেই। তার বিবাহিত ছেলেমেয়েরা আছে সেখানে তিনি থাকতে পারেন। তবে আমি কখনই তাকে হাসতে দেখিনি; তিনি সব সময় অভিযোগ করেন তার জামাইরা কৃপণ আর স্বার্থপর–অথচ তিনি তাদের বাড়িতে মাসের পর মাস কাটিয়েছেন। তিনি আরও বলেন মেয়েরা তাকে কোন উপহারই দেয় না–অথচ তিনি নিজে এক পয়সা খরচ করেন না, নিজের জন্য সব টাকা জমিয়ে রাখেন। তিনি তার পরিবারকে এইভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছেন।
কিন্তু এরকম হওয়ার কোন প্রয়োজন ছিলো? সেটাই হল দুঃখের কথা–তিনি ইচ্ছে করলেই অসুখী থেকে সুখী হতে পারতেন–নিজেকে তিনি হতভাগিনী তিক্ততা মাখা এক অসখী স্ত্রীলোক তা আদরণীয়, প্রিয় একজন হতে পারতেন। এটা না করে নিজের অসুখী জীবনের দিকে সর্বদা মত । মোটেও কেউ সুখী হতে পারে না ।
আমি ইন্ডিয়ানাতে একজনকে জানতাম, নাম এইচ জে. ইঙ্গলার্ট, তিনি আজও বেঁচে আছেন তিনি এই রহস্য আবিষ্কার করতে পেরেছেন। দশ বছর আগে তার স্কারলেট ফিভার হয়। তা থেকে সেরে ওঠার পরেই তিনি আক্রান্ত হন মূত্রাশয়ের প্রদাহে। সব রকম ডাক্তার দেখালেন ইঙ্গলার্ট এমনকি হাতুড়েদেরও। কিন্তু কিছুতেই তাঁর রোগ সারলো না; তারপর কিছুকাল পরেই নতুন উপদ্রব সুরু হল। তার রক্তচাপ বেড়ে গেল। তিনি এক ডাক্তারের কাছে দেখাতেই শুনলেন রক্তচাপ ২১৪। তাকে বলা হল এটা মারাত্মক–সেটা বেড়েই চলছে অতএব ভবিষ্যতের সব কিছু ঠিকঠাক করে ফেলা উচিত।
ভদলোক বলেন, আমি বাড়ি চলে গেলাম, আর দেখতে চাইলাম বীমা কোম্পানির টাকা মেটানো আছে কিনা। তারপর বিধাতার কাছে ক্ষমা চাইলাম আমার সব ত্রুটির জন্য এবং মনখারাপ করা হল তলিয়ে গেলাম। আমি এবার সকলকেই অসুখী বানিয়ে ছাড়লাম । আমার স্ত্রী আর পরিবারের সবাই ভারি অসুখী করে তুলোম এবং নিজে হতাশায় ডুবলাম। যাইহোক এক সপ্তাহ ধরে আনিগতের সহ নিজেকে বললাম : তুমি বোকার মতই কাজ করছ। হয়তো আগামী এক বছরেও তোমার মত হবে, অতএব আবার সুখী হতে চেষ্টা করছ না কেন?
আমি তাই সটান হেলান দিয়ে বসে হাসি মাখানো মুখে এমন ভাব করতে চাইলাম যেন সবই স্বাভাবিক। স্বীকার করছি ব্যাপারটা গোড়ায় তেমন সহজ হয়নি–তবে চেষ্টা করে খশির ভারস রাখলাম আর তাতে যে আমার পরিবারকেই খুশি করলাম তাই নয় আমারও ভালো হল ।
প্রথমতঃ আমি ভলো বোধ করতে আরম্ভ করলাম–যা ভাবতাম সেই রকমই। ক্রমেই ভালো হয়েও উঠলাম। আর আজ? আজ যখন আমার কবরে থাকার কথা তারও কয়েক মাস পরে শুধু যে সুখী তাই নই। বেশ ভালো ভাবেই বেঁচে আছি, আমার রক্তের চাপও স্বাভাবিক! একটা জিনিস আমি নিশ্চিত জানি, ডাক্তারের ভবিষ্যতবাণীই ঠিক হত যদি মৃত্যুর ওই চিন্তা করতাম। কিন্তু আমি আমার শরীরকে সেরে ওঠার সুযোগ দিই আর সেটা হল মানসিক অবস্থার পরিবর্তন!
আনন্দের একটা প্রশ্ন করি আসুন : যদি আনন্দের ভান আর সত্যিকার সুস্বাস্থ্যের কথা ভাবলে এবং মনে সাহস আনলে একজনের জীবন রক্ষা করতে পারেন, তাহলে আমি বা আপনি ছোটখাটো দুঃখ আর মন খারাপের কথা ভাববো কেন? কেন আমদের চারপাশের সবাইকে অসুখী করব? অথচ কেবল হাসিখুশি থাকলেই তাদেরও ভালো করা যায়।
বহু বছর আগে একটা ছোট্ট বই পড়েছিলাম বইখানা আমার জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। বইটার নাম মানুষ যেরকম ভাবে। লেখক জেমস অ্যালেন। তাতে কি ছিল বলছি।
একজন মানুষ যখন কোন লোক বা জিনিস সম্পর্কে তার চিন্তাধারা বদল করে, অন্য লোক আর জিনিসও তেমনি বদলে যায় । …একজন লোককে তার চিন্তাধারা বদলাতে দিন তাহলে অবাক হয়ে দেখবেন যে তার জীবনের বাস্তব অবস্থারও পরিবর্তন ঘটছে। যে ঈশ্বর আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি আমাদেরই মধ্যে। এ আমরা নিজেরাই …মানুষ যা করে তাহল তার নিজের চিন্তারই ফসল…কোন মানুষের উন্নতি, জয়লাভ আর সবই তার নিজের চিন্তাতেই হয়। যখনই যে দুর্বল, আর দুঃখে ভারাক্রান্ত হবে তখনই চিন্তার উন্নয়ন সে ছেড়ে দেয়।
বাইবেলের প্রথম পরিচ্ছেদ অনুসারে ঈশ্বর মানুষকে দুনিয়ার অধীশ্বর বানিয়ে ছিলেন। এ এক মহান উপহার । কিন্তু এরকম রাজকীয় উপহার আমি চাই না। আমি যা চাই তা হল নিজের উপর অধিকার–আমার চিন্তার অধীশ্বর হতে, ভয় জয় করতে, আমার মন আর চিন্তার উপর প্রভুত্ব করতে । আমি এও জানি একাজ আমার পক্ষে সম্ভব–ইচ্ছে করলেই আমি আমার মনের অধীশ্বর হতে পারি।
অতএব আসুন উইলিয়াম জেমসের এই কথাগুলো মনে গেঁথে রাখি :
