আমার ছাত্রটির অভিজ্ঞতা এই রকমই ছিল।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের জীবন যাপন থেকে মানসিক আর অন্য যে আনন্দ পাই তা আমাদের অবস্থার উপর নির্ভর করে না। অথবা আমাদের কি আছে তার উপরও না। বরং সম্পূর্ণ নির্ভর করে আমাদের মানসিক অবস্থার উপর । বাইরের অবস্থার এর উপর হাত নেই উদাহরণ হিসেবে জন ব্রাউনের কথাটাই ধরুন। জন ব্রাউনকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রশস্ত্রের গুদামে লুঠ আর ক্রীতদাসের বিদ্রোহে প্ররোচিত করার জন্য ফাঁসি দেওয়া হয়। তিনি তার কফিনের উপর বসে বধ্যভূমিতে যান। যে জেলার তার সঙ্গে ছিলেন তিনি বেশ দুশ্চিন্তায় পড়লেও জন ব্রাউন বেশ শান্ত সমাহিত ছিলেন। তিনি ভার্জিনিয়ার বুরিজ পাহাড় লক্ষ্য করে বলে ওঠেন : আহা কি সুন্দর দৃশ্য! এমন সুন্দর দেশটা ভালো করে দেখার সুযোগ হলো না।
এবার রবার্ট ফ্যালকন স্কট আর তার সঙ্গীদের কথাই ধরুন–তিনিই ছিলেন ইংরেজদের সর্বপ্রথম দক্ষিণ মেরু অভিযানকারী। তাদের দেশে প্রত্যাবর্তনের কাজই বোধ হয় মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ভ্রমণ। কোন খাদ্য ছিলো না–জ্বালানীও ছিলো না। দিনরাত সমানে এগারো দিন ধরে প্রচণ্ড তুষার ঝড় চলেছিল তাই হাঁটাও ছিল অসম্ভব। এমন ভয়ানক জোরে বাতাস বইছিল যে তুষারের বুক কেটে গর্ত হয়ে যাচ্ছিল। স্কট আর বন্ধুরা বুঝতে পেরেছিলেন তাদের মৃত্যু আসন্ন । এরকম কোন ভয়ংকর অবস্থার মুখোমুখি হতে পারে ভেবেই তারা সঙ্গে খানিকটা আফিম এনেছিলেন। একটু বেশি খেলেই তারা ঘুমিয়ে সুখের স্বপ্নে বিভোর হবেন আর কোনদিন জাগতে হবে না। কিন্তু তারা আফিম না খেয়ে আনন্দের গান গাইতে গাইতে মৃত্যু বরণ করেছিলেন। একথা যে সত্য তা আমরা জেনেছি। কারণ প্রায় আটমাস পরে একদল উদ্ধারকারী তাদের বরফে জমাট বাঁধা মৃতদেহের কাছে তাদের বিদায়কালীন একটা চিঠি আবিষ্কার করেন।
হ্যাঁ, আমরা যদি গঠনমূলক চিন্তা আর সাহস এবং শান্তির কথা ভাবতে পারি তাহলে কফিনে বসেও পারিপার্শ্বিক দৃশ্য উপভোগ করতে পারি! পারি বধ্যভূমিতে হাসি মুখে পৌঁছতে বা আনন্দের গান গেয়ে মৃত্যুকেও জয় করতে পারি।
কবি মিল্টনও এটা তাঁর অন্ধত্বের মধ্য দিয়ে তিনশ বছর আগে আবিষ্কার করেছিলেন:
মানুষের মন একই জায়গায় থাকে।
এই মনই স্বৰ্গকে নরক আর নরককে স্বর্গ করে তোলে।
নেপোলিয়ান আর হেলেন কেলারই মিল্টনের কথার সত্যতা প্রমাণ করতে পারে। মানুষ যা চায় তার সবই ছিল নেপোলিয়ানের–সম্মান, ক্ষমতা, সম্পদ–তা সত্ত্বেও তিনি সেন্ট হেলেনায় বলেন, জীবনে ছটা দিনও সখে কাটাই নি। অন্যদিকে অন্ধ, বাকশক্তিহীন, বধির হেলেন কেলার বলেছিলেন : জীবনে আমার কাছে এত সুন্দর।
পঞ্চাশ বছরের জীবনে আমি যদি কিছু শিখে থাকি তাহলো, আপনি নিজে ছাড়া কেউ শান্তি আনতে পারে না।
আত্মনির্ভরতা নামে একটি প্রবন্ধের শেষে এমার্সন যা বলেছিলেন সেই কথাটাই আপনাদের শোনাতে চাই। কথাটা এই : রাজনৈতিক জয়, ভাড়া বৃদ্ধি, রোগমুক্তি বা আপনার হারানো বন্ধুর প্রত্যাবর্তন বা অন্য যে সব জিনিস আপনাকে খুশি করে, তাতে ভাবেন সুদিন আসছে। এটা কিন্তু বিশ্বাস করবেন না, কারণ কখনই তা হয় না। আপনি নিজে ছাড়া কেউ আপনাকে শান্তি এনে দিতে পারবে না।
বিখ্যাত উদাসী দার্শনিক এপিকটেটাস সকলকে সতর্ক করে বলেছিলেন, আমাদের উচিত দেহ থেকে টিউমার বা পুঁজ বের করে দেওয়ার চেয়ে বদ চিন্তা তাড়ানো অনেক বেশী প্রয়োজনীয়।
.
এপিকটেটাস কথাটা বলেছিলেন উনিশশো বছর আগে, তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান তার কথাই সমর্থন করে। ড. জি. ক্যানরি রবিনসন বলেন জন্স হপকিন্স হাসপাতালে যেসব রোগী আগে তাদের পাঁচজনের মধ্যে চারজনই আবেগজনিত রোগের শিকার। এমনকি শরীরের নানা বিকলনেরও মূল এটাই। তিনি বলেছেন যে জীবনের পথে চলতে গিয়ে নানা সমস্যা থেকেই এই সব রোগ আসে। বিখ্যাত ফরাসী দার্শনিক মতেইনের কথা হল : যা ঘটে তাতে মানুষ যতটা না আঘাত পায়, তার চেয়ে বেশী আঘাত পায় সেই ঘটনা সম্পর্কে তার অভিমতের ফলে। আর সেই মতামত নির্ভর করে আমাদের নিজেদেরই উপরে।
দুশ্চিন্তামুক্ত নতুন জীবন কি বলতে চাই জানেন? আমার কি এমন ধৃষ্টতা যে আপনার মুখের উপর বলছি যে আপনার দুঃখ কষ্টের পরিসীমা নেই আর তা সত্বেও এর পরিবর্তন সম্ভব? হ্যাঁ, আসলে তাই বলতে চাই। আর সেটাই সব নয়। আমি সেটা কেমন করে করা যায় দেখাচ্ছি। এতে একটু চেষ্টার দরকার হলেও ব্যাপারটা খুবই সহজ। ব্যবহারিক মনস্তত্বের বিখ্যাত পণ্ডিত উইলিয়াম জেমস একবার বলেন : মনে হতে পারে মানুষ অনুভূতির ফলেই কাজ করে। আসলে কিন্তু দুটোই একসঙ্গে চলে। কাজকে যদি মন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত করা যায়–যা করা সম্ভব, আমরা পরোক্ষভাবে অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারি।
অন্যকথায় বললে উইলিয়াম জেমস বলেছেন যে আচমকা আমরা আমাদের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না–তবে আমাদের কার্যধারা বদল করতে পারি। আর যখনই কার্যধারা বদল করব তখনই আমাদের অনুভূতিও বদলাতে পারি।
.
এই সহজ কৌশল কি ফলপ্রদ? নিজেই চেষ্টা করুন না । মুখে সত্যিকার একটা হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করুন, তারপর হেলান দিয়ে বসে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে এক কলি আনন্দের গান গাইতে থাকুন । যদি গাইতে না পারেন তবে শিস দিন। যদি শিস না দিতে পারেন গুনগুন করুন। উইলিয়াম জেমস ঠিকই বলেছিলেন, আপনি দেখবেন যে এইরকম খুশির সুর ভাজতে থাকলে মন খারাপ করে থাকা একেবারেই অসম্ভব।
