উদাহরণ হিসেবে আমার এক ছাত্রের জীবনের কথাই বলছি, কিভাবে এই চিন্তার শক্তি কি রকম অবিশ্বাস্য পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ছাত্রটির স্নায়ু ভেঙ্গে পড়েছিল। এটা হলো কেন? দুশ্চিন্তার জন্য । ছাত্রটি আমাকে বলেছিল, সব ব্যাপারেই আমার দুশ্চিন্তা হত আমি রোগা বলে দুশ্চিন্তা হত, দুশ্চিন্তা হত টাক পড়েছে বলে, ভয় পেতাম বিয়ে কারা জন্য যথেষ্ট টাকা আয় করতে পারব না, ভালো বাবা হতে পারব না, দুশ্চিন্তা করতাম ভালভাবে জীবন কাটাচ্ছিনা, যাকে বিয়ে করতে চাই সেই মেয়েটিকে হারাতে চলেছি। আমার দুশ্চিন্তা হত অন্য লোকেরা আমার প্রতি কিরকম ধারণা গ্রহণ করছে। দুশ্চিন্তা করতাম আমার পেটে আলসার হয়েছে। আমি আর কাজ করতে পারলাম না, আমি চাকরি ছেড়ে দিলাম। আমার মধ্যে এসব দুশ্চিন্তা একেবারে বয়লারের মত টগবগ করে ফুটতে চাইতো। কিন্তু সেই দুশ্চিন্তা দমনে কোন সেফটি ভাল্ব ছিল না। এতে এমনই চাপ বেড়ে গেল যে একটা কিছু ঘটে যাবে বলে মনে হল–আর হলও তাই। আপনাদের কখনও যদি স্নায়ু ভেঙ্গে না পড়ে থাকে, ঈশ্বর করুণ কখনও যেন তা না হয়। কারণ শরীরের কোন যন্ত্রণা যন্ত্রণাকাতর মনের তুলনায় কিছুই না।
আমার ওই ভেঙে পড়া অবস্থা এমনই হল যে আমার পরিবারের লোকজনের সঙ্গেও কথা বলতে পারতাম না। আমার চিন্তাধারায় কোন লাগাম ছিলো না। একরাশ ভয়ই আমায় চেপে ধরেছিল। সামান্য শব্দেই আমি চমকে উঠতাম। প্রত্যেককেই আমি এড়িয়ে চলতাম। কোন বিশেষ কারণ না থাকলেও চিৎকার করে কেঁদে উঠতাম।
আমার প্রতিটা দিনই ওই যন্ত্রণায় কাটতে লাগল। আমার মনে হতে লাগলো সবাই আমাকে ত্যাগ করে যাচ্ছে–এমনকি ঈশ্বরও। নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন শেষ করে দেবার কথাও ভেবেছিলাম।
এর বদলে ফ্লোরিডায় বেড়াতে যাব ঠিক করলাম–ভাবলাম নতুন জায়গায় গেলে ভালো হবে । ট্রেনে ওঠার সময় বাবা আমার হাতে একখানা চিটি দিয়ে বললেন ফ্লোরিডায় পৌঁছানোর আগে যেন চিঠিটা খুলি। সেই সময় ছুটি কাটানোর জন্য ফ্লোরিডায় প্রচুর জনসমাগম হয়। হোটেলে জায়গা না পেয়ে একটা গ্যারেজে আশ্রয় নিলাম। মিয়ামির উপকূলে একটা মালবাহী জাহাজে চাকরি জোগাড়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম । তাই সমুদ্র তীরেই সময় কাটাতে লাগলাম। দেখলাম বাড়িতে যা ছিলাম তার চেয়ে খারাপ সময় কাটতে লাগলো, তাই চিঠিটা খুলে দেখতে চাইলাম বাবা কি লিখেছেন। তিনি লিখেছিলেন : ‘প্রিয় বক্স, তুমি এখন বাড়ি থেকে ১৫০০ মাইল দুরে আর কোন তফাৎ বুঝতে পারছো কি? আমি জানি তা পারছে না। কারণ আমি জানি তুমি তোমার সঙ্গে নিয়ে গেছে এমন কিছু যা সব গোলমালের মূল–আর তা হল তুমি নিজে! তোমার শরীর বা মনে আসলে কিছুই হয়নি। পারিপার্শ্বিকতা তোমায় শাস্তি দিচ্ছে না। বরং তুমি যা ভাবছো তাই দিচ্ছে। মানুষ হৃদয়ে যা চিন্তা করে, সে নিজে হল তাই। এটা যখন বুঝতে পারবে, বৎস, তখনই বাড়ি ফিরে এস, কারণ তুমি তখন সেরে যাবে।
বাবার চিঠিতে বেশ রাগ হল। আমি সহানুভূতি চাই, উপদেশ নয় । আমার এমন পাগলের মত রাগ হল যে ঠিক করলাম আর কখনও বাড়ি ফিরব না। ওই রাত্তিরে যখন মিয়ামির উপকূলের রাস্তায় হাঁটছিলাম তখন এক গির্জার পাশে এসে শুনলাম সেখানে সান্ধ্য প্রার্থনার অনুষ্ঠান চলছে। কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় ভিতরে ঢুকে প্রার্থনা শুনতে চাইলাম। তখন বলা হচ্ছিলো : যে তার নিজের ইচ্ছাকে জয় করতে সক্ষ সে একজন শহর বিজয়ী সৈনিকের চেয়েও শক্তিমান। ঈশ্বর উপাসনা গৃহের পবিত্র এলাকায় যে কথা শুনলাম আমার বাবাও তো তাই লিখেছেন–এ সমস্ত মিলে আমার মস্তিষ্কের সব ময়লা বেরিয়ে গেলো। জীবনে এই প্রথম পরিষ্কার আর বুদ্ধিমানের মত চিন্তা করতে পারলাম। বুঝতে পারলাম কত মূর্খ আমি । নিজেকে সঠিকভাবে চিনতে পেরে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমি এখানে বসে সারা পৃথিবীর আর সবাইকে বদলে ফেলার চেষ্টা করছি অথচ যা দরকার তা হল আমার মনের ক্যামেরার লেন্সটাই বদলে ফেলা।
পরের দিনই মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি রওয়ানা হলাম। এক সপ্তাহ পরেই কাজে যোগ দিলাম। চার মাস পরে যে মেয়েটিকে হারাতে বসেছি ভেবে ছিলাম তাকেই বিয়ে করলাম। আমাদের এখন পাঁচটি সন্তান নিয়ে সুখের সংসার। ঈশ্বর আমার বাস্তাবে আর মানসিক দিক থেকে সুখী করেছেন। স্নায়ু ভেঙে পড়ার সময় আঠারো জনের শিফটে রাতের ফোরম্যান হিসেবে কাজ করতাম। আজ আমি সাড়ে চারশ লোকের এক কার্টন তৈরির কারখানার সুপারিন্টে ডেন্ট! আজ আমার জীবন বহু বান্ধব নিয়ে পরিপূর্ণ । আমার বিশ্বাস জীবনের পরিপূর্ণতা আমি টের পেয়েছি। যখন কোন অস্বস্তিকর অবস্থা আসে (যা প্রত্যেকের জীবনে আসে) তখন নিজেকে বলি ক্যামেরার লেন্সটা অতীতের দিকে ঘুরিয়ে দিতে। তাতেই সব ঠিক হয়ে যায়।
সত্যিই বলতে চাই আমার স্নায়ু ভেঙে পড়ার জন্য আমি খুশি, কারণ আমি বেশ কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে বুঝেছি চিন্তা আমাদের মনের আর শরীরের উপর কি রকম প্রভাব বিস্তার করে। এখন আমি আমার চিন্তাকে মনের বিরুদ্ধে না গিয়ে স্বপক্ষে আনাতে পারি। এখন বুঝতে পারছি বাবা ঠিকই বলেছিলেন বাইরের অবস্থা আমার যন্ত্রণার কারণ ছিলো না। সেই অবস্থা নিয়ে আমি যা ভেবেছিলাম তাই দুর্দশার কারণ। সেটা বুঝতে পারলাম যখন তখনই আমার সব রোগ সেরে গেল আর আমিও ঠিক রইলাম।
