আমি একবার সিং সিং কারাগারে কয়েদীদের দেখতে যাই। সেখানে গিয়ে আমি অবাক হয়ে দেখেছিলাম সেখানকার কয়েদীরা বাইরের সাধারণ মানুষের মত সুখী । আমি কথাটা ওখানকার ওয়ার্ডেন লুইস ই লসকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, কয়েদীরা যখন প্রথম সিং সিং এ আসে তারা স্বভাবতই ভেঙে পড়ে আর দুঃখিত বোধ করে। কিন্তু কয়েক মাস পরে ওদের মধ্যে বুদ্ধিমান যারা তারা নিজেদের দুর্ভাগ্যের কথা ভুলে গিয়ে শান্তভাবে জেলখানার জীবন যাপন মেনে নেয়। ওয়ার্ডেন লুইস লস আমাকে বলেছিলেন একজন কয়েদী জেলখানার মধ্যেই গান গাইতে গাইতে চাষ বাস করত।
যে কয়েদীটি ফুলের বাগান তৈরি করত আর গান গাইত আমাদের অনেকের চাইতেই তার বুদ্ধি বেশি ছিল। সে জানতো–
চলমান অঙ্গুলি যে লিখে চলে দ্রুত
লেখা হলে থামেনা সে, ভাবেনা সতত,
যা কিছু হলো লেখা মোছেনা তখনও
শত অশ্রুজল তাতে পারেনা কখনও।
তাই অশ্রুজল ফেলে লাভ কি? আমরা নিশ্চয়ই ভুল করেছি–অবিশ্বাস্য কাজও করেছি। কিন্তু তাতে হলো কি? এরকম কে না করে? নেপোলিয়ানও একদিন তার করা সমস্ত বড় যুদ্ধের এক তৃতীয়াংশ হেরে যান। সম্ভবতঃ আমাদের গড়পড়তা কাজ নেপোলিয়ানের চেয়ে খারাপ নয়, কে বলতে পারে?
আর যাই হোক রাজার সমস্ত ঘোড়া আর সৈন্য অতীতকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। অতএব আসুন ৭ নম্বর নিয়মটা মনে রাখি :
করাত দিয়ে কাঠের গুঁড়ো কাটতে চাইবেন না।
১২. যে শব্দ কটি আপনার জীবনের মোড় ফেরাতে পারে
ক’বছর আগে এক বেতার অনুষ্ঠানে আমাকে এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে বলা হয় : জীবনে সবচেয়ে বড় কোন্ শিক্ষা লাভ করেছেন আপনি?
ব্যাপারটা বলা নেহাতই ছিল সহজ ছিল। সবচেয়ে বড় যা শিখেছি তা হল আমরা যা চিন্তা করি তার গুরুত্ব। আমি যদি জানি আপনার চিন্তাধারা কেমন তাহলে বুঝতে পারব আপনি কেমন ধরণের মানুষ। আমাদের মানসিক পরিস্থিতির উপরই আমাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। আমরা কি, সেটা আমাদের চিন্তার উপরেই নির্ভরশীল। এমার্সন বলেছেন : একজন মানুষ সারাদিন যা চিন্তা করে সে হল তাই…. সত্যিই, তার পক্ষে অন্যরকম হওয়া কিভাবে সম্ভব?
আমি দৃঢ়ভাবেই জানি এবং সন্দেহাতীত ভাবেই আমার বা আপনার বড় সমস্যা হল–আসলে একমাত্র সমস্যাই– সঠিক কোন চিন্তা করব। এটা যদি করতে পারি তাহলে আমাদের সব সমস্যাই মিটিয়ে ফেলতে পারি । যে বিখ্যাত দার্শনিক এককালে রোম সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন সেই মারকাস অরেলিয়াস কটি কথায় ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন–যে কটি কথা আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে : আমাদের চিন্তার মধ্যেই আছে আমাদের জীবন।
হ্যাঁ তাই। যেমন ভালো চিন্তায় আমরা সুখী হই। দুঃখের চিন্তা করলেই দুঃখীই হতে হয়। ভয়ের চিন্তা করলে ভয় পেতে হয়, অসুখের চিন্তায় হতে হয় অসুস্থ। ব্যর্থতার চিন্তায় নামে ব্যর্থতা। পরাজয়ের ভাবনা থাকলে সবাই পরাজিতই ভাবতে চাইবে। নর্মান ভিনসেন্ট পীল বলেছিলেন : আপনি নিজেকে যা ভাবেন আপনি তা নন, আপনি নিজে যা ভাবেন আপনি তাই।
সমস্ত সমস্যা এভাবেই দেখা উচিত বলছি কি? না, জীবনের সব কিছু এরকম সহজ সরল কখনই নয়। আসলে আমি বলতে চাই জীবনের সব কিছুতে নঙর্থক ভাব না নিয়ে চলাই উচিত; আমার কথা হলো জীবনের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা দরকার তবে দুশ্চিন্তা নয়। তাহলে ভাবনা আর দুশ্চিন্তার মধ্যে তফাৎ কি? একটা ব্যাখ্যা দেওয়া যাক। যখনই আমি নিউয়র্কের প্রচুর গাড়ি চলা রাস্তায় চলি তখন আমি চিন্তা করি–কিন্তু দুশ্চিন্তা করি না। চিন্তা হল সমস্যা কি সে বিষয়ে ঠাণ্ডা মাথায় তার সমাধানে চেষ্টা করা–দুশ্চিন্তা হল পাগলের মত ভেবে ঘুরপাক খাওয়া।
কোন মানুষ তার মারাত্মক সমস্যা নিয়ে একই সঙ্গে চিন্তা করতে পারে আবার কোটের বোতামঘরে লাল ফুলও লাগাতে পারে : আমি লাওয়ের টমাসকে ঠিক তাই করতে দেখেছি। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় তিনি যখন অ্যালেনবি–লরেন্সের ছবি দেখাচ্ছিলেন তখন সৌভাগ্যবশতঃ আমি তার সঙ্গে ছিলাম। তিনি ও তার বন্ধু অন্ততঃ ছটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ছবি তুলে আনেন। এসবের মধ্যে সব সেরা ছবি ছিল টি ই লরেন্সের এবং তার ঝকমকে বিচিত্র আরবীয় বাহিনীর চিত্র । তাছাড়াও ছিল অ্যালেনবীর পবিত্র ভূমি জয় করারও ছবি। তার অ্যালেনবি আর লরেন্স সম্পর্কিত ছবি ও বক্তৃতা লন্ডনকে চমকিত করেছিল। তাছাড়া সারা বিশ্বেও তার নাম হয়েছিল। কভেন্ট অপেরায় তিনি যাতে ওই সব অ্যাডভেঞ্চারের কথা শোনাতে পারেন এবং ছবি দেখাতে পারেন সেজন্য অপেরা ছ’ সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা হয়। এরপর তিনি সারা বিশ্ব পরিক্রমা করেন। এরপর অবিশ্বাস্য দুর্ভাগ্যের পর তিনি লন্ডনে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। আমি সে সময় তাঁর সঙ্গে ছিলাম। আমার মনে আছে আমাদের সস্তার রেস্তোরাঁয় খেতে হত। আর সে খাওয়াও জুটতো না। যদি মিঃ টমাস একজন স্কচের কাছ থেকে টাকা না ধার করতেন। ঐ ভদ্রলোক ছিলেন বিখ্যাত শিল্পী জেমস ম্যাকবে। এ কাহিনীর সারবস্তু হল এই : লাওয়েল টমাসের যখন বিরাট দেনা আর শুধু হতাশায় ভরা জীবন তখনও তিনি চিন্তা করলেও–দুশ্চিন্তা করেন নি। তিনি জানতেন এই বিপর্যয়ে যদি ভেঙে পড়েন তাহলে কেউ তাকে মূল্য দেবেনা আর ধারও পাবেন না। তাই একটা ফুল বুকে খুঁজে তিনি মাথা উঁচু করে অক্সফোর্ড স্ট্রীট ধরে হেঁটে যেতেন। তিনি নানা সাহসের কথা ভাবতেন আর পরাজয় স্বীকার করতেন না। তার বিশ্বাস ছিল বড় হতে গেলে ছোট হতে হয়। এটা প্রয়োজনীয় আমাদের দৈহিক শক্তির উপর এই মানসিক ভাব অদ্ভুত রকম কাজ করে। বিখ্যাত বৃটিশ মনস্তত্ত্ববিদ জে এ হ্যাঁডফিল্ড তাঁর সাইকোলজি অব পাওয়ার’ বইতে এর চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, আমি তিনজন লোককে মানসিক শক্তি ইত্যাদি সম্বন্ধে ডায়নামোমিটারে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য আমায় সাহায্য করতে বলেছিলাম, তিনি তাদের তিনটি বিভিন্ন অবস্থায় মনের ও শারিরীক শক্তির প্রভাব পরীক্ষা করেন।
