এরপর একদিন বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে সবাই ক্লাস করতে গেলাম। সেখানে ডঃ ব্রান্ডওয়াইন ছিলেন। তার ডেস্কের উপর রাখা ছিল এক বোতল দুধ। আমরা অবাক হয়ে ভাবলাম দুধ দিয়ে কি হবে । আচমকা তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বোতলটা বেসিনের মধ্যে ফেলে দিলেন আর চেঁচিয়ে বলে উঠলেন : পড়ে যাওয়া দুধ নিয়ে অনুশোচনা করো না!
এরপর তিনি আমাদের সকলকে ডেকে দেখালেন সব দুধ নর্দমায় চলে গেছে। তিনি এবার বললেন : ভালো করে দেখ সবাই। কারণ আমি চাই এই কথাটা সারাজীবন মনে রাখবে। দুধটা পড়ে গেছে–আর তাকে নর্দমা থেকে তুলে আনতে পারবে না। এক ফোঁটাও না। একটু সাবধান থাকলে দুধটা বোধ হয় বাচানো যেত, কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে–এখন যা করণীয় তা হল এর কথা ভুলে যাওয়া।
অ্যালেন সন্ডার্স আমায় আরও বলেছিলেন, এই ছোট্ট ঘটনাটা আমি লাতিন আর জ্যামিতি ভুলে যাওয়ার পরেও মনে রেখেছি। আসলে হাই স্কুলে চার বছর পড়ে যা শিখেছি তার চেয়ে ঢের বেশি ওই ঘটনা থেকে শিখেছিলাম। এতে শিখি দুধ যাতে না পড়ে যায়, তবে তা পড়ে গেলে আর যেন মাথা না ঘামাই।
কোন কোন পাঠক হয়তো ভাবতে পারেন দুধ পড়ে গেলে অনুশোচনা করো না প্রবাদটা নিয়ে বড় বেশি রকম আলোচনা করছি। আমি জানি এটা অতি সাধারণ প্রবাদ, একদম বস্তাপচা । তবু আমি জানি এই বস্তাপচা প্রবাদের মধ্যে যুগ যুগের সঞ্চিত জ্ঞান রয়ে গেছে। এগুলো মানুষের অতীতের লভ্যজ্ঞান থেকে হাজার হাজার বছরের মধ্য দিয়ে এসেছে। বহু পুরনো আনন্দ থেকে যেসব প্রবাদ চলে আসছে তার সবগুলো পড়তে গেলে এইদুটো প্রবাদের প্রকৃতই কোন তুলনা মেলে না : কোন সেতু না আসা পর্যন্ত সেটা অতিক্রম করার চেষ্টা কোরো না বা গড়িয়ে যাওয়া দুধ নিয়ে অনুশোচনা কোরো না। আমরা যদি ওই প্রবাদ দুটো কাজে লাগাতাম তাহলে এই বই পড়ার কোন দরকারই হতো না। আসলে প্রাচীন প্রবাদগুলো যদি আমরা মেনে চলতাম তাহলে মহাসুখেই জীবন কাটাতে পারতাম। তা যাই হোক জ্ঞানকে যতক্ষণ না কাজে লাগানো যায় ততক্ষণ তার দাম নেই। আর এ বইয়ের মধ্য দিয়ে আপনাদের নতুন কিছু বলতে চাইছি না। এ বইয়ের উদ্দেশ্য হল আপনাদের জানা কথাই আবার মনে করিয়ে দেওয়া। যাতে আপনারা তাকে কাজে লাগাতে উদ্বুদ্ধ হন।
প্রয়াত ফ্রেড ফুলার শেডের মত মানুষকে আমার বেশ লাগতো, তিনি পুরনো কথাকে বেশ নতুন করে বলতে পারতেন। তিনি ফিলাডেলফিয়া বুলেটিনের সম্পাদক ছিলেন। তিনি ক্লাসে একবার বলেছিলেন : তোমরা কতজন করাত দিয়ে গাছ কেটেছে? দেখি তোমাদের হাত। দেখা গেল অনেকেই তা করেছে। এরপর তিনি বললেন : তোমরা কতজন করাত নিয়ে কাঠের গুঁড়ো কেটেছো? কোন হাতই কেউ তুললো না ।
মিঃ শেড তখন বললেন : অবশ্যই কাঠের গুঁড়ো করাতে কাটতে পারবে না। এটাতো আগেই কাটা হয়ে যায় । অতীতেরও তাই ব্যাপার। অতীতে যা ঘটে গেছে তা নিয়ে যখন দুশ্চিন্তায় মগ্ন হও তখন করাতে কাঠের গুড়ো কাটাই হয়।
কিছদিন আগে জ্যাক ডেম্পসির সঙ্গে আমি ডিনার খেয়েছিলাম। টুনির কাছে তিনি যেভাবে হেরে যান সে ঘটনার কথা আমাকে শোনান তিনি। হেভিওয়েট প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে তার সম্মানে দারুণ লেগেছিল। তিনি আমাকে বলেন : সেই লড়াইর মাঝখানে আমার হঠাৎ মনে হল বুড়ো হয়ে পড়েছি… দশ রাউণ্ডের শেষে যদিও সোজা দাঁড়িয়ে ছিলাম তবে তার বেশি কিছু করার শক্তি আমার ছিল না! আমার সারা মুখ ক্ষত বিক্ষত, চোখ প্রায় বুজে গিয়েছে। দেখতে পেলাম রেফারি বিজয়ী হিসেবে জিন টনির হাত তুলে ধরেছেন, আমি আর বিশ্বজয়ী নই! আমি বৃষ্টির মধ্য দিয়ে লোকজনের ভিড় ঠেলে আমার সাজঘরে ফিরে এলাম। তখনই দেখলাম দর্শকের কেউ আমার হাত ধরার চেষ্টা করছে, কারও বা চোখে জল।
একবছর পর আবার টুনির সঙ্গে লড়লাম। তবে করার কিছুই আর ছিল না। চিরকালের জন্যেই আমি শেষ হয়ে গিয়েছিলাম । দুশ্চিন্তা না করে উপায় ছিল না তবুও নিজেকে বললাম : পড়ে যাওয়া দুধ নিয়ে মাথা ঘামাবো না। ঘুসির জন্য গাল পেতে দিলেও মাটিতে পড়ব না।
জ্যাক ডেম্পসি ঠিক তাই করেছিলেন। কীভাবে জানেন? বারবার নিজেকে এই কথা বলে, যা ঘটে গেছে তার জন্য শোক করব না। না, তাহলে তার অতীত নিয়ে চিন্তা আরও বেড়ে যেত। তিনি নিজের পরাজয় মেনে নিয়ে ভবিষ্যত নিয়ে পরিকল্পনা করতে শুরু করলেন। তিনি ব্রডওয়েতে জ্যাক ডেম্পসি রেস্তোরাঁ আর গ্রেট নর্দান হোটেল খুললেন। তিনি এসব করলেন মুষ্টিযুদ্ধ পরিচালনা আর প্রদর্শনী করে । এই সব করার কাজে তিনি এমনই ব্যস্ত হয়ে রইলেন যে দুশ্চিন্তা করার সময় তার আর রইল না। জ্যাক ডেম্পসি বলেছিলেন : গত দশ বছর আমি এত আনন্দে ছিলাম যে চ্যাম্পিয়ান হয়েও তা পাইনি।
মিঃ ডেম্পসি আমায় বলেছিলেন যে তিনি আমার বই পড়েন নি তবে তিনি শেকসপীয়ারের এই উপদেশ মেনে চলতেন : বুদ্ধিমান মানুষরা কখনও তাদের ক্ষতি নিয়ে ভাবতে চাননা বরং খুশি মনে এর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করেন।
ইতিহাস আর জীবনীমূলক বই যখন পড়ি তখন ওই সব মানুষের কষ্টকর অবস্থার কথা পর্যালোচনা করি। আমি অবাক হয়েছি বিপদে এবং দুশ্চিন্তায় তারা কিভাবে দুঃখ দুর্দশাকে ভুলে নতুন উদ্যমে পরম সুখে দিন কাটিয়েছেন।
