এর পরিণতি কি হল? এই দুজনে মিলে তাদের বাড়িকে এক অস্বাভাবিক জায়গা করে তোলেন, টলস্টয় যাকে পাগলা গারদ নাম দেন। এসবের অবশ্যই নানা কারণ ছিল। এই সব কারণের একটা হল তারা সাধারণত সব মানুষকে প্রভাবিত করতে চেয়েছিলেন। হ্যাঁ, তারা আমাদের মত মানুষকে প্রভাবিত করতে চেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আসল দোষীকে জানবার জন্য আমাদের কি কণামাত্রও মাথাব্যথা আছে? সত্যিই নেই। কারণ আমাদের নিজেদেরই এত সমস্যা যে টলস্টয়দের ব্যাপারে মাথা ঘামাবার কায় নেই। বাঁশির জন্য হতভাগ্য দুজন কত দামই দিয়েছেন! পঞ্চশ বছর ধরে কদর্য নরকবাস–যেহেত তাদের দুজনের কেউ বলতে পারেন নি। এবার থামো! কারণ তাদের দুজনের কেউই বলতে পারেনি এবার থামা যাক–ক্ষতি বন্ধ করা যাক। আমরা আমাদের জীবনকে বাজে খরচ করছি । যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়!
হ্যাঁ, আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি সত্যিকার মানসিক শান্তির মূলে রয়েছে মূল্য সম্বন্ধে যোগ্য ধারণা। আমি বিশ্বাস করি আমাদের সব দুশ্চিন্তার শতকরা পঞ্চাশভাগই দূর করা যায় যদি এই স্বর্ণময় কথাটা মনে রাখি–জীবনের পটভূমিকায় কোন ঘটনার বিচার।
অতএব দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য ৫নং নিয়মটি হলো এই :
যখনই মানুষের জীবনের মাপকাঠির তুলনায় ভালো টাকাকে খারাপ টাকার দিকে ছুঁড়ে দিই তখনই নিজেদের তিনটে প্রশ্ন করা উচিত :
১। যে বিষয়ে দুশ্চিন্তা করছি তাতে আমাদের কতখানি এসে যায়?
২। কখন আমি ক্ষতি বন্ধ হিসেব করে সব দুশ্চিন্তা ভুলে যাবো।
৩। এই বাঁশির জন্য কত দাম দেব? এর যা দাম তার চেয়ে কি ইতিমধ্যেই বেশি দিয়েছি?
১১. কাঠের গুড়ো করাত দিয়ে কাটতে চাইবেন না
এই বাক্যটা যখন লিখছি তখন জানালা দিয়ে তাকালে দেখতে পাই বাগানের পথের উপর পড়ে থাকা পাথরের বুকে ডাইনোসরের পদচিহ্ন। ওই ডাইনোসরের পদচিহ্ন আমি ইয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের পীবডি যাদুঘর থেকে কিনি। এ সম্বন্ধে সেখানকার কিউরেটরের একখানা চিঠিও পেয়েছি তাতে তিনি বলেছেন ওই পদচিহ্ন আঠারো কোটি বছর আগে। কোন মোঙ্গালয়ান আকাট মূর্খও ভাববে না আঠারো কোটি বছর আগে ফিরে গিয়ে ওই পদচিহ্নের পরিবর্তন করা সম্ভব। কিন্তু একশ আশি সেকেন্ড আগে যা ঘটে গেছে। তাকেও তা বদলানো অসম্ভব–অথচ আমাদের মধ্যে অনেকেই সেই চেষ্টা করেন। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি আমরা একশ আশি সেকেণ্ড আগের কাজের ফলাফল হয়তো কিছুটা পরিবর্তন করতে পারি–কিন্তু কিছুতেই সেই ঘটনাকে বদল করতে পারি না।
ঈশ্বরের রাজত্বে একটা মাত্র পথেই গঠনমূলকভাবে অতীতকে গ্রহন করা যেতে পারে। আর তা হল অতীতের ভুলকে শান্তভাবে বিশ্লেষণ করে তা থেকে উপকার লাভকরা–এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন অতীতকে বিস্মৃত হওয়া।
আমি জানি এটা সত্য, কিন্তু আমার কি তা মেনে নেওয়ার মতো সাহস বা জ্ঞান থাকে? এর উত্তর দিতে হলে বেশ কবছর আগে যে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা লাভ করি তার কথা শোনাতে দিন। আমি এক পেনিও লাভ না করে লক্ষ লক্ষ ডলার নিজের হাতের মধ্য দিয়েই নষ্ট করি। ব্যাপারটা এইভাবে ঘটে : আমি বয়স্ক শিক্ষার এক বিরাট ব্যবসা ফেঁদে বসেছিলাম, নানা শহরে শাখাও খুলেছিলাম, নানাভাবে বিজ্ঞাপন আর অফিসের পিছনে খরচও করেছিলাম। শিক্ষাদানে আমি এমনই ব্যস্ত ছিলাম যে টাকা পয়সার দিকে নজরই দিতে পারিনি। আমি এতই অপরিণত ছিলাম যে খরচের দিকটা দেখার জন্য যে একজন ব্যবসায় পাকা ম্যানেজার রাখা দরকার সেটা বুঝতে পারিনি ।
শেষ পর্যন্ত প্রায় একবছর পরে মারাত্মক একটা অবস্থা টের পেলাম। দেখলাম প্রচুর আয় হওয়া সত্ত্বেও লাভ কিছুমাত্র হয়নি। এটা আবিষ্কারের পর দুটো জিনিস আমার করা উচিত ছিল। প্রথমতঃ জর্জ ওয়াশিংটন কার্ভার যিনি বিখ্যাত একজন নিগ্রো বিজ্ঞানী–যা করেছিলেন তাই করা উচিত। অর্থাৎ একটা ব্যাঙ্ক ফেল মারলে তার সারা জীবনের সঞ্চয় চল্লিশ হাজার ডলার জলে গেলে তিনি যা করেছিলেন। কেউ যখন তাকে প্রশ্ন করত যে তিনি দেউলিয়া সেকথা জানেন কিনা–তিনি জবাব দিতেন : হ্যাঁ সে রকম শুনেছি বটে। তিনি তারপর তাঁর শিক্ষকাত চলিয়ে গেলেন। তিনি তার ক্ষতির ব্যাপারটা মন থেকে একদম সরিয়ে দিয়েছিলেন। একবারের জন্যও আর ভাবতে চাননি।
দ্বিতীয় আর একটা কাজ আমার করণীয় ছিল : আমার উচিত ছিল আমার ভুলগুলো বিশ্লেষণ করা আর একটা স্থায়ী শিক্ষা পাওয়া।
সত্যি বলতে কি এদুটোর কোনটাই আমি করিনি। তার বদলে মারাত্মক দুশ্চিন্তায় কাতর হয়ে পড়ি। কয়েক মাস যাবৎ একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। আমি ঘুমোতে পারিনি, আমার ওজনও কমে গেল। একটা শিক্ষালাভ করার বদলে একই কাজ করে আবার অল্প টাকা খোয়ালাম?
এতসব বোকামির কথা স্বীকার করাটা সুখের হয়। তবে একটা ব্যাপার বেশ আগেই শিখেছি যে বিশজনকে শেখানো সহজ কিন্তু বিশজনের হয়ে একজন পালন করা সহজ নয়।
নিউ ইয়র্কের জর্জ ওয়াশিংটন হাই স্কুলের ডঃ পল ব্রান্ডওয়াইনের কাছেই আমার শিক্ষা নেয়া উচিত ছিল । তিনি অ্যালেন সণ্ডার্স নামে একজনকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। মি. সন্ডার্স আমাকে বলেছিলেন যে ডঃ ব্র্যান্ডওয়াইনের স্বাস্থ্যের ক্লাসে এক মহামূল্যবান শিক্ষালাভ করেছিলেন। তিনি বলেন : আমার বয়স তখন অল্পই। তবুও বড় দুশ্চিন্তা করতাম। যেসব ভুল করতাম তা ভেবে আমার অস্বস্তি আর রাগ হত । পরীক্ষা দেওয়ার পর জেগে থেকে আঙুল কামড়ে চলতাম পাছে পাশ না করি। সব সময় যা করতাম তা নিয়ে ভাবতাম আর অন্যরকম করলে ভালো হত মনে করতাম। বারবার যা করেছি তা রোমন্থন করতাম।
